বন্ধুবান্ধব নেই, নিয়মিত আড্ডা নেই, সামাজিক অনুষ্ঠানেও তেমন যাতায়াত নেই। তবু জীবন যে অসুখী হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। একা থাকার অভিজ্ঞতা সামাজিক মাধ্যমে তুলে ধরে এই ধারণাকেই নতুনভাবে সামনে আনছেন একদল কনটেন্ট নির্মাতা। তাঁদের বলা হচ্ছে ‘লোনলিনেস ইনফ্লুয়েন্সার’ বা একাকিত্ব নিয়ে কাজ করা সামাজিক মাধ্যমের প্রভাবক।
সারাহ-জেন হোডলি এবং তাঁর মতো আরও কয়েকজন নিজেদের বন্ধুহীন বা সীমিত সামাজিক যোগাযোগের জীবনযাপনের নানা দিক তুলে ধরছেন। তাঁদের বিষয়বস্তুতে উঠে আসছে একা সময় কাটানো, নিজের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং প্রচলিত সামাজিক প্রত্যাশার বাইরে থেকেও জীবনকে উপভোগ করার অভিজ্ঞতা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণত বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আনন্দময় মুহূর্ত, দলবদ্ধ ভ্রমণ, পার্টি কিংবা নানা সামাজিক অনুষ্ঠানের ছবি বেশি চোখে পড়ে। এসব উপস্থাপনা অনেক সময় এমন ধারণা তৈরি করে যে, সুখী হতে হলে মানুষের চারপাশে অনেক বন্ধু থাকা জরুরি। কিন্তু একাকিত্ব নিয়ে কাজ করা এই প্রভাবকেরা সেই ধারণাকে প্রশ্ন করছেন। তাঁদের বক্তব্য, মানুষের জীবনযাপনের ধরন এক রকম নয়। কারও কাছে বড় বন্ধুমহল আনন্দের উৎস, আবার কেউ অল্প মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কিংবা একা সময় কাটিয়েও স্বস্তি খুঁজে পান।
তবে একা থাকা আর একাকিত্ব অনুভব করা এক বিষয় নয়। কেউ নিজের ইচ্ছায় একা থাকতে পারেন এবং সেই সময় উপভোগ করতে পারেন। অন্যদিকে, কারও আশপাশে অনেক মানুষ থাকলেও তিনি ভেতরে ভেতরে নিঃসঙ্গ বোধ করতে পারেন। ফলে একা থাকার অভিজ্ঞতাকে সব সময় দুঃখ, ব্যর্থতা কিংবা সামাজিক অযোগ্যতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা ঠিক নয়।
এই প্রভাবকদের জীবনযাপনের গল্পে আত্মপ্রেম বা নিজেকে ভালোবাসার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। নিজের পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া, অন্যের প্রত্যাশা অনুযায়ী জীবন সাজানোর চাপ কমানো এবং নিজের সঙ্গে সময় কাটাতে শেখার মাধ্যমে তাঁরা একা থাকার অভিজ্ঞতাকে ইতিবাচকভাবে দেখার চেষ্টা করছেন।
তবে এই প্রবণতার আরেকটি দিকও রয়েছে। একা থাকতে ভালো লাগা এবং ধীরে ধীরে সামাজিক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার মধ্যে পার্থক্য আছে। ব্যক্তিগত পছন্দ থেকে নির্জনতা বেছে নেওয়া যেমন স্বাভাবিক, তেমনি অনিচ্ছাকৃত নিঃসঙ্গতা মানসিক কষ্টের কারণ হতে পারে। তাই একা থাকার অভিজ্ঞতা সবার জন্য একই রকম, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
সামাজিক মাধ্যমে একাকিত্ব নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার ফলে এমন অনেক মানুষ নিজেদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিল খুঁজে পেতে পারেন, যাঁরা প্রচলিত সামাজিক জীবনের সঙ্গে সহজে মানিয়ে নিতে পারেন না। তাঁদের কাছে এই বক্তব্য স্বস্তিদায়ক হতে পারে যে, সুখী জীবনের জন্য সব সময় বড় বন্ধুমহল কিংবা ব্যস্ত সামাজিক জীবন অপরিহার্য নয়।
অন্যদিকে, একা থাকার জীবনকে আকর্ষণীয় করে তুলে ধরার সময় সামাজিক সম্পর্কের গুরুত্বও উপেক্ষা করা উচিত নয়। মানুষের জীবনে পারস্পরিক যোগাযোগ, সহায়তা এবং আপনজনের সঙ্গে সম্পর্কের প্রয়োজন থাকতে পারে। তাই আত্মপ্রেমের নামে সব সম্পর্ক থেকে দূরে সরে যাওয়া এবং নিজের পছন্দে কিছুটা নির্জনতা বেছে নেওয়াকে এক করে দেখা ঠিক হবে না।
সব মিলিয়ে, ‘লোনলিনেস ইনফ্লুয়েন্সার’ প্রবণতা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনছে: সুখী হওয়ার জন্য কি প্রচলিত সামাজিক প্রত্যাশা মেনে চলতেই হবে? এই প্রভাবকদের অভিজ্ঞতা বলছে, একা থাকা কখনো কঠিন হতে পারে, কিন্তু তা সব সময় অসুখী জীবনের সমার্থক নয়। নিজের সঙ্গে স্বস্তিতে থাকতে শেখা এবং প্রয়োজনমতো অন্যদের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে পাওয়াই হতে পারে মূল বিষয়।












