পাকিস্তানের বিচার বিভাগে নির্বাহী বিভাগের ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে পদত্যাগ করেছেন বিচারপতি মোহসিন আখতার কায়ানি। বুধবার (২৮ অক্টোবর) লাহোর হাইকোর্টের বিচারপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন তিনি। পদত্যাগপত্রে ব্যক্তিগত ও শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি বিবেকের তাড়নাকে সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, পাকিস্তানের সংবিধানের ২৬তম ও ২৭তম সংশোধনী উচ্চ আদালতগুলোর স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অখণ্ডতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
বিচারপতি কায়ানি আগে ইসলামাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি ছিলেন। চলতি বছরের এপ্রিলে তাঁকে অন্য উচ্চ আদালতে বদলি করা হয়। ইসলামাবাদ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সরদার সরফরাজ দোগারের উদ্যোগে এই বদলির প্রস্তাব করা হয়েছিল। পরে পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি ইয়াহিয়া আফ্রিদির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জুডিশিয়াল কমিশন অব পাকিস্তানের সভায় সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে তিন বিচারপতির বদলি অনুমোদন করা হয়।
সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিচারপতি কায়ানিকে লাহোর হাইকোর্টে, বিচারপতি বাবর সাত্তারকে পেশোয়ার হাইকোর্টে এবং বিচারপতি সামান রাফাত ইমতিয়াজকে সিন্ধু হাইকোর্টে বদলি করা হয়।
পদত্যাগপত্রে বিচারপতি কায়ানি ইসলামাবাদ ও লাহোর হাইকোর্টে দায়িত্ব পালনকে নিজের জন্য সম্মানের বিষয় বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষায়, বিচার বিভাগে কাটানো বছরগুলো ছিল জীবনের সবচেয়ে অর্থবহ ও সন্তোষজনক সময়ের অন্যতম।
বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিভিন্ন ধরনের ২৩ হাজারের বেশি মামলার নিষ্পত্তি করেছেন বলেও পদত্যাগপত্রে জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দায়িত্ব পালনের সময় তিনি সংবিধান সমুন্নত রাখা, নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং ভয় বা পক্ষপাত ছাড়াই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছেন।
তবে বিচার বিভাগের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। বিচারপতি কায়ানির মতে, পাকিস্তানের সংবিধানের ২৬তম ও ২৭তম সংশোধনীর মাধ্যমে আনা পরিবর্তনগুলো উচ্চ আদালতের স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদাকে দুর্বল করেছে।
পদত্যাগপত্রে তিনি বলেন, বিচার বিভাগীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ বাড়তে দেখেছেন তিনি। বিচারপতি নিয়োগ ও বদলির ক্ষেত্রেও এই নিয়ন্ত্রণের বিস্তার ঘটেছে বলে তাঁর অভিযোগ। তাঁর মতে, এ ধরনের হস্তক্ষেপ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থাকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
বিচারপতি কায়ানি বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি ক্রমেই বাড়ছে। যাঁদের সেবা দেওয়ার জন্য বিচারব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, তাঁদের প্রয়োজন অনেক সময় উপেক্ষিত হচ্ছে। অন্যদিকে, ব্যবস্থাটির সুযোগ নিয়ে অন্য পক্ষগুলো সুবিধা পাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
এমন পরিস্থিতিতে বিচারকের আসনে থেকে দায়িত্ব পালন করা তাঁর বিবেকের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় বলে জানিয়েছেন কায়ানি। সিদ্ধান্তটিকে বেদনাদায়ক উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিচার বিভাগের দায়িত্বের সঙ্গে স্বাধীনতা, সংবিধানের প্রতি আনুগত্য এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষার বিষয়গুলো অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত।
পদত্যাগপত্রে সাম্প্রতিক অস্ত্রোপচারের পর শারীরিক অসুস্থতা ও ব্যক্তিগত কারণের কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। তবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে তাঁর উদ্বেগই পদত্যাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে সামনে এসেছে।
বিচারপতির পদ ছাড়ার পর আবার আইন পেশায় ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা জানিয়েছেন কায়ানি। মানুষের সেবা করা, তাঁদের অধিকার রক্ষা এবং আইনি সচেতনতা বাড়ানোর কাজ চালিয়ে যেতে চান তিনি।
তাঁর পদত্যাগ এমন এক সময়ে ঘটল, যখন পাকিস্তানের বিচার বিভাগে বিচারপতি নিয়োগ, বদলি এবং নির্বাহী বিভাগের প্রভাব নিয়ে বিতর্ক সামনে এসেছে। বিচারপতি কায়ানির বক্তব্য সেই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।












