রাজধানীর উত্তরা থেকে নিখোঁজ হওয়ার পরদিন তুরাগ নদে পাওয়া গেছে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মরদেহ। বুধবার, ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে উত্তরখান থানার রাজাবাড়ি ঘাটসংলগ্ন এলাকা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে টঙ্গী নৌপুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা। মরদেহের সঙ্গে পাওয়া একটি আইফোনের সূত্র ধরে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা হয়। তবে পরিচয় নিশ্চিত হলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটির উত্তর এখনো মেলেনি—কীভাবে তাঁর মৃত্যু হলো?
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনা ঘিরে উদ্বেগের আরেকটি কারণ রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময়কার দৃশ্য ধারণ ও সেই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় তাঁর নাম আলোচনায় এসেছিল। পরবর্তী সময়ে বিমানবাহিনীতে তাঁর চাকরির অবসান নিয়েও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ফলে তাঁর মৃত্যুর খবর সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
তবে অতীতের ওই ঘটনা এবং তাঁর বর্তমান মৃত্যুর মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নিশ্চিত তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। মৃত্যুর কারণ, তিনি কীভাবে নদে পৌঁছালেন এবং নিখোঁজ হওয়ার আগে তাঁর সঙ্গে কী ঘটেছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রামাণ্য তথ্য।
নিখোঁজের পরদিন মরদেহ উদ্ধার, ফোনে পরিচয় শনাক্ত
প্রকাশিত সংবাদপ্রতিবেদন অনুযায়ী, তাহসিফ গত মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর রাতে নিখোঁজ হন। তিনি পরিবারের সঙ্গে রাজধানীর উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন। পরদিন বিকেলে তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভেসে থাকার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় টঙ্গী নৌপুলিশ ফাঁড়ির একটি দল।

টঙ্গী নৌপুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ফিরোজ উদ্দিনের ভাষ্য অনুযায়ী, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে নদে মরদেহ ভেসে থাকার খবর দেওয়া হয়েছিল। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহটি উদ্ধার করে। প্রথমে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি হিসেবে মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।
উদ্ধারের সময় তাঁর পরনে ছিল সাদা পায়জামা ও কালো জামা। হাতে একটি ঘড়ি ছিল এবং পকেটে পাওয়া যায় একটি আইফোন। ফোনের সূত্র ধরে পরে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা হয়। এরপর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
মরদেহ উদ্ধারের স্থান, পোশাক ও ব্যক্তিগত সামগ্রীর বিবরণ থেকে পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেলেও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না। সে জন্য ময়নাতদন্তের ফল এবং তদন্তে পাওয়া অন্যান্য তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
মৃত্যুর কারণ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা
তাহসিফের মৃত্যুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অমীমাংসিত দিক হলো, তিনি কীভাবে তুরাগ নদে পৌঁছালেন এবং তাঁর মৃত্যু দুর্ঘটনাজনিত কি না। এ ছাড়া অন্য কোনো ঘটনা তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত ছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়।
একটি সংবাদপ্রতিবেদনে নৌপুলিশের সূত্রে পানিতে ডুবে মৃত্যুর সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ ধরনের প্রাথমিক তথ্যকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি নিখোঁজ হওয়ার সময়, তাঁর শেষ অবস্থান এবং নদে মরদেহ উদ্ধারের পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য যাচাই করাও প্রয়োজন।
মরদেহের সঙ্গে পাওয়া আইফোনটি পরিচয় শনাক্ত করতে সহায়তা করেছে। তবে ব্যক্তিগত সামগ্রী পাওয়া বা না-পাওয়ার ভিত্তিতে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। একইভাবে শুধু মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকেও কোনো অপরাধের প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয় না।
তদন্তের ক্ষেত্রে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর জরুরি। মঙ্গলবার রাতে তিনি কখন ও কী উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন? এরপর কারও সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়েছিল কি না? তিনি কোথায় গিয়েছিলেন? নদে পড়ার আগে তাঁর সঙ্গে কী ঘটেছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে ঘটনার সময়ক্রম পুনর্গঠন করা সহজ হতে পারে।

পরিবারের অভিযোগ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া
তাহসিফের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করেছেন। জাগো নিউজ ২৪-এর একটি প্রতিবেদনে তাঁর খালাতো বোন মোশফেকা জাহানের ফেসবুক পোস্টের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তিনি দাবি করেন, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনার পর তাহসিফ মানসিক চাপ ও হয়রানির শিকার হয়েছিলেন। তাঁকে অনুসরণ করা হতো বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
পরিবারের এসব অভিযোগ ঘটনার প্রেক্ষাপট বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তবে অভিযোগ ও তদন্তে প্রতিষ্ঠিত তথ্য এক নয়। প্রকাশ্যে আসা বক্তব্যগুলোর সমর্থনে কী প্রমাণ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেগুলো যাচাই করেছে কি না এবং অভিযোগের সঙ্গে তাহসিফের মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র আছে কি না—এসব বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর পরিচিতদের কেউ কেউ মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তবে ব্যক্তিগত পোস্টে প্রকাশিত সন্দেহ, পর্যবেক্ষণ কিংবা দাবি তদন্তের ফলাফলের বিকল্প হতে পারে না। এসব বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
ঘটনাটি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক, বিশেষ করে যখন মৃত ব্যক্তির অতীত পরিচিতি ও একটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে রয়েছে। তবে তড়িঘড়ি কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর বদলে অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ করা জরুরি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ভিডিও কেন আলোচনায়
তাহসিফ সাউরির পরিচয় নতুন করে আলোচনায় আসার অন্যতম কারণ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ। সেদিন ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে এবং তিনি দেশত্যাগ করেন। সেই সময়কার দৃশ্য ধারণ বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে তাহসিফের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
তবে ভিডিওটি তিনি নিজেই ধারণ করেছিলেন, নাকি অন্য কারও ধারণ করা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন—প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে এ বিষয়ে একরকম তথ্য পাওয়া যায় না। জাগো নিউজ ২৪-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে ভিডিওটির উৎস ও তাহসিফের সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য এখনো নেই।
পরবর্তী সময়ে বিমানবাহিনীতে তাঁর চাকরির অবসান নিয়েও সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। কোনো কোনো প্রতিবেদনে তাঁকে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা, আবার কোথাও সাবেক বা অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। চাকরির অবসানের সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সরকারি নথি বা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য সামনে না আসা পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত ভাষ্য দেওয়া সমীচীন নয়।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি। অতীতের কোনো রাজনৈতিক ঘটনা, চাকরির অবসান বা ব্যক্তিগত অভিযোগের সঙ্গে একজন ব্যক্তির মৃত্যুকে সরাসরি যুক্ত করতে হলে প্রমাণ প্রয়োজন। শুধু সময়ের ধারাবাহিকতা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত সন্দেহ দিয়ে সেই যোগসূত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

তদন্তে যেসব বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন
তাহসিফের মৃত্যুর কারণ নির্ধারণের জন্য ময়নাতদন্তের পাশাপাশি নিখোঁজ হওয়ার আগের ও পরের ঘটনাপ্রবাহ যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর শেষ অবস্থান, যোগাযোগের তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং প্রাসঙ্গিক স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গেলে তা তদন্তে সহায়ক হতে পারে। তবে এসব তথ্য সংগ্রহ বা বিশ্লেষণ করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
একই সঙ্গে পরিবারের অভিযোগগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে নথিবদ্ধ ও যাচাই করা হয়েছে কি না, কোনো মামলা হয়েছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছে—এসব বিষয়েও স্পষ্ট বক্তব্য প্রয়োজন। কোনো অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আর অভিযোগের সমর্থনে প্রমাণ না মিললে সেটিও স্বচ্ছভাবে জানানো দরকার।
ময়নাতদন্তের ফল মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হলেও পুরো ঘটনাপ্রবাহ বোঝার জন্য তা একমাত্র উপাদান নয়। কীভাবে তিনি নিখোঁজ হলেন, তাঁর শেষ অবস্থান কী ছিল এবং অন্য কোনো ব্যক্তি বা ঘটনার সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে পারিপার্শ্বিক তথ্যও যাচাই করতে হবে।
তাহসিফের মৃত্যু তাই শুধু একটি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা নয়; এর প্রকৃত ব্যাখ্যা নির্ভর করছে প্রমাণভিত্তিক তদন্তের ওপর। পরিবারের অভিযোগ উপেক্ষা করা যেমন ঠিক হবে না, তেমনি প্রমাণ ছাড়া হত্যাকাণ্ড বা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা ও ন্যায়বিচারের নীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
ময়নাতদন্তের ফল, নিখোঁজ হওয়ার সময়কার ঘটনাপ্রবাহ এবং তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য সামনে এলে মৃত্যুর প্রকৃতি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে। এর আগে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, নিখোঁজ হওয়ার পরদিন তুরাগ নদ থেকে তাহসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং এর পেছনের পরিস্থিতি এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।












