বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে গভীর ও দ্রুত অগ্রগতির মাধ্যমে শক্তিশালী ইরান গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সৈয়দ মোজতবা খামেনি। তিনি বলেছেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের অবস্থান সুদৃঢ় করা এবং উদীয়মান বিশ্বব্যবস্থায় দেশটির ভূমিকা বাড়ানোর অন্যতম প্রধান ভিত্তি হবে বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা। এ লক্ষ্য অর্জনে গবেষণা, উদ্ভাবন, শিল্প এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
২৬ অক্টোবর তেহরানে বিজ্ঞান ও ক্রীড়ায় পদকজয়ীদের সম্মানে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাঁর বার্তা পাঠ করা হয়। জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, কম্পিউটার বিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মানবিকবিদ্যাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে সাফল্য অর্জনকারীদের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে ক্রীড়াক্ষেত্রে কৃতিত্ব দেখানো ব্যক্তিদের অভিনন্দন জানান তিনি।
মেধাবীদের দায়িত্ব দেশের অগ্রগতিতে
সর্বোচ্চ নেতা বলেন, মেধাবী হওয়া একটি বিশেষ আশীর্বাদ, তবে এর সঙ্গে সমাজ ও দেশের প্রতি বাড়তি দায়িত্বও যুক্ত। ব্যক্তিগত সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মেধাবীদের নিজেদের জ্ঞান ও দক্ষতা দেশের সমস্যা সমাধান এবং সামগ্রিক উন্নয়নে কাজে লাগাতে হবে।
তাঁর মতে, প্রতিভা বিকাশে পরিবার, শিক্ষক, বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মেধাবীদের এমন পরিবেশ দিতে হবে, যেখানে তাঁরা নিজেদের সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, বিজ্ঞান ও খেলাধুলায় পদক অর্জনই কৃতিত্বের একমাত্র মাপকাঠি নয়। দেশের উন্নতি, মানুষের কল্যাণ এবং জাতীয় মর্যাদা রক্ষায় ইতিবাচক অবদান রাখেন—এমন ব্যক্তিরাও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
গবেষণা থেকে বাস্তব সমস্যার সমাধান
ইরানের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির উদাহরণ তুলে ধরে মোজতবা খামেনি বলেন, দেশটির গবেষকেরা স্টেম সেল, ন্যানোপ্রযুক্তি, জীবপ্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা, চিকিৎসা, কৃষি, খনিজসম্পদ, পারমাণবিক শক্তি ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জ্ঞানকে বাস্তব প্রয়োগে রূপ দিয়েছেন।
তিনি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ইরানের নিজস্ব টারবাইন প্রযুক্তি, দক্ষিণাঞ্চলের দ্বীপগুলোতে সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করার প্রযুক্তি, কৃষিকাজে ড্রোনের ব্যবহার এবং বন্ধ্যত্বের চিকিৎসায় রয়্যান ইনস্টিটিউটের অগ্রগতির কথা উল্লেখ করেন। চিকিৎসায় তেজস্ক্রিয় ওষুধের ব্যবহার এবং দূর অনুধাবন প্রযুক্তির মাধ্যমে জমি ও ফসল পর্যবেক্ষণের বিষয়টিও তুলে ধরেন।
তাঁর বক্তব্যে খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষির উৎপাদনশীলতা এবং প্রতিরক্ষা খাতের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য করে শত্রুতার অভিযোগ
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে সক্ষমতা বাড়ানো দেশটির স্বাধীনতা ও আন্তর্জাতিক প্রভাবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর অভিযোগ, ইরানের বিজ্ঞানী ও মেধাবীদের বিরুদ্ধে শত্রুপক্ষের হামলা এবং হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে দেশের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি তাদের উদ্বেগের কারণ।
তিনি বলেন, এসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বিজ্ঞানী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অন্যান্য মেধাবীর আত্মত্যাগ দেশের অগ্রগতির আকাঙ্ক্ষাকে আরও শক্তিশালী করেছে। গত কয়েক দশকে ইরানের বৈজ্ঞানিক উন্নতির কথা উল্লেখ করে তিনি সাম্প্রতিক দুটি যুদ্ধের অভিজ্ঞতার পর গবেষণা ও প্রযুক্তিতে আরও দ্রুত অগ্রগতির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
জ্ঞানচর্চায় পাঁচটি অগ্রাধিকার
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে পাঁচটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মোজতবা খামেনি।
প্রথমত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান ও গণিতের মতো মৌলিক বিজ্ঞানের পাশাপাশি মানবিকবিদ্যায় কার্যকর পরিকল্পনা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, অমীমাংসিত বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধান এবং জ্ঞানের নতুন সীমা উন্মোচনে গবেষণা বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, সৃজনশীলতা, উদ্ভাবন ও বৈজ্ঞানিক আত্মবিশ্বাস উৎসাহিত করতে হবে।
চতুর্থত, দেশের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে স্বনির্ভরতা বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করতে হবে। পঞ্চমত, শিল্প ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করে তরুণ বয়স থেকেই প্রতিভা বিকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। পানি, মাটি, খাদ্য, জ্বালানি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে এ ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
গবেষণার সঙ্গে শিল্প, বাজার ও বাণিজ্যিক প্রয়োগের সংযোগ বাড়ানো এবং নীতিনির্ধারণে মেধাবীদের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বৈশ্বিক জ্ঞানচর্চায় ইরানের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা প্রকাশ করেন সর্বোচ্চ নেতা।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দ্রুত অগ্রগতিকে জাতীয় শক্তি বৃদ্ধির কেন্দ্রীয় শর্ত হিসেবে তুলে ধরে তিনি এমন এক ভবিষ্যতের প্রত্যাশা জানান, যেখানে গবেষণা, উদ্ভাবন ও মানবসম্পদের বিকাশের ভিত্তিতে শক্তিশালী ইরান গড়ে উঠবে।












