দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। চাঁদে মানুষ পাঠানো, আধুনিক কম্পিউটারের বিকাশ এবং মানবজিনের বিন্যাস নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্জনে দেশটির বিজ্ঞানীরা রেখেছেন অসামান্য অবদান। এসব সাফল্যের পেছনে ছিল সরকারি অর্থায়ন, বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় গবেষণাগারের সম্মিলিত উদ্যোগ। তবে সময়ের সঙ্গে সেই গবেষণাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে। নতুন ধারণার বিকাশে বাধা, অর্থায়নের জটিলতা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় চীনের ক্রমবর্ধমান অগ্রগতি যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন পথ খুঁজতে বাধ্য করছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্বাধীন গবেষণাগারকে বিজ্ঞানচর্চার নতুন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ জোরালো হচ্ছে।
বিজ্ঞান গবেষণার প্রচলিত ব্যবস্থার সমালোচকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে মৌলিক গবেষণার জন্য অর্থ বরাদ্দের বড় অংশ কয়েকটি কমিটি ও প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। ফলে প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে কাজ করতে চান, এমন গবেষকেরা প্রায়ই পিছিয়ে পড়েন। আবার একাধিক শাখার জ্ঞান একত্র করে গবেষণার প্রয়োজনীয়তা বাড়লেও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিভাগভিত্তিক কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে সেই কাজের উপযোগী নয়। অন্যদিকে, গবেষণা ও উন্নয়নে চীনের বিনিয়োগ দ্রুত বাড়ছে। ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে হিসাব করলে দেশটির গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি পৌঁছেছে। ২০২৪ সালে মর্যাদাপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণার একটি সূচক নেচার ইনডেক্সেও চীন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যায়।
এই বাস্তবতায় বিজ্ঞান কীভাবে আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, তা নিয়ে কাজ করছেন ‘মেটাসায়েন্স’ বা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণাকারীরা। তাঁদের ধারণা, বিজ্ঞানচর্চায় নতুনত্ব আনতে শুধু অর্থ বাড়ালেই হবে না; গবেষণায় অর্থায়নের পদ্ধতি, প্রতিষ্ঠান পরিচালনার কাঠামো এবং ব্যর্থতার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে হবে। গত পাঁচ বছরে প্রতিষ্ঠিত বেশ কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা এখন এই ধারণাগুলো বাস্তবে প্রয়োগের চেষ্টা করছে।
বেসরকারি গবেষণাগারের পুরোনো ইতিহাস
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞান গবেষণার ধারণা অবশ্য নতুন নয়। বিংশ শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্রের বহু গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবর্তে বড় বড় কোম্পানির গবেষণাগারে হয়েছে। টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান এটিঅ্যান্ডটির গবেষণাকেন্দ্র বেল ল্যাবস, ফটোকপি যন্ত্র নির্মাতা জেরক্সের গবেষণাগার জেরক্স পিএআরসি এবং আইবিএম রিসার্চ থেকে এসেছে আধুনিক প্রযুক্তির বহু ভিত্তিমূলক উদ্ভাবন। এসব প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা ট্রানজিস্টরসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি উদ্ভাবনে ভূমিকা রেখেছেন এবং তাঁদের মধ্যে কয়েকজন নোবেল পুরস্কারও পেয়েছেন।
তবে সাফল্য থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘমেয়াদে এসব গবেষণাগার পরিচালনার ব্যয় অনেক প্রতিষ্ঠানের কাছে লাভজনক মনে হয়নি। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম নর্ডহাউসের ২০০৪ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সামগ্রিক অর্থনীতিতে উদ্ভাবন থেকে সৃষ্ট মূল্যের মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ কোম্পানিগুলোর কাছে পৌঁছেছিল। এই পরিস্থিতিতে অনেক প্রতিষ্ঠান নিজস্ব গবেষণাগারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কমিয়ে দেয়। এর পরিবর্তে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে আসা নতুন প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ বা স্টার্টআপ কিনে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ে। অর্থাৎ, নিজেরা গবেষণা করার পরিবর্তে অন্যের উদ্ভাবন অধিগ্রহণের দিকে ঝুঁকে পড়ে কোম্পানিগুলো।
এর ফলে মৌলিক গবেষণার জন্য সরকারি অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যায়। কিন্তু বেসরকারি বিজ্ঞান গবেষণার সমর্থকদের মতে, এই কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থার কারণে অনেক সম্ভাবনাময় ধারণা প্রয়োজনীয় অর্থ পায় না।
ইনস্টিটিউট ফর প্রোগ্রেসের ক্যালেব ওয়াটনির মতে, গবেষণার অর্থায়ন সীমিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকলে সমাজের উপকারে আসতে পারে—এমন বহু নতুন ধারণা বাস্তবায়নের সুযোগ হারায়। ২০২৫ সালে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির পিয়েরে আজুলে ও হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের ওয়েসলি গ্রিনব্ল্যাটের করা এক গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের এক লাখ গবেষণা অনুদানের আবেদন বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, প্রচলিত ধারণার সঙ্গে মেলে না—এমন পদ্ধতি অনুসরণ করা গবেষণাগুলোর পরবর্তী পর্যায়ে অর্থায়ন পাওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম ছিল।
অর্থ সংগ্রহের প্রক্রিয়াটিও গবেষকদের জন্য বড় বাধা। একটি জরিপ অনুযায়ী, গবেষকেরা তাঁদের মোট সময়ের প্রায় ৪৪ শতাংশ ব্যয় করেন প্রশাসনিক কাজে। এর মধ্যে রয়েছে গবেষণার প্রস্তাব লেখা, প্রতিবেদন তৈরি এবং অর্থায়নসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা। ফলে নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও আবিষ্কারের জন্য তাঁদের হাতে সময় কমে যায়।
এ ক্ষেত্রে প্রায়ই উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয় জীববিজ্ঞানী কাটালিন কারিকোর কথা। তাঁর গবেষণা কোভিড-১৯-এর টিকাসহ বার্তাবাহক আরএনএ বা এমআরএনএ প্রযুক্তিভিত্তিক টিকা তৈরির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে তাঁর গবেষণার প্রস্তাবগুলোকে অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করে অর্থায়নকারীরা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি গবেষণা চালিয়ে যেতে পেরেছিলেন। তবে গুড সায়েন্স প্রজেক্টের স্টুয়ার্ট বাকের মতে, একই পরিস্থিতিতে পড়া অনেক গবেষক হয়তো বিজ্ঞানচর্চাই ছেড়ে দিতেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে গবেষণায় সরকারি উদ্যোগ
বৈজ্ঞানিক গবেষণার এই সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা এখন যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও পৌঁছেছে। ২১ জুলাই প্রকাশিত এক সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের সবচেয়ে উদ্ভাবনী বৈজ্ঞানিক গবেষণার একমাত্র কেন্দ্র হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়কে বিবেচনা করা উচিত নয়। বরং বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠানকে অর্থায়নের সুযোগ দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থাগুলোকে ঝুঁকি গ্রহণে আগ্রহী বিনিয়োগকারীদের মতো কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন প্রথম পর্যায়ে দেড় বিলিয়ন ডলার বরাদ্দের উদ্যোগ নিয়েছে। এই অর্থ দিয়ে গড়ে তোলা হবে নতুন ধরনের ‘এক্স-ল্যাব’, যেগুলো প্রচলিত গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে যুগান্তকারী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিকাশে কাজ করবে।
একই ধরনের উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথেও চালুর জন্য কংগ্রেসে একটি দ্বিদলীয় বিল প্রস্তাব করা হয়েছে। বিলটির অন্যতম উদ্যোক্তা ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জশ হার্ডার জানান, স্বাস্থ্য গবেষণার এই সংস্থাটির বাজেট তুলনামূলক বড় হওয়ায় সেখানে এমন উদ্যোগের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।
এ ছাড়া প্রচলিত মূল্যায়নব্যবস্থায় যেসব ব্যতিক্রমী গবেষণার প্রস্তাব অনুমোদন পাওয়ার সম্ভাবনা কম, সেগুলোর জন্য বিশেষ অর্থায়নের ব্যবস্থা করার কথাও বিবেচনা করা হচ্ছে। কিছু পরিকল্পনায় নির্দিষ্ট প্রকল্পের পরিবর্তে গবেষকদের দীর্ঘমেয়াদে অর্থ দেওয়ার ধারণাও রয়েছে। এতে গবেষকেরা একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণের চাপে না থেকে নতুন প্রশ্ন অনুসন্ধান এবং গবেষণার দিক পরিবর্তনের সুযোগ পাবেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের বাজেট নিয়ে উদ্বেগ
তবে এই উদ্যোগ ঘিরে বিজ্ঞানীদের মধ্যে উদ্বেগও রয়েছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রে বিজ্ঞানকে নতুন স্বর্ণযুগে নিয়ে যাওয়ার কথা বললেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন একই সময়ে গবেষণায় সরকারি ব্যয় কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে। ২০২৭ অর্থবছরের জন্য হোয়াইট হাউসের প্রস্তাবিত বাজেটে ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের বরাদ্দ প্রায় অর্ধেক করার কথা বলা হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, কম অর্থকে আরও বেশি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভাগ করে দিতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত গবেষণাগারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নতুন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ দিতে গিয়ে পুরোনো গবেষণাব্যবস্থার অর্থায়ন কমিয়ে দিলে সামগ্রিক গবেষণার সক্ষমতাই দুর্বল হতে পারে।
হোয়াইট হাউসের বিজ্ঞানবিষয়ক প্রধান মাইকেল ক্রাটসিওস অবশ্য এই আশঙ্কার সঙ্গে একমত নন। তাঁর বক্তব্য, প্রশাসন সামগ্রিক গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাবও দিয়েছে, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা খাতে। প্রতিরক্ষাবিষয়ক গবেষণা থেকে অতীতে স্বয়ংক্রিয় ওষুধপ্রয়োগকারী এপিপেন, পোকামাকড় তাড়ানোর উপকরণ এবং চালকবিহীন গাড়ির মতো প্রযুক্তির বিকাশে সহায়তা এসেছে।
ক্রাটসিওসের মতে, বিজ্ঞাননীতির সাফল্য শুধু বাজেটের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা ঠিক নয়। তাঁর ভাষায়, গবেষণা খাতের অনেক সংগঠন অর্থ বরাদ্দের হিসাবের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সীমিত সম্পদের মধ্যে নিজেদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন না হয়ে নতুন গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
তবে এই যুক্তির বিপরীতে প্রশ্ন রয়েছে—সরকারি অর্থায়ন কমিয়ে দিলে নতুন প্রতিষ্ঠানগুলো কি সত্যিই গবেষণার ঘাটতি পূরণ করতে পারবে, নাকি এতে অর্থ ও সুযোগের প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে?
কনভার্জেন্ট রিসার্চের নতুন মডেল
নীতিগত বিতর্কের পাশাপাশি বেসরকারি বিজ্ঞান গবেষণার বেশ কিছু পরীক্ষামূলক উদ্যোগ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ম্যাসাচুসেটসভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান কনভার্জেন্ট রিসার্চ। ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থা ‘ফোকাসড রিসার্চ অর্গানাইজেশন’ বা এফআরও গড়ে তুলতে অর্থায়ন করে।
এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য শুধু তাত্ত্বিক গবেষণাপত্র প্রকাশ করা নয়; বরং নির্দিষ্ট কোনো বৈজ্ঞানিক সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি বা উপকরণ তৈরি করা। সংস্থাটির সহপ্রতিষ্ঠাতা আনাস্তাসিয়া গ্যামিক ও অ্যাডাম মার্বেলস্টোন জানান, প্রতিটি উদ্যোগকে সাধারণত দুই কোটি থেকে পাঁচ কোটি ডলার পর্যন্ত অর্থ দেওয়া হয়। গবেষণার জন্য বরাদ্দ থাকে তিন থেকে সাত বছর। প্রকল্প শেষ হলে গবেষণার ফলাফল কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সে সিদ্ধান্ত নিতেও সহায়তা করে সংস্থাটি।
কনভার্জেন্টের অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রকল্পে এমন জীব নিয়ে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ তৈরি করা হচ্ছে, যেগুলো প্রচলিত গবেষণায় সাধারণত ব্যবহৃত হয় না। আরেকটি প্রকল্পে এমন একটি প্রযুক্তি তৈরি করা হচ্ছে, যা আল্ট্রাসাউন্ড তরঙ্গ ব্যবহার করে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ পড়তে পারে।
এই মডেলের উদ্দেশ্য হলো গবেষকদের দীর্ঘমেয়াদি সময় ও পর্যাপ্ত সম্পদ দেওয়া, যাতে তাঁরা শুধু একটি গবেষণাপত্র প্রকাশের পরিবর্তে ব্যবহারযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি তৈরি করতে পারেন।
এপিস্টেমে গবেষকদের স্বাধীনতা
বেসরকারি বিজ্ঞান গবেষণার আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ এপিস্টেম। ২০২৫ সালে ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যান এবং তখন তুলনামূলক অপরিচিত গবেষক লুই আন্দ্রে প্রতিষ্ঠানটি চালু করেন।
এপিস্টেমের লক্ষ্য, গবেষকদের ওপর আগেভাগে নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ কিংবা নির্দিষ্টসংখ্যক গবেষণাপত্র প্রকাশের বাধ্যবাধকতা না চাপিয়ে তাঁদের কাজের স্বাধীনতা দেওয়া। প্রতিষ্ঠানটির অর্থায়ন পাওয়া গবেষকেরা সাধারণত তাঁদের গবেষণার একটি প্রাথমিক ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করেন। তবে প্রয়োজন হলে তাঁরা গবেষণার পথ পরিবর্তন করতে পারেন।
লুই আন্দ্রের মতে, বিজ্ঞান গবেষণায় কোনো ধারণা ব্যর্থ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তাই একটি পদ্ধতি কাজ না করলে গবেষককে বিকল্প পথ অনুসন্ধানের সুযোগ দিতে হবে। আগে থেকে নির্ধারিত পরিকল্পনার সঙ্গে নিজেকে আটকে রাখলে নতুন আবিষ্কারের সম্ভাবনা কমে যেতে পারে।
পদার্থবিজ্ঞানী চার্লস মার্কাস এপিস্টেমে যোগ দিতে ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী অধ্যাপনার পদ ছেড়েছেন। তাঁর মতে, প্রচলিত বিশ্ববিদ্যালয়ব্যবস্থায় বিভিন্ন বিভাগের গবেষকদের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ও কাঠামোগত বাধা থাকে। এপিস্টেমে তিনি সেই সীমাবদ্ধতা ছাড়াই বিভিন্ন শাখার গবেষকদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন।
এখানে গবেষকদের অনুদানের জন্য দীর্ঘ আবেদনপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয় না। নতুন জুনিয়র গবেষক নিয়োগের জন্যও মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয় না। গবেষণাপত্র প্রকাশকে উৎসাহিত করা হলেও তা বাধ্যতামূলক নয়। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে—গবেষণাটি থেকে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি হতে হবে।
এই শর্তই এপিস্টেমের মডেলের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে। কারণ, বিজ্ঞানের বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দীর্ঘমেয়াদি মৌলিক গবেষণা প্রয়োজন, যার তাৎক্ষণিক বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নাও থাকতে পারে। এসব গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব থেকেই যাবে।
ব্যর্থতা থেকে শেখার সুযোগ
বেসরকারি গবেষণার প্রতিটি উদ্যোগ যে সফল হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি জৈবচিকিৎসা গবেষণাপ্রতিষ্ঠান অ্যারেনা বায়োওয়ার্কস দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। প্রতিষ্ঠানটির অর্থায়নকারীরা দ্রুত আর্থিক ফল আশা করেছিলেন বলে প্রতিবেদন রয়েছে।
এপিস্টেমের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন বলে দাবি করেছেন লুই আন্দ্রে। তাঁর বক্তব্য, প্রতিষ্ঠানটির পেছনে ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে অর্থ বিনিয়োগ করা অর্থদাতারা দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এপিস্টেম কোনো একটি নির্দিষ্ট গবেষণাক্ষেত্রের ওপরও পুরোপুরি নির্ভরশীল নয়। ফলে একটি প্রকল্প ব্যর্থ হলে তার জন্য বরাদ্দ সম্পদ অন্য গবেষণায় ব্যবহার করা সম্ভব।
আন্দ্রের মতে, কোনো গবেষণা কর্মসূচি প্রত্যাশিত ফল না দিলে সেটিকে বন্ধ করে সম্পদ অন্য কাজে লাগানো যেতে পারে। এতে একটি প্রকল্পের ব্যর্থতা পুরো প্রতিষ্ঠানকে বিপর্যস্ত করে দেওয়ার আশঙ্কা কমে।
কনভার্জেন্ট রিসার্চের মার্বেলস্টোনের মতে, সরকারি সহায়তা, স্বাধীন গবেষণা উদ্যোগ এবং এআইনির্ভর নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে বেসরকারি বিজ্ঞান গবেষণার জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার পেছনে সরকারি অর্থায়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক গবেষণাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এখন সেই ব্যবস্থার পাশাপাশি বেসরকারি গবেষণাগারকে কতটা কার্যকরভাবে গড়ে তোলা যায়, সেটিই বড় প্রশ্ন। নতুন মডেলগুলো সফল হলে বিজ্ঞানীরা প্রচলিত কাঠামোর বাইরে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পাবেন এবং নতুন আবিষ্কারের পথ খুলতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি মৌলিক গবেষণার অর্থায়ন, বাণিজ্যিক স্বার্থের বাইরে থাকা বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাই এটি কেবল গবেষণায় অর্থায়নের নতুন পদ্ধতি চালুর বিষয় নয়; বরং বৈশ্বিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব ধরে রাখার একটি বড় পরীক্ষা। বেসরকারি উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে নতুন ধারণাকে সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা এবং জনস্বার্থে বিজ্ঞানচর্চার ভারসাম্য রক্ষা করা যায় কি না, তার ওপর।












