বাংলাদেশে প্রবাসী আয়ের ধারা চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই ইতিবাচক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ১ হাজার ৭২ কোটি ৯০ লাখ ডলার। এক বছর আগে একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল ৯৫৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার। অর্থাৎ প্রায় চার মাসে বাড়তি এসেছে ১১৪ কোটি ১০ লাখ ডলার, আর প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১১.৯ শতাংশ।
চলতি অক্টোবরের চিত্রটা কিছুটা আলাদা। মাসের প্রথম ২৪ দিনে এসেছে ২১৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার। গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ২০০ কোটি ২০ লাখ ডলার। সেই হিসাবে প্রবৃদ্ধি ৬.৭ শতাংশ, যা জুলাই থেকে হিসাব করা মোট প্রবৃদ্ধির চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম। অর্থাৎ বছরের শুরুর দিকের গতি অক্টোবরে কিছুটা কমেছে। গড় হিসাবে এই ২৪ দিনে প্রতিদিন প্রায় ৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার করে এসেছে। শুধু ১৯ থেকে ২৪ অক্টোবর, এই ছয় দিনে এসেছে ২৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
প্রবাসী আয় বলতে মূলত ব্যাংকিং মাধ্যমে আসা অর্থকেই ধরা হয়। অর্থাৎ বৈধ পথে যত বেশি টাকা আসে, সরকারি হিসাবে তত বেশি ওঠে। গত বছরের তুলনায় এবার এই পথে বাড়তি ডলার আসা মানে দেশে ডলারের জোগান বেড়েছে। আমদানিকারকদের জন্য জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল আনার চাপ তাতে কিছুটা কমে।
প্রবাসী আয় দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় ভরসা। এই ডলার দিয়ে আমদানির বিল মেটানো সহজ হয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপও কমে। বাংলাদেশে প্রবাসী আয়ের বড় অংশ সরাসরি পরিবারগুলোর হাতে পৌঁছায়। ঘরভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা আর দৈনন্দিন বাজারের খরচ মেটাতে গ্রাম ও শহরের লাখো সংসার এই টাকার ওপর নির্ভর করে। একজন প্রবাসী মাসে যে টাকা পাঠান, তা একদিকে পরিবারের খরচ চালায়, অন্যদিকে স্থানীয় বাজারে চাহিদা তৈরি করে। এভাবে প্রতিটি ডলার দেশের ভেতরে একাধিক হাত ঘুরে অর্থনীতিকে সচল রাখে। এ কারণেই নীতিনির্ধারকেরা প্রতি সপ্তাহের হিসাব ধরে নজর রাখেন। রিজার্ভ ও বাহ্যিক খাতকে এই প্রবৃদ্ধি সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে ঝুঁকির জায়গাও আছে। অনেক প্রবাসী কর্মী মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করেন। সম্প্রতি সৌদি আরবগামী বেশ কিছু ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বহু যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েছেন। এই বিঘ্ন দীর্ঘ হলে কর্মীদের যাতায়াত ও কর্মসংস্থানে প্রভাব পড়তে পারে। পরে তার ছাপ পড়তে পারে দেশে আসা অর্থের ওপরও। তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যে তেমন কোনো প্রভাব দেখা যায়নি।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশে প্রবাসী আয় এখনো শক্ত অবস্থানে আছে। প্রায় চার মাসে ১১.৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কম কথা নয়। তবে অক্টোবরের ধীর গতি একটি সতর্কসংকেত হিসেবেও দেখা যেতে পারে। বছরের বাকি সময়ে এই ধারা ধরে রাখা যাবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির ওপর। আগামী সপ্তাহগুলোর তথ্যে সেই ইঙ্গিত মিলবে।
পরিবার ও ব্যবসায়ীদের জন্য এই তথ্য আশার, কারণ ডলারের জোগান ঠিক থাকলে বাজারে অস্থিরতা কম থাকে। তবে নীতিনির্ধারকদের নজর রাখতে হবে প্রবৃদ্ধির গতির দিকে। মাসের পর মাস প্রবৃদ্ধি কমতে থাকলে তার চাপ রিজার্ভেও পড়তে পারে।












