কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে বিপুলসংখ্যক হোয়াইট কলার কর্মী চাকরি হারাবেন—এমন আশঙ্কা এখনো পুরোপুরি বাস্তবে রূপ নেয়নি। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে আরও নীরব একটি পরিবর্তন ঘটছে। এআই অভিজ্ঞ কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বাড়াচ্ছে, অথচ কর্মজীবনের শুরুতে থাকা তরুণদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সংকুচিত করতে পারে। ভারতের মতো দেশে এই পরিবর্তনের পরিণতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, যেখানে শিক্ষিত তরুণদের বড় একটি অংশ ইতিমধ্যেই মানসম্মত চাকরির অভাবে হতাশ।
এই সংকটের একটি প্রকাশ হলো ‘কোয়ায়েট কুইটিং’ বা নীরবে কর্মবিমুখ হয়ে পড়া। এর অর্থ চাকরি ছেড়ে দেওয়া নয়; বরং কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে মানসিক সংযোগ হারিয়ে শুধু ন্যূনতম দায়িত্বটুকু পালন করা। গ্যালাপের ‘স্টেট অব দ্য গ্লোবাল ওয়ার্কপ্লেস’ জরিপ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো কর্মীদের সম্পৃক্ততা কমেছে, যা ২০২০ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। ভারতেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। দেশটির মাত্র ২৩ শতাংশ কর্মী নিজেদের কাজের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত বলে অনুভব করেন। প্রায় ৫৯ শতাংশ কেবল টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় কাজটুকু করেন। বাকিরা কার্যত কর্মক্ষেত্র থেকে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন।
ভারতের জন্য এই প্রবণতা নিছক করপোরেট ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়। এটি অর্থনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
তরুণ জনগোষ্ঠী, কিন্তু কাজের সুযোগ কোথায়
চীনের তরুণদের মধ্যে ‘শুয়ে থাকার’ প্রবণতা দেখা গেছে—অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা থেকে সরে এসে সীমিত আকাঙ্ক্ষা ও সাধারণ জীবনযাপনে সন্তুষ্ট থাকা। পরিবারের সম্পদ অনেকের জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ করে। ভারতের বাস্তবতা ভিন্ন। দেশটি তুলনামূলক দরিদ্র, আর প্রায় ৪০ কোটি তরুণ নিয়ে গঠিত জেন-জি জনগোষ্ঠী তার ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

কিন্তু স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার ৪০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। শিক্ষার মান এবং পরীক্ষায় অনিয়ম নিয়ে ক্ষোভ রাস্তায় নেমে এসেছে, যার একটি প্রকাশ তথাকথিত ‘ককরোচ’ বিক্ষোভ। দীর্ঘ শিক্ষাজীবন ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার পরও যদি তরুণদের সামনে মানসম্মত কর্মসংস্থানের বদলে হতাশা অপেক্ষা করে, তবে তার প্রভাব অর্থনীতি ছাড়িয়ে সমাজেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এআই এই সংকট কতটা বাড়াচ্ছে, তা বুঝতে ভারতের সফটওয়্যার শিল্পের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
এআই বদলে দিচ্ছে প্রাথমিক পর্যায়ের চাকরি
জেনারেটিভ এআই আসার আগে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নতুন কর্মী নিয়োগের আগ্রহ বাড়ছিল। মুম্বাইভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান টিমলিজ এডটেকের দ্বিবার্ষিক জরিপ অনুযায়ী, ২০২২ সালের প্রথমার্ধে নতুন তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী নিয়োগে আগ্রহী নিয়োগদাতার হার ছিল ৫৭ শতাংশ। ২০২৩ সালের প্রথমার্ধে তা বেড়ে ৬৭ শতাংশে দাঁড়ায়।
চ্যাটজিপিটি চালুর পর এআইয়ের কারণে মানুষের কাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ফলে নিয়োগদাতারা অপেক্ষা করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের নীতি গ্রহণ করেন। ২০২৪ সালজুড়ে নতুন কর্মী নিয়োগে আগ্রহের হার ৪২ থেকে ৪৫ শতাংশের মধ্যে ছিল। চলতি বছরের শুরুর দিকে তা বেড়ে ৮১ শতাংশে উঠলেও সর্বশেষ জরিপে নেমে এসেছে ৭৬ শতাংশে।
তবে নিয়োগের আগ্রহ ফিরে এলেও কাজের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ২০২২ সালে সফটওয়্যার প্রোগ্রামার, তথ্যপ্রযুক্তি সহায়তা বিশ্লেষক এবং জুনিয়র ব্লকচেইন ডেভেলপারদের চাহিদা ছিল উল্লেখযোগ্য। ২০২৫ সালে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে এআইকেন্দ্রিক পদ প্রাধান্য পেতে শুরু করে। চলতি বছরে চাহিদা আরও নির্দিষ্ট হয়েছে—এআই অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করা এবং বিদ্যমান ব্যবসায়িক কার্যক্রমে এসব প্রযুক্তি যুক্ত করা। বিশেষজ্ঞ পদ ছাড়াও বিভিন্ন চাকরিতে এআই ব্যবহারের প্রাথমিক দক্ষতা এখন নিয়োগদাতাদের প্রত্যাশার অংশ।
কোম্পানিগুলোর কাছে এই পরিবর্তন যৌক্তিক। এআই ব্যবহার করে কর্মীরা কম সময়ে বেশি কাজ করতে পারছেন, অনেক ক্ষেত্রে কাজের মানও উন্নত হচ্ছে। কিন্তু উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর এই প্রক্রিয়ায় নতুন কর্মীরা কি প্রয়োজনীয় পেশাগত বিচারবোধ ও গভীর দক্ষতা অর্জন করতে পারছেন?

এআইয়ের সহায়তা কি শেখার বিকল্প হতে পারে
ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির ডেভিড অটর এবং গুগলের গবেষকদের একটি পরীক্ষায় এই প্রশ্নের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিন মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মরত পেটেন্ট আইনজীবীদের একটি দলকে নথি তৈরির এআই সহকারী ব্যবহার করতে দেওয়া হয়েছিল। এআই ব্যবহারের সময় নথির মান উন্নত হয়। কিন্তু পরে যখন তাঁদের সহায়তা ছাড়া কাজ করতে দিয়ে অর্জিত দক্ষতা যাচাই করা হয়, তখন উন্নতির সুফল দেখা যায় জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের মধ্যে। জুনিয়র আইনজীবীদের ক্ষেত্রে সামগ্রিক দক্ষতায় কোনো নিট উন্নতি পাওয়া যায়নি।
গবেষকদের উপসংহার ছিল, এআইয়ের সহায়তায় অর্জিত অভিজ্ঞতাকে দীর্ঘস্থায়ী দক্ষতায় রূপ দিতে আগে থেকেই মৌলিক পেশাগত জ্ঞান থাকা প্রয়োজন হতে পারে।
এখানেই ভারতের কর্মসংস্থান সমস্যার সঙ্গে এআইয়ের সম্পর্কটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সাত থেকে দশ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সফটওয়্যার প্রকৌশলীরা তাঁদের অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে এআই এজেন্ট পরিচালনা করতে পারবেন। কিন্তু যাঁরা সদ্য কর্মজীবনে প্রবেশ করছেন, তাঁদের সেই ভিত্তি তৈরি করে দেওয়ার দায়িত্ব কে নেবেন? এআই যদি প্রাথমিক পর্যায়ের কাজগুলো দ্রুত সম্পন্ন করে দেয়, তবে নতুন কর্মীরা বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শেখার সুযোগ কোথায় পাবেন? আর জ্যেষ্ঠ কর্মীরাই যদি এআই ব্যবস্থাপনায় ব্যস্ত থাকেন, তাহলে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়ার সময়ই বা মিলবে কতটা?
ব্যবস্থাপকেরাও যখন বিচ্ছিন্ন

কর্মীদের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ততা তৈরিতে ব্যবস্থাপকদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে গ্যালাপের গবেষণায় উঠে এসেছে। কিন্তু ভারতেও ব্যবস্থাপকদের মধ্যে কাজ নিয়ে অনাগ্রহ ও একঘেয়েমি বাড়ছে। সাধারণ কর্মীদের তুলনায় তাঁদের সম্পৃক্ততা এখনো বেশি, তবে সেই আগ্রহ কমার গতিও দ্রুত।
গ্যালাপের হিসাব অনুযায়ী, কাজের প্রতি এই অনাগ্রহের কারণে ভারতের বছরে ৩৫ হাজার ১০০ কোটি ডলার ক্ষতি হচ্ছে। এআই যদি কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা তৈরির প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে, তবে উৎপাদনশীলতার এই ক্ষতি আরও বাড়তে পারে।
ভারতের সামনে চ্যালেঞ্জ তাই শুধু এআইয়ের কারণে কতটি চাকরি বিলুপ্ত হবে, তা নির্ধারণ করা নয়। প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন কর্মীদের শেখার পথও খোলা রাখতে হবে। কর্মক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সংকুচিত হলে ভবিষ্যতের কর্মশক্তির ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে।
যে দেশে কোটি কোটি তরুণ হোয়াইট কলার চাকরির মাধ্যমে মধ্যবিত্ত জীবন গড়ার সুযোগ খুঁজছেন, সেখানে একদিকে শিক্ষিত বেকারদের ক্ষোভ আর অন্যদিকে চাকরিতে থাকা মানুষের নীরব কর্মবিমুখতা—এই দুই প্রবণতা একসঙ্গে চলতে পারে না। ভারতের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এআই কত দ্রুত কাজ করাতে পারে, শুধু তার ওপর নয়; নতুন প্রজন্মকে কতটা দক্ষ করে তুলতে পারে, তার ওপরও।
অ্যান্ডি মুখার্জির আরও লেখা
সুদের ঝড়ের আগেই প্রস্তুতি: কেন এশিয়ার রিয়েল এস্টেট খাত এখন বেশি আত্মবিশ্বাসী
ডিজিটাল মুদ্রার নতুন লড়াইয়ে কেন উদ্বিগ্ন চীন











