দেশে বিদ্যমান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনেকটিতেই শিক্ষার্থী সংকট, শিক্ষকস্বল্পতা ও স্থায়ী ক্যাম্পাসের অভাব রয়েছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে অর্ধেকের বেশি আসন ফাঁকা থাকছে। শিক্ষার মান ও গবেষণার পরিবেশ নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। এমন পরিস্থিতিতেই নতুন করে আরও ১১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমোদন চেয়ে আবেদন জমা পড়েছে। এসব প্রস্তাবের প্রয়োজনীয়তা, সম্ভাব্যতা ও আইনি শর্ত পূরণের বিষয় যাচাই করছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)।
উচ্চশিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর সংকট কাটানো এবং শিক্ষার মান নিশ্চিত করার আগে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়া কতটা যৌক্তিক, তা বিবেচনা করা জরুরি। উচ্চশিক্ষার প্রকৃত চাহিদা, কর্মবাজারে স্নাতকদের প্রয়োজন, অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য এবং প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও একাডেমিক সক্ষমতা যাচাই না করে অনুমোদন দিলে উচ্চশিক্ষায় বাণিজ্যিক প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।
দেশে বর্তমানে ১১৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠানকে শিক্ষার্থী ভর্তিতে প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও পাসের হার কমেছে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ এবং বিদেশে পড়াশোনার সুযোগ থাকায় শিক্ষার্থীদের পছন্দের পরিসরও বেড়েছে। ফলে বিদ্যমান সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে উঠছে।
কোন ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদন
নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমোদন চেয়ে আবেদন করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজশাহীর আশ্রয় ইউনিভার্সিটি ও ইম্পেরিয়াল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ইউনিভার্সিটি অব ইন্টিগ্রেটেড থট, গাজীপুরের বেঙ্গল ইউনিভার্সিটি, ঢাকার যমুনা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও ব্রিটিশ বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি, সাভারের গ্লোরিয়াস ইউনিভার্সিটি, ঝিনাইদহের সৃজনী বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনার নৌবাহিনী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব এক্সিলেন্স এবং ভ্যারিটাস ইউনিভার্সিটি।
ইউজিসি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ছয় মাসে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এসব প্রস্তাবের বিষয়ে কমিশনের মতামত চাওয়া হয়েছে। গত ২৭ মার্চ ছয়টি প্রস্তাবের বিষয়ে মতামত চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়। পরে আরও পাঁচটি প্রস্তাব নিয়ে পৃথকভাবে মতামত চাওয়া হয়। যাচাই-বাছাই ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে অনুমোদনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আবেদনকারীদের মধ্যে যমুনা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জন্য আবেদন করেছে যমুনা গ্রুপ। বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির জন্য আবেদন করেছেন বাংলাদেশ জাস্টিস পার্টির সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. সৈয়দ জাভেদ মোহাম্মদ সালেহউদ্দিন। কৃষিবিদ গ্রুপের পক্ষে ড. মো. আলী আফজাল আবেদন করেছেন গ্লোরিয়াস ইউনিভার্সিটির জন্য। ব্রিটিশ বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির আবেদনকারী আনোয়ারুল ইসলাম এবং সৃজনী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আবেদন করেছেন সৃজনী বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. এম হারুন অর রশীদ।
সম্ভাব্যতা ও আইনি শর্ত যাচাই
ইউজিসি জানিয়েছে, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদন যাচাইয়ের সময় অবকাঠামো, অর্থায়ন, একাডেমিক পরিকল্পনা, শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রস্তাবিত বিষয়ে শিক্ষার বাস্তব প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করা হচ্ছে।
কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ সমকালকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় স্পষ্টভাবে যাচাই করা হচ্ছে। আবেদনকারীরা যেসব বিষয়ে শিক্ষার্থী পড়াতে চান, সেগুলোর প্রকৃত প্রয়োজন রয়েছে কি না, তা-ও দেখা হচ্ছে।
ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। নির্ধারিত শর্ত পূরণ, অবকাঠামো, শিক্ষক নিয়োগ ও একাডেমিক পরিকল্পনা যাচাই করে প্রতিবেদন তৈরি করা হবে। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠানো হবে।
তবে বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিস্থিতি নতুন প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, হাতেগোনা ১০ থেকে ১২টি বাদে অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সংকটে রয়েছে। রাজধানীর উত্তরার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে শিক্ষার্থী মাত্র ২০১ জন।
ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, আগে বিভিন্ন সময়ে অনুমোদন পাওয়া অন্তত পাঁচটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এখনো শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। অন্যদিকে সরকার একাধিকবার সময় বাড়ালেও ৩৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ২২টি এখনো স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম স্থানান্তর করতে পারেনি। এর মধ্যে ১১টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার জন্য নতুন করে সময় চেয়েছে।
কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে আইন ও ইউজিসির নির্দেশনা না মানা, শিক্ষার মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হওয়া এবং শিক্ষার চেয়ে ব্যবসায়িক স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অবশ্য সব প্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি এক নয়; কিছু বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও মানসম্মত শিক্ষা কার্যক্রমে অগ্রসর হয়েছে।
সমীক্ষা ছাড়া অনুমোদন নিয়ে আপত্তি
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির সভাপতি ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান মো. সবুর খান মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে যথাযথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা অপরিহার্য। তাঁর মতে, এমনকি কোনো বিষয়ে পাঠদান চালুর অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রেও সমীক্ষা প্রয়োজন; বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। কোন অঞ্চলে কী ধরনের উচ্চশিক্ষার চাহিদা রয়েছে, কোন বিষয়ে দক্ষ জনবল প্রয়োজন এবং প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয় সেই চাহিদা কীভাবে পূরণ করবে, তা আগে নির্ধারণ করা দরকার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সমকালকে বলেন, বর্তমানে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই ভালোভাবে চলছে না। তাঁর মতে, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান শিক্ষা বিস্তার ও সুশিক্ষিত নাগরিক গড়ে তোলার উদ্দেশ্যের পরিবর্তে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মতো পরিচালিত হচ্ছে। এ অবস্থায় নতুন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনের যৌক্তিকতা তিনি দেখেন না।
তিনি উচ্চশিক্ষার চাহিদা পূরণে আরও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন। এ ক্ষেত্রে দেশের বড় ও পুরোনো কলেজগুলোকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয় হলেও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রকৃত অর্থেই মানসম্মত উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান হতে হবে; এটি অর্থ উপার্জনের জায়গা হতে পারে না।
আঞ্চলিক চাহিদা ও নীতির ধারাবাহিকতা
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যেসব জেলায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, সেখানে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে যেসব জেলায় সরকারি বা বেসরকারি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই, সেসব অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় ছিল। তবে বর্তমান সরকার এই নীতি অনুসরণ নাও করতে পারে।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনে অঞ্চলভিত্তিক উচ্চশিক্ষার সুযোগ ও বৈষম্য বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। রাজধানী বা বিশ্ববিদ্যালয়সমৃদ্ধ এলাকায় একই ধরনের আরও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আগে পিছিয়ে থাকা জেলাগুলোর প্রয়োজন মূল্যায়ন করা উচিত। তবে কোনো জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় না থাকলেই সেখানে নতুন প্রতিষ্ঠান অনুমোদন দেওয়া যথেষ্ট নয়। শিক্ষার্থী, যোগ্য শিক্ষক, অবকাঠামো ও আর্থিক সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ অনুযায়ী, নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপনে নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হয়। তাই শুধু প্রাথমিক অবকাঠামো বা অর্থের সংস্থান নয়, দীর্ঘ মেয়াদে শিক্ষক নিয়োগ, গবেষণা, পর্যাপ্ত গবেষণাগার ও গ্রন্থাগার, মানসম্মত পাঠদান এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার সক্ষমতাও যাচাই করা প্রয়োজন।
শিক্ষাবিদদের মতে, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের আগে বিষয়ভিত্তিক ও অঞ্চলভিত্তিক উচ্চশিক্ষার চাহিদা নিয়ে সমন্বিত সমীক্ষা জরুরি। কোন বিষয়ে কতজন স্নাতক প্রয়োজন, বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আসন কতটা ব্যবহৃত হচ্ছে এবং নতুন প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার মান ও গবেষণায় কী অবদান রাখতে পারবে—এসব প্রশ্নের উত্তর যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।












