যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিশ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা ডলোরেস হুয়ের্তা ৯৬ বছর বয়সে মারা গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে আবারও সামনে এসেছে কয়েক দশকের শ্রমিক আন্দোলন, সংগঠক হিসেবে তাঁর অসাধারণ ভূমিকা এবং নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান। তবে তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত বিভিন্ন স্মরণলেখায় সাবেক সহযোদ্ধা সিজার শ্যাভেজের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—হুয়ের্তার দীর্ঘ সংগ্রামী জীবন কি কেবল তাঁর নির্যাতনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই মূল্যায়ন করা উচিত?
১৯৬২ সালে সিজার শ্যাভেজের সঙ্গে মিলে হুয়ের্তা প্রতিষ্ঠা করেন ইউনাইটেড ফার্ম ওয়ার্কার্স অব আমেরিকা। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিশ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, উন্নত কর্মপরিবেশ এবং শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংগঠনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে স্প্যানিশ ভাষাভাষী অভিবাসী কৃষিশ্রমিকদের অধিকার আদায়ে ধর্মঘট, বর্জন কর্মসূচি এবং বিভিন্ন গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দেন তাঁরা।
দীর্ঘদিনের এই আন্দোলন হুয়ের্তাকে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। ২০১২ সালে তিনি পান প্রেসিডেনশিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল উইমেনস হল অব ফেমে অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রথম লাতিনা নারী হিসেবেও স্বীকৃতি অর্জন করেন তিনি। এসব অর্জন তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা, নেতৃত্ব এবং সামাজিক পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের সাক্ষ্য বহন করে।

তবে হুয়ের্তার জীবন ও সংগ্রাম নিয়ে আলোচনায় সিজার শ্যাভেজের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিক আন্দোলনের এই দুই নেতা দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করেছেন। একই সময়ে শ্যাভেজের ভাই রিচার্ডের সঙ্গে হুয়ের্তার দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক ছিল এবং তাঁদের চার সন্তান রয়েছে।
২০২৬ সালের শুরুর দিকে হুয়ের্তা প্রকাশ্যে শ্যাভেজের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ তোলেন। তাঁর এই বক্তব্য শ্রমিক অধিকার আন্দোলনের ইতিহাসের একটি অস্বস্তিকর অধ্যায় সামনে নিয়ে আসে। প্রগতিশীল আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও যৌন অসদাচরণ ও নারীর প্রতি ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠতে পারে—এ বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।
হুয়ের্তার জীবনের এই অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর স্মরণলেখাগুলোতে এই অভিযোগকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হলে তাঁর দীর্ঘদিনের সংগ্রাম, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং সামাজিক পরিবর্তনে অবদান আড়ালে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
১৯৮৮ সালে কৃষিশ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের সময় পুলিশের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন হুয়ের্তা। সেই অভিজ্ঞতাও তাঁর সংগ্রামী জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। নিজের জীবনে সহিংসতা ও নিপীড়নের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তিনি শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন থেকে সরে যাননি। বরং দীর্ঘদিন ধরে সংগঠক ও অধিকারকর্মী হিসেবে কাজ চালিয়ে গেছেন।

তাঁর মৃত্যুর সময় যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়সহ বৃহত্তর সমাজে যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও জবাবদিহির দাবি নতুন করে আলোচিত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে হুয়ের্তার জীবন যৌন নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে। তাঁর জীবন দেখায়, কোনো মানুষের সঙ্গে ঘটে যাওয়া নির্যাতন তাঁর পরিচয়ের একমাত্র নির্ধারক নয়। সেই অভিজ্ঞতার বাইরেও তাঁর অর্জন, সিদ্ধান্ত, নেতৃত্ব এবং সমাজে রেখে যাওয়া অবদান রয়েছে।
হুয়ের্তার অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করা জরুরি, কারণ তা আন্দোলনের ভেতরেও নারীর প্রতি বৈষম্য, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং যৌন অসদাচরণের বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়াতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর নিজের ভূমিকা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকেও যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে।

নারী অধিকার, শ্রমিকের ন্যায্যতা এবং সামাজিক সমতার পক্ষে কাজ করা আন্দোলনগুলোকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সম্মানজনক হতে হলে নির্যাতনের অভিযোগের যথাযথ গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দীর্ঘদিনের কাজও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। হুয়ের্তার জীবন সেই ভারসাম্যের কথাই মনে করিয়ে দেয়।
ডলোরেস হুয়ের্তার উত্তরাধিকার তাই কেবল তাঁর ব্যক্তিগত বেদনা কিংবা সিজার শ্যাভেজের সঙ্গে তাঁর জটিল সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কৃষিশ্রমিকদের সংগঠিত করা, ন্যায্য অধিকার আদায়ে মানুষকে একত্র করা এবং সামাজিক পরিবর্তনের জন্য আজীবন কাজ করে যাওয়াই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়। তাঁকে স্মরণ করার সময় সেই সংগ্রাম, সাহস ও নেতৃত্বকেই সামনে রাখা জরুরি।












