বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের নিয়ন্ত্রণ এখন আর কেবল বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার বিষয় নয়। প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অবকাঠামো নির্মাণ—সব ক্ষেত্রেই এসব খনিজের সরবরাহ নিশ্চিত করা কৌশলগত প্রয়োজন হয়ে উঠেছে। অথচ খনিজ উত্তোলনের পর সেগুলোকে ব্যবহারযোগ্য ধাতুতে রূপান্তরের যে শিল্পব্যবস্থা, তার ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ এতটাই শক্তিশালী যে পশ্চিমা দেশগুলোর প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ক্রমেই সরবরাহঝুঁকির মুখে পড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং তাদের মিত্ররা এই নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতিও হয়েছে। কিন্তু নতুন খনি আবিষ্কার, উত্তোলন কিংবা পরিশোধন সক্ষমতা গড়ে তোলার ঘোষণা দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। আসল চ্যালেঞ্জ হলো, এমন একটি সরবরাহব্যবস্থা তৈরি করা, যা চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনৈতিকভাবেও টিকে থাকতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক খনি ও সম্পদ সম্মেলনে এ প্রশ্নটিই গুরুত্ব পেয়েছে। সেখানে খনি কোম্পানি, সরকার ও অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে, পশ্চিমা দেশগুলোর সামনে এখন সবচেয়ে বড় বাধা খনিজ সম্পদের অভাব নয়; বরং সেই সম্পদকে কার্যকর উৎপাদন ও পরিশোধনশিল্পে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করা।
চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার কাঠামোগত পার্থক্য
খনিজশিল্পে চীনের অবস্থান শুধু তার ভূগর্ভস্থ সম্পদের ওপর নির্ভর করে তৈরি হয়নি। দীর্ঘমেয়াদি সরকারি সহায়তা, বৃহৎ উৎপাদনক্ষমতা এবং পরিশোধনশিল্পে ধারাবাহিক বিনিয়োগ দেশটিকে এমন এক সুবিধা দিয়েছে, যা বাজারের স্বাভাবিক প্রতিযোগিতায় অন্যদের পক্ষে সহজে অতিক্রম করা সম্ভব নয়।

পশ্চিমা অর্থনীতিতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত সাধারণত প্রকল্পের সম্ভাব্য মুনাফা, উৎপাদন ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ বাজারদরের হিসাবের ওপর নির্ভরশীল। কোনো খনি বা পরিশোধনাগার নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করার আগে বিনিয়োগকারীরা জানতে চান, উৎপাদিত পণ্যের ক্রেতা থাকবে কি না এবং বিক্রয়মূল্য দিয়ে ব্যয় মেটানো সম্ভব হবে কি না।
চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক দীর্ঘ সময় ধরে লোকসান সহ্য করতে পারে, যতক্ষণ না উৎপাদনের পরিমাণ বাড়িয়ে ব্যয় কমিয়ে আনা সম্ভব হয়। পশ্চিমা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে একই কৌশল অনুসরণ করা কঠিন। ফলে কোনো খনিজের কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেশি হলেও বাজারদরে পর্যাপ্ত মুনাফার নিশ্চয়তা না থাকলে সেখানে বিনিয়োগ আটকে যেতে পারে।
এই ব্যবধানের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত ধাতুর ক্ষেত্রে, যেগুলোর আন্তর্জাতিক বাজার সীমিত এবং মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ নয়। প্রচলিত বিনিয়োগব্যবস্থায় এসব প্রকল্পের অর্থায়ন নিশ্চিত করা তাই আরও কঠিন।
চিত্রটি বোঝার জন্য উৎপাদনের পরিসংখ্যানই যথেষ্ট। ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্টের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, পরিশোধিত গ্যালিয়ামের বৈশ্বিক উৎপাদনের ৯৯ শতাংশ, অ্যান্টিমনির ৭৪ শতাংশ, মলিবডেনামের ৮১ শতাংশ, বিরল মৃত্তিকা মৌলের ৯১ শতাংশ, লিথিয়ামের ৭০ শতাংশ এবং তামার ৪৪ শতাংশ চীনের নিয়ন্ত্রণে। এসব ধাতুর অনেকগুলোই আধুনিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, ব্যাটারি, ইলেকট্রনিকস ও জ্বালানি প্রযুক্তির জন্য অপরিহার্য।
এই পরিস্থিতিতে শুধু খনি থেকে আকরিক উত্তোলন বাড়িয়ে পশ্চিমা সরবরাহব্যবস্থা নিরাপদ করা যাবে না। আকরিককে শিল্পে ব্যবহারের উপযোগী ধাতুতে পরিণত করার সক্ষমতাও গড়ে তুলতে হবে। অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে উচ্চ শ্রম ও জ্বালানি ব্যয় এবং কঠোর পরিবেশগত অনুমোদনপ্রক্রিয়া এ কাজকে আরও ব্যয়বহুল করে তোলে।
বাজারের ঝুঁকি কমানোর তিনটি পথ
সমাধানের কেন্দ্রে রয়েছে বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানো। প্রচলিত ব্যবস্থায় কোনো প্রকল্পের অর্থায়ন পেতে হলে উদ্যোক্তাকে দেখাতে হয় যে সম্ভাব্য বাজারদরে উৎপাদন ব্যয় মিটিয়ে লাভ করা যাবে, অথবা ক্রেতার সঙ্গে এমন চুক্তি রয়েছে, যা ভবিষ্যৎ আয় নিশ্চিত করবে। গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ক্ষেত্রে এই শর্ত পূরণ করা সব সময় সম্ভব হয় না।
অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতা বিষয়টি স্পষ্ট করে। জাপানি বিনিয়োগের সহায়তায় দেশটি কয়লা ও লৌহ আকরিকের বড় শিল্প গড়ে তুলেছে। জাপান ও চীনের অর্থায়ন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রকল্প সম্প্রসারণেও ভূমিকা রেখেছে। গত এক দশকে অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের বৃহত্তম লিথিয়াম উৎপাদক হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই সাফল্যের পেছনেও চীনা অর্থায়নের বড় ভূমিকা ছিল। দেশটিতে উত্তোলিত লিথিয়াম আকরিকের বড় অংশই পরিশোধনের জন্য চীনে যায়, যেখানে তা মূলত চীনা গাড়ি ও ব্যাটারি শিল্পে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ উৎপাদন বাড়লেও পরবর্তী শিল্পধাপের ওপর নির্ভরতা থেকে যায়।
এ পরিস্থিতি বদলাতে তিনটি প্রধান নীতি অনুসরণ করা যেতে পারে।
প্রথমত, সরকার নির্দিষ্ট খনিজের জন্য ন্যূনতম মূল্য নিশ্চিত করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র বিরল মৃত্তিকা মৌল থেকে তৈরি চুম্বক উৎপাদনে ব্যবহৃত নিওডিমিয়াম-প্রাসিওডিমিয়াম যৌগের ক্ষেত্রে এ ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। প্রতি কেজিতে ১১০ ডলারের ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণের ফলে উৎপাদকরা বাজারদর কমে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে কিছুটা সুরক্ষা পান। বাজারমূল্য এই সীমার ওপরে থাকলে সরকারের অর্থ ব্যয়েরও প্রয়োজন নাও হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, সরকার বা সরকারি সহায়তাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান উৎপাদিত খনিজ কেনার নিশ্চয়তা দিতে পারে। আগাম ক্রয়চুক্তি থাকলে উৎপাদক জানেন, পণ্য বিক্রির জন্য তাঁকে পুরোপুরি অনিশ্চিত বাজারের ওপর নির্ভর করতে হবে না। চীনের নিয়ন্ত্রিত সরবরাহকারীদের তুলনায় বেশি দামেও যদি পণ্য কিনতে হয়, তবু কৌশলগত নিরাপত্তার স্বার্থে সেই ব্যয় গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
তৃতীয়ত, সরকার সরাসরি খনি ও পরিশোধন প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে পারে। প্রয়োজন হলে প্রকল্প অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার আগ পর্যন্ত লোকসানের অংশও বহন করতে পারে। প্রতিরক্ষা খাতে ব্যবহৃত ধাতুর ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে, কারণ সেখানে সরকার নিজেই প্রধান ক্রেতা।
তবে সব প্রকল্পের জন্য একই সমাধান উপযুক্ত হবে না। কোন খনিজের চাহিদা কতটা নিশ্চিত, উৎপাদন ব্যয় কত, সম্ভাব্য ক্রেতা কারা এবং জাতীয় নিরাপত্তায় তার গুরুত্ব কতখানি—এসব বিবেচনায় নিয়ে নীতি নির্ধারণ করতে হবে। কোনো ক্ষেত্রে ন্যূনতম মূল্য কার্যকর হবে, অন্য ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়চুক্তি কিংবা সরাসরি সরকারি বিনিয়োগ বেশি ফল দিতে পারে।
অর্থায়নের নিশ্চয়তা পেলেই যে প্রতিটি প্রকল্প সফল হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, পরিবেশগত অনুমোদন, শ্রমিকের প্রাপ্যতা এবং অবকাঠামোগত ঘাটতিও উৎপাদন বাড়ানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই ঝুঁকি কমানোর নীতিকে বাস্তব উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব
অর্থায়নের পাশাপাশি আরেকটি বড় সমস্যা হলো পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত কৌশলের অনুপস্থিতি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন উভয়েই চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে চায়। কিন্তু তাদের উদ্যোগের মধ্যে প্রতিযোগিতার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। নিজ নিজ শিল্পকে আকৃষ্ট করার জন্য ভর্তুকি, বিনিয়োগ সুবিধা ও বাজার সুরক্ষার ব্যবস্থা নিতে গিয়ে তারা পরস্পরের সহযোগিতার সুযোগও সীমিত করতে পারে।
এ ধরনের প্রতিযোগিতা শেষ পর্যন্ত চীনের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। পশ্চিমা দেশগুলো যদি একই খনিজের জন্য পৃথক সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, অথচ বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও ক্রয়চুক্তিতে সমন্বয় না করে, তাহলে ব্যয় বাড়বে এবং সম্পদের ব্যবহারও কম কার্যকর হবে।

বরং তাদের প্রয়োজন একটি যৌথ কাঠামো, যেখানে কোন দেশ কোন খনিজের উৎপাদন ও পরিশোধনে এগিয়ে থাকবে, কোথায় বিনিয়োগের ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়া হবে এবং কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি ক্রেতা নিশ্চিত করা হবে, তা স্পষ্ট থাকবে। এতে প্রতিটি দেশকে পুরো সরবরাহব্যবস্থা এককভাবে গড়ে তোলার ব্যয় বহন করতে হবে না।
চীনের খনিজ আধিপত্য কমানোর প্রতিযোগিতায় সময়ও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, বিদ্যুৎব্যবস্থা, ব্যাটারি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামোর চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্ভরযোগ্য সরবরাহের প্রয়োজনও বাড়বে। পশ্চিমা দেশগুলো যদি শুধু নতুন খনি আবিষ্কার ও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রায় মনোযোগ দেয়, তাহলে পরিশোধন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপটি আবারও চীনের হাতে থেকে যেতে পারে।
শেষ পর্যন্ত মূল প্রশ্নটি তাই কে বেশি খনিজ উত্তোলন করতে পারে, তা নয়। প্রশ্ন হলো, কে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে পারে, উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারে এবং বাজারের অনিশ্চয়তার মধ্যেও প্রকল্পগুলোকে টিকিয়ে রাখতে পারে।
সরকারি সহায়তা, ন্যূনতম মূল্য এবং নিশ্চিত ক্রয়চুক্তি এ ক্ষেত্রে কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে। কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে এসব ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন একটি সমন্বিত শিল্পকৌশল, যেখানে অর্থনৈতিক লাভের হিসাব ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনকে পরস্পরের বিপরীতে না দাঁড় করিয়ে একই পরিকল্পনার অংশ করা হবে। তা না হলে চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর পশ্চিমা উদ্যোগ নতুন খনি ও বিনিয়োগের ঘোষণা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে।
ক্লাইড রাসেলের আরও লেখা
ভারতের ইস্পাত বিস্তার ও অস্ট্রেলিয়ার করনীতি: কোকিং কয়লার বাজারে বড় সিদ্ধান্তের সময়
ইরান যুদ্ধ কি কেবল জ্বালানি সংকট, নাকি বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থার মোড় ঘোরানো মুহূর্ত?
নতুন বাস্তবতা নাকি পুরোনো চক্র? সোনার বাজারের সামনে বড় প্রশ্ন
কয়লার বাজারে নতুন বাস্তবতা: ইরান যুদ্ধ, চীনের সংকট আর এশিয়ার জ্বালানি হিসাব











