প্রায় পাঁচ দশক আগে ধারণ করা ব্রিটিশ রক সংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী ডেভিড বাউইয়ের একটি অপ্রকাশিত কনসার্টের দৃশ্য এবার ফিরছে নতুন রূপে। ১৯৭৮ সালে লন্ডনের আর্লস কোর্ট অ্যারেনায় ধারণ করা সেই কনসার্টের পুরোনো ৩৫ মিলিমিটার চলচ্চিত্রকে আধুনিক প্রযুক্তিতে পুনরুদ্ধার করে তৈরি করা হয়েছে ‘স্টেজ’ (Stage) নামের একটি বিশেষ আয়োজন। আগামী বছর বিভিন্ন দেশের বড় বড় সংগীতমঞ্চে এটি প্রদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বাউইয়ের ১৯৭৮ সালের ‘আইসোলার টু’ (Isolar II) সফরের অংশ ছিল ওই কনসার্ট। দীর্ঘদিন ধরে এর দৃশ্য সংগীতপ্রেমীদের কাছে ছিল প্রায় অমূল্য এক সংগ্রহ। এবার চলচ্চিত্র নির্মাতা ব্রেট মরগেনের দীর্ঘ পরিশ্রমে সেই দৃশ্য নতুনভাবে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। মরগেন এর আগে বাউইকে নিয়ে নির্মিত প্রশংসিত প্রামাণ্যচিত্র ‘মুনেজ ডেড্রিম’-এর পরিচালক হিসেবে পরিচিতি পান।
নতুন সংস্করণ তৈরির জন্য তিনি মূল চলচ্চিত্রের রং সংশোধন, আলোর বিন্যাস উন্নত করা এবং দৃশ্যের বিভিন্ন অংশ হাতে পুনর্গঠনের মতো কাজ করেছেন। লক্ষ্য ছিল, পুরোনো ফুটেজের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে কনসার্টের পরিবেশ ও বাউইয়ের মঞ্চ উপস্থিতিকে যতটা সম্ভব প্রাণবন্ত করে তোলা।
কেন প্রকাশ করতে চাননি বাউই
১৯৭৮ সালের গ্রীষ্মে লন্ডনের আর্লস কোর্টে দুটি কনসার্ট ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল পরিচালক ডেভিড হেমিংসকে। অনুষ্ঠানগুলোর মূল আকর্ষণ ছিল বাউইয়ের ‘লো’ (Low) ও ‘হিরোজ’ (Heroes) অ্যালবামের গান। এর কিছুদিন আগে হেমিংসের পরিচালনায় ‘জাস্ট আ জিগোলো’ চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছিলেন বাউই। ছবিটিতে তাঁর সহশিল্পী ছিলেন মার্লেন ডিট্রিখ।
বাউইয়ের পরিকল্পনা ছিল, ধারণ করা কনসার্টের দৃশ্য নিয়ে একটি চলচ্চিত্র তৈরি করা হবে। এর মাধ্যমে তিনি নিজে নিয়মিত সফরে না গিয়েও বিভিন্ন সংগীতমঞ্চে দর্শকদের সামনে উপস্থিত হতে পারতেন। ‘আইসোলার টু’ সফরের পর ১৯৮৩ সালের ‘সিরিয়াস মুনলাইট’ সফরের আগে তিনি আর কোনো কনসার্ট সফরে যাননি।
১৯৭৮ সালের শরতে অবশ্য ওই সফরের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ধারণ করা গান নিয়ে ‘স্টেজ’ নামে একটি সরাসরি পরিবেশনার অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু লন্ডনের আর্লস কোর্টের কনসার্টের চলচ্চিত্রটি আর প্রকাশ করা হয়নি।
২০০০ সালে বাউই নিজেই এর কারণ ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর ভাষ্য ছিল, চলচ্চিত্রটি যেভাবে ধারণ করা হয়েছিল, তা তাঁর পছন্দ হয়নি। তবে পরে সেটি দেখতে বেশ ভালো লাগছিল এবং ভবিষ্যতে কোনো একসময় প্রকাশিত হতে পারে বলেও তিনি আশা করেছিলেন।
দীর্ঘদিন ধরে অপ্রকাশিত এই দৃশ্য বাউইয়ের ভক্তদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের বিষয় হয়ে ছিল। তাঁর ক্যারিয়ারের আরও কিছু দুর্লভ পরিবেশনার মতো এটিও সংগীতপ্রেমীদের আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৬৬ সালে ‘রেডি স্টেডি গো!’ অনুষ্ঠানে ডেভিড বাউই অ্যান্ড দ্য বাজ নামে তাঁর টেলিভিশনে প্রথম দিককার উপস্থিতি এবং ১৯৭২ সালে ‘লিফট অফ উইথ আয়শিয়া’ অনুষ্ঠানে ‘স্টারম্যান’ গানের পরিবেশনা। পরে ‘টপ অব দ্য পপস’-এ গানটির পরিবেশনা যুক্তরাজ্যের তরুণ দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল।
পুরোনো ফুটেজ থেকে নতুন অভিজ্ঞতা
‘মুনেজ ডেড্রিম’ নির্মাণের দায়িত্ব পাওয়ার পর মরগেন হেমিংসের মূল চলচ্চিত্রটি দেখার আগ্রহ প্রকাশ করেন। সেখান থেকে ‘হিরোজ’ গানের কিছু দৃশ্য তাঁর প্রামাণ্যচিত্রে ব্যবহার করা হয়। ২০২৪ সালের গ্র্যামি পুরস্কারে সংগীতভিত্তিক চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর প্রকল্পটির প্রতি আগ্রহ আরও বাড়ে। তবে কনসার্টের দৃশ্যকে বড় বড় অ্যারেনায় প্রদর্শনের ধারণাটি আসে ২০১৮ সালে।
বাউইয়ের ভক্তদের ওয়েবসাইট ‘ডেভিড বাউই ওয়ার্ল্ড’-এর মতে, আর্লস কোর্টের এই পরিবেশনাগুলো তাঁর সত্তরের দশকের শেষ ভাগের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্রিটিশ কনসার্টগুলোর মধ্যে পড়ে।
সে সময় বাউই আগের বছরগুলোর জাঁকজমকপূর্ণ মঞ্চচরিত্র থেকে কিছুটা সরে এসেছিলেন। তাঁর পরিবেশনায় তখন সংগীতের কারিগরি দিক, বাদ্যযন্ত্রের বিন্যাস, শব্দের বৈশিষ্ট্য এবং সামগ্রিক আবহ আরও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছিল। ফলে ওই সময়ের কনসার্টগুলো তাঁর শিল্পীসত্তার পরিবর্তন বোঝার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৭৮ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চলে ‘আইসোলার টু’ সফর। কনসার্টের প্রথম অংশে গুরুত্ব পেয়েছিল ‘লো’ ও ‘হিরোজ’ অ্যালবামের গান। দ্বিতীয় অংশে ছিল তাঁর সত্তরের দশকের শুরুর দিকের জনপ্রিয় গান, যার মধ্যে ‘জিগি স্টারডাস্ট অ্যান্ড দ্য স্পাইডার্স ফ্রম মার্স’ পর্বের গানও ছিল উল্লেখযোগ্য।
এই সফরে বাউইয়ের সঙ্গে ছিলেন গিটারবাদক কার্লোস আলোমার, বেজবাদক জর্জ মারে, ড্রামার ডেনিস ডেভিস, কিবোর্ডবাদক রজার পাওয়েল, পিয়ানোবাদক শন মেইস এবং বেহালাবাদক সাইমন হাউস। সংগীতবিষয়ক সাময়িকী ‘এনএমই’-এর সমালোচক নিক কেন্ট এই দলকে বাউইয়ের সেরা ব্যান্ড বলে অভিহিত করেছিলেন। সংগীতশিল্পী ও প্রযোজক ব্রায়ান এনোও এই সফরের দলে থাকার কথা ছিল, কিন্তু স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে শেষ পর্যন্ত যোগ দিতে পারেননি।
আর্লস কোর্টের কনসার্ট নিয়ে কেন্টের পর্যালোচনা ছিল উচ্ছ্বসিত। তাঁর মতে, বাউই পুরো সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন, তাঁর চলাফেরায় ছিল সাবলীলতা ও শারীরিক সৌন্দর্য। গানের সময় তাঁর কণ্ঠও ছিল অসাধারণ। বাউইয়ের সংগীতের পরিচিত ঝলমলে শব্দ, প্রাণবন্ত আবহ ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য সবই সেই পরিবেশনায় স্পষ্ট ছিল। অনুষ্ঠানটি তাঁকে মুগ্ধ করেছে, বিনোদন দিয়েছে এবং কিছু মুহূর্তে প্রায় সম্মোহিত করে রেখেছিল বলেও লিখেছিলেন তিনি।
মঞ্চে যেন জীবন্ত বাউই
নতুন ‘স্টেজ’ আয়োজনে কনসার্টের দৃশ্য একাধিক পর্দায় দেখানো হবে। এর সঙ্গে থাকবে বিশেষ আলোকসজ্জা এবং চারপাশ থেকে ঘিরে রাখা যায় এমন শব্দব্যবস্থা। আলোকসজ্জার নকশা তৈরি করেছেন প্যাট্রিক উডরফ, আর শব্দের নতুন বিন্যাসের দায়িত্বে রয়েছেন পল ম্যাসি।
আধুনিক স্বচ্ছ এলইডি পর্দা ব্যবহার করে এমন একটি দৃশ্যমান পরিবেশ তৈরি করা হবে, যাতে মনে হবে বাউই ও তাঁর ব্যান্ড যেন দর্শকদের সামনে সত্যিকার অর্থেই মঞ্চে উপস্থিত। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই প্রযুক্তি দর্শকদের একটি পূর্ণাঙ্গ রক কনসার্টের আবহে নিয়ে যাবে। পুরোনো কনসার্টের চলচ্চিত্রকে এভাবে বড় পরিসরে উপস্থাপনের অভিজ্ঞতা হবে ব্যতিক্রমী।
প্রকল্পটির ট্রেলারেও রয়েছে একটি আকর্ষণীয় গল্প। সেখানে দেখা যায়, চিতাবাঘের ছাপযুক্ত জ্যাকেট পরা এক তরুণ তাঁর বান্ধবীর সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি মার্ক অ্যাডামস, যিনি ২১ বছর পর বাউইয়ের সঙ্গে কাজ শুরু করেন এবং এখনো সেই কাজের সঙ্গে যুক্ত। সম্প্রতি তাঁকে ওই পুরোনো ফুটেজ দেখানো না হলে এর অস্তিত্ব সম্পর্কে তাঁরও কোনো ধারণা ছিল না।
‘স্টেজ’-এর প্রথম প্রদর্শনী হবে আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য ৭৭তম বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে। এরপর এটি বিভিন্ন সংগীতমঞ্চে প্রদর্শনের জন্য সফর করবে।
প্রকল্পটির পরিচালক ব্রেট মরগেন এর আগে কার্ট কোবেইনকে নিয়ে ‘মন্টাজ অব হেক’ এবং রোলিং স্টোনসকে নিয়ে ‘ক্রসফায়ার হারিকেন’ প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। অন্যদিকে প্যাট্রিক উডরফ আব্বা, রোলিং স্টোনস ও মাইকেল জ্যাকসনের মতো শিল্পীদের মঞ্চের আলোকসজ্জা নিয়ে কাজ করেছেন। ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিকের আয়োজনেও তাঁর ভূমিকা ছিল।
বাউইয়ের মৃত্যুর পরও তাঁর সংগীত ও মঞ্চশৈলী নতুন প্রজন্মের কাছে আকর্ষণ ধরে রেখেছে। এবার প্রায় ৫০ বছর আগের অপ্রকাশিত কনসার্টকে আধুনিক প্রযুক্তিতে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ সেই উত্তরাধিকারকে নতুনভাবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করছে। পুরোনো চলচ্চিত্রের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে দর্শকরা এমন এক পরিবেশনার মুখোমুখি হতে পারবেন, যা একসময় প্রকাশের অপেক্ষাতেই থেকে গিয়েছিল।












