ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট এবং সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে। ভোট শেষে প্রধান টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর বুথফেরত জরিপে কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে দেশটিতে নতুন সরকার গঠন নিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক দর-কষাকষির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর এটিই ইসরায়েলের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। যুদ্ধকালীন নেতৃত্ব, ইরানকে ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।
ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবার ভোট পড়েছে ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ। দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটি দেশটির সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি।
বুথফেরত জরিপে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই
ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে অন্তত ৬১টি আসন প্রয়োজন। কিন্তু প্রধান তিনটি টেলিভিশন চ্যানেলের বুথফেরত জরিপে দুই জোটের মধ্যে ব্যবধান খুবই সামান্য।
সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম কান ১১ এবং চ্যানেল ১৩-এর জরিপে নেতানিয়াহু ও আইজেনকটের জোট—উভয়ই ৫১টি করে আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, চ্যানেল ১২-এর হালনাগাদ জরিপে নেতানিয়াহুর জোটকে ৫২টি এবং আইজেনকটের জোটকে ৪৯টি আসন দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, কোনো জরিপেই এককভাবে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখা যাচ্ছে না। ভোট গণনা শেষ হওয়ার আগে এসব পূর্বাভাসকে চূড়ান্ত ফল হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
নেতানিয়াহুর জোট এবারের নির্বাচনে যাওয়ার আগে নেসেটে ৬৮টি আসন নিয়ে ক্ষমতায় ছিল। বুথফেরত জরিপের পূর্বাভাস চূড়ান্ত ফলের সঙ্গে মিলে গেলে ক্ষমতাসীন জোটের জন্য তা বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হবে।
ছোট দলগুলোর হাতে সরকার গঠনের চাবি
ইসরায়েলের নির্বাচনী ব্যবস্থায় দলগুলো জাতীয় ভোটের অনুপাতে নেসেটের আসন পায়। তবে কোনো দল মোট ভোটের অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ না পেলে পার্লামেন্টে আসন পায় না।
কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারায় সরকার গঠনের জন্য সাধারণত একাধিক দলকে নিয়ে জোট করতে হয়। এবারের নির্বাচনেও দুই প্রধান জোটের বাইরে থাকা ছোট দলগুলো শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বুথফেরত জরিপে আরব-সংশ্লিষ্ট দলগুলো সম্মিলিতভাবে ১৭ থেকে ১৯টি আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এই আসনগুলো দুই প্রধান জোটের যেকোনো একটিকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি পৌঁছে দিতে পারত। তবে নেতানিয়াহু ও আইজেনকট—দুজনই আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন।
নেতানিয়াহুর জোটের মধ্যে কট্টর ডানপন্থী ও ধর্মীয় দলগুলো সম্মিলিতভাবে ১৩টি আসন পেতে পারে বলেও বুথফেরত জরিপে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ফলে জোট গঠনের আলোচনায় আদর্শিক অবস্থান ও রাজনৈতিক শর্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নেতানিয়াহুর প্রচারে যুদ্ধ ও ইরান
নির্বাচনী প্রচারে নেতানিয়াহু তাঁর যুদ্ধকালীন নেতৃত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়েছেন। ট্রাম্পও তাঁকে সমর্থন জানিয়েছেন।
ভোটের পর সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে নেতানিয়াহু বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জন এবং দেশটির ইসলামি শাসনব্যবস্থার হুমকি মোকাবিলা করা জরুরি। তাঁর ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে ইসরায়েল ইরানের হুমকি দূর করার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ পেয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলের জন্য একটি শক্তিশালী ডানপন্থী জাতীয় সরকার গঠন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আরব দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল কোনো সরকার গঠনের বিরোধিতা করেন তিনি।
আইজেনকটের প্রতিশ্রুতি পরিবর্তনের
অন্যদিকে, আইজেনকট নির্বাচনী ফলের প্রাথমিক পূর্বাভাসকে পরিবর্তনের পক্ষে জনসমর্থনের ইঙ্গিত হিসেবে তুলে ধরেছেন। তেল আবিবে নিজের দলের সদর দপ্তরে সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিয়েছে এবং ইসরায়েল একটি নতুন যুগের দিকে এগোচ্ছে।
তিনি সব ইসরায়েলির প্রতিনিধিত্ব করার এবং জনগণের ইচ্ছা বাস্তবায়নে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ভয়ভিত্তিক প্রচার চালানোর অভিযোগও তুলেছেন তিনি।
তবে চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পরই দুই জোটের প্রকৃত অবস্থান স্পষ্ট হবে। এরপর শুরু হবে সরকার গঠনের আলোচনা। ইসরায়েলের বিভক্ত রাজনৈতিক বাস্তবতায় ছোট দলগুলোর শর্ত, জোটের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করার সক্ষমতাই নির্ধারণ করবে দেশটির পরবর্তী সরকার কারা গঠন করবে।
ইসরায়েলের নির্বাচনে মূল প্রশ্ন এখন শুধু কে বেশি আসন পেল, তা নয়; বরং কে প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের সমর্থন জোগাড় করে স্থিতিশীল সরকার গঠন করতে পারবে।












