রাতের অন্ধকারে হঠাৎ পাহাড়ের দিক থেকে নেমে আসছে তীব্র আলো। চারপাশের মরুভূমি দিনের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার একটি প্রত্যন্ত এলাকার বাসিন্দারা সম্প্রতি এমন অস্বাভাবিক দৃশ্য দেখে বিস্মিত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ আলোকে এতটাই তীব্র বলে বর্ণনা করেছেন যে তা চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার মতো। পরে জানা যায়, এটি কোনো রহস্যময় ঘটনা নয়; মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে রাতেও আলো ছড়িয়ে দেওয়ার একটি প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক প্রদর্শনী।
এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন মহাকাশপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান রিফ্লেক্ট অরবিটাল। প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা, আগামী এক দশকে মহাকাশে ৫০ হাজার বিশাল আয়নাযুক্ত উপগ্রহ পাঠানো। এসব আয়নার সাহায্যে সূর্যের আলো পৃথিবীর নির্দিষ্ট অঞ্চলে প্রতিফলিত করা হবে, যাতে রাতের বেলাতেও প্রয়োজন অনুযায়ী আলো পাওয়া যায়।
ক্যালিফোর্নিয়ার সিয়েরা নেভাদা অঞ্চলের লোন পাইন শহরের কাছে চলতি মাসের শুরুর দিকে এই প্রযুক্তির একটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। মাউন্ট হুইটনির কাছাকাছি স্থাপন করা হয়েছিল বড় আকারের বহনযোগ্য আলো। এর মাধ্যমে মহাকাশের আয়না থেকে আলো প্রতিফলিত হয়ে পৃথিবীতে পড়লে দৃশ্যটি কেমন হতে পারে, তা দেখানোর চেষ্টা করে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের দাবি, পরীক্ষায় ব্যবহৃত আলোর উজ্জ্বলতা ছিল পূর্ণিমার চাঁদের আলোর কাছাকাছি।
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এই অভিজ্ঞতা ছিল অপ্রত্যাশিত। রাতের স্বাভাবিক অন্ধকারের মধ্যে এমন উজ্জ্বল আলো দেখে অনেকে বিস্মিত হন। প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এই প্রযুক্তি রাতের পরিবেশ ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কতটা পরিবর্তন আনতে পারে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কীভাবে কাজ করবে মহাকাশের আয়না?
রিফ্লেক্ট অরবিটালের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পৃথিবীকে প্রদক্ষিণকারী উপগ্রহে বড় প্রতিফলক আয়না বসানো হবে। এসব আয়না সূর্যের আলো ধরে পৃথিবীর নির্দিষ্ট এলাকার দিকে প্রতিফলিত করবে। এর ফলে পৃথিবীর কোনো অঞ্চলে রাত থাকলেও সেখানে কৃত্রিমভাবে সূর্যের আলো পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন (এফসিসি) জুলাইয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রাথমিক পরীক্ষামূলক উপগ্রহ উৎক্ষেপণের প্রস্তাবে অনুমোদন দেয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী বছর একটি পরীক্ষামূলক উপগ্রহ পাঠানোর কথা রয়েছে। এতে থাকবে প্রায় ১৮ মিটার বা ৫৯ ফুট ব্যাসের একটি আয়না। আয়নাটি পৃথিবীর প্রায় তিন মাইল প্রশস্ত এলাকায় আলো ফেলতে পারবে বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে।
আলোর তীব্রতা চাঁদের আলোর মতো মৃদু থেকে শুরু করে দুপুরের সূর্যের আলোর কাছাকাছি পর্যন্ত নির্ধারণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ প্রয়োজন অনুযায়ী কোনো এলাকায় কতটা আলো পৌঁছাবে, তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারার দাবি করছে প্রতিষ্ঠানটি।
এই প্রযুক্তির সম্ভাব্য ব্যবহারও বেশ বিস্তৃত। রাতের অন্ধকারে দুর্গম এলাকায় অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চালানো, জরুরি সেবাকর্মীদের কাজ সহজ করা, কৃষিজমিতে অতিরিক্ত আলো পৌঁছে দেওয়া এবং নষ্ট হয়ে যাওয়া সড়কবাতির বিকল্প হিসেবে এটি ব্যবহার করার কথা ভাবছে প্রতিষ্ঠানটি। সামরিক অভিযানেও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর কাজে প্রযুক্তিটি ব্যবহার করা যেতে পারে। এসব কাজ একটি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে চালু করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে তারা।
রিফ্লেক্ট অরবিটালের এক মুখপাত্রের ভাষ্য, অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলগুলোই হতে পারে তাদের প্রযুক্তির প্রথম গ্রাহক। ক্যালিফোর্নিয়ার পরীক্ষায় স্থানীয় একটি উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে কাজ করা হয়েছে, যাতে বাস্তব পরিস্থিতিতে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা বোঝা যায়। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, রাতের অন্ধকারে বিপদে পড়া মানুষকে খুঁজে বের করতে এই প্রযুক্তি সহায়তা করতে পারে।
তবে প্রযুক্তিটির সম্ভাব্য উপকারিতা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি আশাবাদী হলেও পরিবেশবাদী ও জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটি অংশ এর বিরোধিতা করছে।
দিন-রাতের স্বাভাবিক ছন্দ কি বদলে যাবে?
পরিবেশবাদীদের উদ্বেগের মূল কারণ হলো, পৃথিবীর জীবজগৎ দীর্ঘকাল ধরে দিন ও রাতের স্বাভাবিক পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে বিবর্তিত হয়েছে। রাতে কৃত্রিমভাবে সূর্যের আলো ছড়িয়ে দিলে সেই স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে মানুষের ঘুম, বন্য প্রাণীর জীবনযাপন এবং প্রকৃতির ভারসাম্যের ওপর।
পরিবেশবিষয়ক সংগঠন আর্থজাস্টিসের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জান হাসেলম্যান এই প্রকল্পের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, এত বড় পরিসরে মহাকাশের আয়না ব্যবহার করার সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে এখনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। দিন ও রাতের পরিবর্তনের ওপর পৃথিবীর জীবনের যে নির্ভরতা, তা উপেক্ষা করে এ ধরনের প্রযুক্তি চালু করা উচিত নয় বলেও তিনি মনে করেন।
হাসেলম্যানের আশঙ্কা, ৫০ হাজার আয়নাযুক্ত উপগ্রহ পাঠানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে পৃথিবী থেকে রাতের আকাশ দেখার পরিচিত অভিজ্ঞতাই বদলে যেতে পারে।
গত আগস্টে আর্থজাস্টিসের প্রতিনিধিত্বে চারটি সংগঠন এফসিসির অনুমোদন পুনর্বিবেচনার আবেদন করে। তাদের উদ্বেগ, পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪০০ মাইল বা ৬৪৪ কিলোমিটার উচ্চতায় অবস্থানকারী এসব উপগ্রহ থেকে আলো প্রতিফলিত হলে পরিবেশ ও মানুষের জীবনে ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে।
পাখি, কীটপতঙ্গ ও স্তন্যপায়ী প্রাণী খাবার সংগ্রহ, আশ্রয় নেওয়া এবং প্রজননের জন্য দিন-রাতের পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে। রাতের অন্ধকার কমে গেলে এসব প্রাণীর স্বাভাবিক আচরণে পরিবর্তন আসতে পারে। কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে এর পরিণতি গুরুতর হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও উদ্বেগ রয়েছে। শরীরের নিজস্ব জৈবঘড়ি বা সার্কাডিয়ান ছন্দ ঘুম, জেগে থাকা এবং বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কাজের সময় নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। রাতে অতিরিক্ত আলো এই ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। ফলে ঘুমের স্বাভাবিক ধরনসহ স্বাস্থ্যের বিভিন্ন দিক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তারাভরা আকাশ দেখাও কঠিন হতে পারে
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ শুধু পরিবেশ বা মানুষের ঘুমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মহাকাশ থেকে প্রতিফলিত আলো রাতের আকাশের উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে দিতে পারে। এতে দূরের নক্ষত্র ও অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তু পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমানে কৃত্রিম আলোর কারণে পৃথিবীর অনেক অঞ্চলেই রাতের আকাশে তারার সংখ্যা কম দেখা যায়। মহাকাশে আরও বেশি আলো প্রতিফলনকারী উপগ্রহ যুক্ত হলে এই আলোকদূষণ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।
একই সঙ্গে পৃথিবীর কক্ষপথে বিপুলসংখ্যক নতুন উপগ্রহ পাঠানোর পরিকল্পনা মহাকাশে যানজট ও বর্জ্যের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সও পৃথিবীর কক্ষপথে ১০ লাখ মহাকাশভিত্তিক তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মহাকাশে বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামোর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে পারে। এর ফলে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণে বাধা সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি মহাকাশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও আরও কঠিন হতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়েও প্রশ্ন
রিফ্লেক্ট অরবিটালের দাবি, তাদের প্রযুক্তি পরিবেশের জন্য উপকারী হতে পারে। রাতের বেলায় সৌর প্যানেলে সূর্যের আলো পৌঁছে দিতে পারলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়বে। এতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হতে পারে বলে প্রতিষ্ঠানটি মনে করে।
কিন্তু কিছু জলবায়ুবিজ্ঞানী এই যুক্তি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাঁদের আশঙ্কা, পৃথিবীতে সূর্যের শক্তি পৌঁছানোর স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করলে জলবায়ুর ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব পড়তে পারে।
হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ুবিজ্ঞানী ডেভিড হো সতর্ক করে বলেছেন, পৃথিবীর উষ্ণতা কমানোর উদ্দেশ্যে মহাকাশে আয়না স্থাপনের ধারণা নিয়েই বিতর্ক রয়েছে। সেই আয়নাগুলোকে আবার পৃথিবীর দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে আরও বেশি সৌরশক্তি পাঠানোর চেষ্টা করলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
তাঁর বক্তব্যের মূল উদ্বেগ হলো, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার নামে তৈরি কোনো প্রযুক্তি যেন উল্টো পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি না করে।
বিজ্ঞানী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কাজ করার আশ্বাস
সমালোচনা সত্ত্বেও রিফ্লেক্ট অরবিটাল জানিয়েছে, তাদের প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ স্থান, জাতীয় উদ্যান এবং বন্য প্রাণীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো এড়িয়ে চলার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হবে।
এক মুখপাত্র বলেছেন, প্রতিষ্ঠানটি সরকারি তদারকি ও নিয়ন্ত্রণকে স্বাগত জানায়। সরকার, বিজ্ঞানী এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রযুক্তিটির উন্নয়ন করতে চায় তারা। স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে রাতের আকাশকে কৃত্রিমভাবে আলোকিত করার এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তার প্রভাব কতটা বিস্তৃত হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। উদ্ধার অভিযান কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত আলো কাজে লাগতে পারে, কিন্তু একই প্রযুক্তি যদি প্রকৃতির স্বাভাবিক অন্ধকার, মানুষের ঘুম এবং মহাকাশ পর্যবেক্ষণের পরিবেশ বদলে দেয়, তাহলে তার সুফল ও ঝুঁকি—দুই দিকই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।
মহাকাশের আয়না দিয়ে রাতের পৃথিবী আলোকিত করার ধারণা প্রযুক্তিগতভাবে আকর্ষণীয় হলেও এর বাস্তব প্রয়োগের আগে পরিবেশগত প্রভাব, মানুষের স্বাস্থ্য এবং বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের ওপর সম্ভাব্য ক্ষতি সম্পর্কে আরও গবেষণা প্রয়োজন। রাতকে দিনের মতো উজ্জ্বল করে তোলার সক্ষমতা অর্জন করাই শেষ কথা নয়; সেই আলো পৃথিবীর জন্য কতটা নিরাপদ হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।












