দীর্ঘ ইতিহাস, প্রাচীন স্থাপত্য, কফির ঐতিহ্য ও অনন্য সংস্কৃতি থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক পর্যটনে ইথিওপিয়ার সম্ভাবনা দীর্ঘদিন পুরোপুরি পরিচিতি পায়নি। বিদেশে দেশটির পরিচিতি অনেক ক্ষেত্রে সীমিত ছিল কয়েকটি পুরোনো ছবি ও প্রচলিত ধারণার মধ্যে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্তর্জাতিক কনটেন্ট নির্মাতাদের ভ্রমণচিত্র এবং দেশটির অবকাঠামোগত পরিবর্তন সেই ধারণা বদলে দিচ্ছে। পর্যটকদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা এখন ইথিওপিয়াকে নতুনভাবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরছে।
আফ্রিকার অন্যতম প্রাচীন রাষ্ট্র ইথিওপিয়া তার প্রায় তিন হাজার বছরের ইতিহাস, লালিবেলার পাথর কেটে তৈরি গির্জা, আদ্দিস আবাবার নগর উন্নয়ন এবং কফি সংস্কৃতির জন্য পরিচিত। দেশটি কখনো ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে না যাওয়ার ঐতিহাসিক পরিচয়ও বহন করে। এখন এসব ঐতিহ্যের পাশাপাশি আধুনিক নগরজীবনও আন্তর্জাতিক দর্শকদের আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে উঠছে।
আইশোস্পিডের সফরে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আদ্দিস আবাবা

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে জনপ্রিয় অনলাইন স্ট্রিমার আইশোস্পিডের ইথিওপিয়া সফর দেশটির পর্যটন প্রচারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। আফ্রিকার ২০টি দেশ ঘুরে দেখার ২৮ দিনের সফরে ইথিওপিয়া ছিল তাঁর দশম গন্তব্য।
কেনিয়ার সংবাদমাধ্যম ক২৪ ডিজিটাল ও নাইজেরিয়ার বেল্লানাইজার প্রতিবেদনে বলা হয়, আদ্দিস আবাবা থেকে তাঁর সরাসরি সম্প্রচার একসঙ্গে ২ লাখ ৭০ হাজারের বেশি দর্শক দেখেছিলেন। তাঁদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুরো সফরে এটিই ছিল সর্বাধিক দর্শকসংবলিত সম্প্রচার।
সফরকালে তিনি স্কুটারে শহর ঘুরেছেন, একটি অর্থোডক্স গির্জা পরিদর্শন করেছেন, দেশটির ঐতিহ্যবাহী খাবার ইনজেরা খেয়েছেন এবং মারকাতো বাজারে ঘুরেছেন। এ ছাড়া ইথিওপিয়ার ঐতিহ্যবাহী এসকিস্তা নাচ শেখার পাশাপাশি অংশ নেন দেশটির কফি অনুষ্ঠানে। কফি পান করার পর নিজের উদ্দীপনার কথাও জানান তিনি।
আদ্দিস আবাবার মেয়র আদানেচ আবিবে এই সফরকে ভবিষ্যতের সম্ভাবনার সূচনা হিসেবে উল্লেখ করেন। স্থানীয় একজন আয়োজকের মতে, ভুল ধারণার কারণে অনেক ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা আগে ইথিওপিয়াকে এড়িয়ে চলতেন। মাত্র এক দিনের সরাসরি সম্প্রচারও সেই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে।
আরব বিশ্বের পর্যটকদেরও আগ্রহ বাড়ছে
ইথিওপিয়ার প্রতি আগ্রহ শুধু পশ্চিমা দর্শকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ছয় মিলিয়নের বেশি ইউটিউব অনুসারী থাকা খালিদ আল আমেরি দেশটি সফর করে আদওয়া বিজয় স্মৃতিসৌধ পরিদর্শন করেন। আফ্রিকার ইতিহাসে এই বিজয়ের তাৎপর্য তুলে ধরার পাশাপাশি তিনি কিতফোসহ দেশটির খাবার ও কফি সংস্কৃতির প্রশংসা করেন। তাঁর অনুসারীদেরও সরাসরি ইথিওপিয়া ঘুরে দেখার আহ্বান জানান।

সৌদি আরবের আলোকচিত্রী ও ভ্রমণকারী আলী দাউদ হাদ্দাদ বলেছেন, গত দশ বছরে দেশটির পরিবর্তন তিনি মাসে মাসে দৃশ্যমান হতে দেখেছেন। সৌদি আরব ও অন্যান্য আরব দেশের পরিবারগুলোর কাছে ইথিওপিয়াকে জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরতে কাজ করছেন তিনি।
অন্যদিকে, আজারবাইজানি বংশোদ্ভূত ভ্রমণকারী দাউদ আখুন্দজাদা তাঁর ফেসবুকের প্রায় ২০ লাখ এবং ইউটিউবের ১০ লাখ অনুসারীর সামনে আদ্দিস আবাবার উন্নত সড়ক, কফি সংস্কৃতি ও রেল যোগাযোগ তুলে ধরেছেন। পরে তিনি লালিবেলা সফর করেন। সেখানে একক পাথর খোদাই করে নির্মিত বেতে গিওরগিস গির্জাকে বিশ্বের অন্যতম অসাধারণ তীর্থস্থান হিসেবে বর্ণনা করেন। আন্তর্জাতিক কনটেন্ট নির্মাতাদের মধ্যে ডিলান পেজও আদ্দিস আবাবাকে বিশ্বদর্শকের সামনে তুলে ধরেছেন।
পর্যটক বাড়ছে, রাজস্বেও ইতিবাচক অগ্রগতি
ইথিওপিয়ার পর্যটন খাতের পরিসংখ্যানেও এই আগ্রহের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটিতে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ১৪ লাখ ছাড়িয়েছে এবং পর্যটন থেকে আয় হয়েছে ৫২০ কোটি ডলারের বেশি।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১৬ লাখের বেশি আন্তর্জাতিক পর্যটক আকর্ষণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়াই এই প্রবৃদ্ধির একমাত্র কারণ নয়। বরং এসব ভিডিও সম্ভাব্য পর্যটকদের কাছে দেশটির পরিচিতি বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক অবকাঠামোর সমন্বয়
ইথিওপিয়ার পর্যটনের শক্তি কেবল অনলাইন জনপ্রিয়তায় সীমাবদ্ধ নয়। দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতকে নির্মিত লালিবেলার পাথরখোদাই গির্জাগুলো দেশটির ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। আদওয়া বিজয় আফ্রিকাজুড়ে গর্বের প্রতীক। অন্যদিকে, বাড়িতে বাড়িতে প্রচলিত কফি তৈরির ঐতিহ্য দেশটির জীবন্ত সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে।
আদ্দিস আবাবায় নতুন সড়ক, পরিচ্ছন্ন পদচারীপথ, পার্ক, রেল যোগাযোগ ও নগর উন্নয়নের উদ্যোগও পর্যটকদের অভিজ্ঞতায় নতুন মাত্রা যোগ করছে। তবে আন্তর্জাতিক আগ্রহকে দীর্ঘমেয়াদি পর্যটন প্রবৃদ্ধিতে রূপ দিতে উন্নত পরিবহন, পর্যাপ্ত সেবা এবং অতিথিপরায়ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
ইথিওপিয়া নতুন করে পর্যটন আবিষ্কার করছে না; বরং দীর্ঘদিনের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক-স্থাপত্য ঐতিহ্যকে বিশ্বের সামনে আরও দৃশ্যমান করে তুলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই পরিচিতি ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। এখন সেই আগ্রহ ধরে রাখার জন্য পর্যটকদের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে আকর্ষণীয় করে তোলাই দেশটির সামনে বড় কাজ।















