বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে আবাহনী শুধু একটি ক্লাবের নাম নয়; এটি স্বাধীনতার পর নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে চাওয়া একটি দেশের ক্রীড়াস্বপ্ন, তারুণ্যের উদ্যম এবং আধুনিক ক্রীড়াসংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রচেষ্টার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি প্রতিষ্ঠান। স্বাধীনতার পর দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে নতুনভাবে সাজানোর যে উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, আবাহনী তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
১৯৭২ সালে আবাহনী ক্রীড়াচক্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সেই স্বপ্ন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে শুরু করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল তখন কেবল একটি ফুটবল দল গড়তে চাননি; তাঁর লক্ষ্য ছিল এমন একটি ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান তৈরি করা, যেখানে দক্ষতা, শৃঙ্খলা, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা একসঙ্গে বিকশিত হবে। সময়ের সঙ্গে আবাহনী বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের পরিচিত ও প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
ধানমন্ডি থেকে আবাহনীর যাত্রা
আবাহনীর ইতিহাসের শিকড় ধানমন্ডির একটি মাঠকে ঘিরে। ষাটের দশকে মাঠটি রক্ষা করা এবং স্থানীয় তরুণদের খেলাধুলার সুযোগ তৈরির উদ্যোগের সঙ্গে শেখ কামাল ও তাঁর সহযোগীরা যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে সেই উদ্যোগ ক্রীড়া ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের একটি সংগঠিত পরিসর গড়ে তোলার ভিত্তি তৈরি করে।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে ইকবাল স্পোর্টিং ক্লাবের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে আবাহনী ক্রীড়াচক্র প্রথম বিভাগ ফুটবলে খেলার সুযোগ পায়। নতুন দেশের ক্রীড়াঙ্গনে তখন অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ ও সংগঠন—সব ক্ষেত্রেই বিকাশের প্রয়োজন ছিল। আবাহনীকে ঘিরে শেখ কামালের পরিকল্পনা সেই প্রয়োজনের মধ্যে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি সামনে আনে।
ফুটবলে আধুনিকতার ছাপ
আবাহনীর উত্থানে শেখ কামালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল ফুটবলকে আরও সংগঠিত ও আধুনিক করার চেষ্টা। সে সময় বাংলাদেশের ফুটবলে বিদেশি কোচ নিয়োগ ছিল ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ। আবাহনী ১৯৭৪ সালে আইরিশ কোচ উইলিয়াম ‘বিল’ হার্টকে দায়িত্ব দেয়। বিদেশি প্রশিক্ষকের অধীনে দল গড়ে তোলার এই উদ্যোগ ক্লাবটির আধুনিক প্রশিক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যকে স্পষ্ট করে।
আবাহনীর সঙ্গে কাজী সালাউদ্দীন, গোলাম সারওয়ার টিপুসহ দেশের পরিচিত ফুটবলারদের সম্পৃক্ততা দলটির প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বাড়ায়। প্রতিষ্ঠার কয়েক বছরের মধ্যেই আবাহনী দেশের শীর্ষ পর্যায়ের দলগুলোর সঙ্গে সমানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে শুরু করে। ১৯৭৪ সালে ক্লাবটি প্রথম বিভাগ ফুটবলের শিরোপা জেতে, যা ছিল তার প্রাথমিক অগ্রযাত্রার একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য।
ফুটবলের বাইরেও বহুমাত্রিক উদ্যোগ
শেখ কামালের ক্রীড়াভাবনা ফুটবলে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বাস্কেটবল, ক্রিকেট ও অ্যাথলেটিকসেও আগ্রহী ছিলেন। স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে তিনি বিভিন্ন খেলাধুলার প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। বাস্কেটবলে তাঁর সক্রিয়তা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ক্রিকেটেও তিনি খেলেছেন; ১৯৭৪ সালে আবাহনীর শিরোপাজয়ী ক্রিকেট দলের অধিনায়কত্ব করেছিলেন বলেও জানা যায়।
বিভিন্ন খেলায় তাঁর অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করেছিল। খেলোয়াড়দের প্রতিভা বিকাশ, প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো এবং একটি ক্লাবকে বহুমুখী ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার ভাবনাগুলো তাঁর উদ্যোগে গুরুত্ব পেয়েছিল। আবাহনীকে ঘিরে তাঁর পরিকল্পনায় তাই শুধু মাঠের ফলাফল নয়, খেলাধুলার সামগ্রিক পরিবেশ গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষাও ছিল।
মোহামেডানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের ফুটবলে আবাহনীর উত্থানের সঙ্গে আরেকটি বিষয় ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। দুই দলের লড়াই দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে এবং সময়ের সঙ্গে তা দেশের ফুটবলের অন্যতম পরিচিত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নেয়।
আবাহনী নতুন খেলোয়াড়, কোচিং পদ্ধতি ও দল গঠনের উদ্যোগের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে। ১৯৭৩ সালে প্রথম বিভাগে রানার্সআপ হওয়ার পর ১৯৭৪ সালে শিরোপা জয় ক্লাবটির অগ্রযাত্রাকে আরও দৃশ্যমান করে। পরবর্তী সময়ে আবাহনী ও মোহামেডানের মুখোমুখি লড়াই বাংলাদেশের ফুটবল সংস্কৃতির পরিচিত অংশ হয়ে ওঠে।
ট্র্যাজেডির পরও থেমে থাকেনি আবাহনী
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যের সঙ্গে শেখ কামালও নিহত হন। তাঁর মৃত্যু আবাহনীর জন্য ছিল প্রতিষ্ঠাতাকে হারানোর শোকাবহ ঘটনা। দেশের ক্রীড়াঙ্গনও হারায় একজন সক্রিয় সংগঠককে।
তাঁর মৃত্যুর পর আবাহনীর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। তবে ক্লাবের কর্মকর্তা, খেলোয়াড় ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠানটি টিকে থাকে এবং পরবর্তী বছরগুলোতে সাফল্যের ধারায় ফিরে আসে। ১৯৭৭ সালে আবাহনী প্রথম বিভাগ ফুটবলের শিরোপা পুনরুদ্ধার করে। পরবর্তী সময়ে ক্লাবটি বাংলাদেশের ফুটবলের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রাখে।
একটি ক্লাবের চেয়ে বড় উত্তরাধিকার
আবাহনীর ইতিহাস শেখ কামালের স্বপ্নের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। শুধু একটি ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেই থেমে না থেকে তিনি আধুনিক প্রশিক্ষণ, বহুমুখী ক্রীড়াচর্চা এবং সংগঠিত ব্যবস্থাপনার যে ধারণা সামনে এনেছিলেন, তা বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।
আজ আবাহনী লিমিটেড দেশের পরিচিত ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। তবে এর পরিচয় কেবল শিরোপা, খেলোয়াড় কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রতিষ্ঠার পেছনে ছিল স্বাধীনতার পর একটি নতুন দেশের তরুণদের বড় স্বপ্ন দেখার সুযোগ সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা।
আবাহনীকে ঘিরে শেখ কামালের উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী একটি পরিচয় তৈরি করেছে। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে তাঁর অবদান স্মরণ করার অর্থ শুধু অতীতের একজন সংগঠককে স্মরণ করা নয়; বরং সেই সময়ের আধুনিক, শৃঙ্খলাপূর্ণ ও বহুমুখী ক্রীড়াব্যবস্থা গড়ার স্বপ্নটিকেও নতুন করে দেখা।
আবাহনী বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ঐতিহ্য, আধুনিক প্রশিক্ষণ, তারকাখচিত দল এবং মোহামেডানের সঙ্গে দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতা কীভাবে ক্লাবটিকে দেশের ক্রীড়াঙ্গনের পরিচিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে, সেই ইতিহাস ফিরে দেখা।












