কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা ঘোষণার কয়েক দিনের মধ্যেই বিপুল মুনাফার খবর দিয়েছে প্রযুক্তি জায়ান্ট মাইক্রোসফট। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসে প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা ৩৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। একই সময়ে কোম্পানিটির আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ শতাংশ বেশি। মূলত ক্লাউড কম্পিউটিং ব্যবসার শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ফলাফলকে প্রত্যাশার চেয়েও ভালো অবস্থানে নিয়ে গেছে।
মাইক্রোসফটের এই আর্থিক সাফল্য এসেছে এমন এক সময়ে, যখন প্রতিষ্ঠানটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে এবং কর্মীসংখ্যা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সোমবার কোম্পানিটি জানিয়েছে, ব্যয় কমানো এবং পরিবর্তিত ব্যবসায়িক চাহিদার সঙ্গে কর্মীসংখ্যার সমন্বয় করতে প্রায় ৬০ হাজার কর্মীর জন্য স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার সুযোগ দেওয়া হবে। এ উদ্যোগের আওতায় কানাডা, ভারত, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন দলের যোগ্য কর্মীরা আর্থিক সুবিধা নিয়ে চাকরি ছাড়তে পারবেন।
প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, এই কর্মসূচি কর্মীদের জন্য আর্থিক সহায়তা ও পেশাগত পরিকল্পনার সুযোগ তৈরি করবে। একই সঙ্গে কোম্পানির কর্মীব্যবস্থাপনায় আরও নমনীয়তা আসবে। তবে ঘোষণাটি এমন সময়ে এসেছে, যখন মাইক্রোসফটসহ বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এআই-সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে।
মাইক্রোসফটের মোট কর্মীসংখ্যা বিশ্বজুড়ে দুই লাখ ২০ হাজারের বেশি। প্রায় ৬০ হাজার কর্মীর জন্য স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা প্রতিষ্ঠানটির কর্মীব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এই কর্মসূচির আওতায় শেষ পর্যন্ত কতজন কর্মী চাকরি ছাড়বেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
ক্লাউড ব্যবসায় প্রবৃদ্ধি মুনাফা বাড়িয়েছে
মাইক্রোসফটের প্রকাশিত আর্থিক ফলাফলে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির ক্লাউড ব্যবসা প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। মাইক্রোসফট ক্লাউড থেকে আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্লাউডভিত্তিক প্রযুক্তি ও সেবা সরবরাহের এই ব্যবসা কোম্পানিটির সামগ্রিক আয়ের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী সত্য নাদেলা বলেছেন, এআইয়ের উন্নয়ন বিভিন্ন খাতে এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে সাহায্য করেছে। তাঁর মতে, শিল্পের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এআইয়ের বাস্তব প্রভাবও দেখা যাচ্ছে।
তবে এআই খাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের পাশাপাশি আর্থিক ঝুঁকির কথাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। মাইক্রোসফট বলেছে, এআই খাতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগসহ বিভিন্ন অনিশ্চয়তা ভবিষ্যতে কোম্পানির আর্থিক অবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।
এআই অবকাঠামোয় ব্যয় নিয়ে বিনিয়োগকারীদের নজর
মাইক্রোসফটের আর্থিক ফলাফল এমন সময়ে প্রকাশিত হলো, যখন প্রযুক্তি খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর এআই বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ লাভজনকতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আলোচনা চলছে। এআই সেবা পরিচালনার জন্য উন্নত চিপ, তথ্যকেন্দ্র এবং অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে এসব কোম্পানিকে।
অ্যামাজন, মেটা ও অ্যালফাবেটের মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো চলতি বছর এআই চিপ ও অবকাঠামোয় সম্মিলিতভাবে ৭০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এত বড় বিনিয়োগের বিপরীতে ভবিষ্যতে কতটা আয় ও মুনাফা তৈরি হবে, তা নিয়ে বাজারের আগ্রহ বাড়ছে।
বুধবার নিউইয়র্কে বাজার-পরবর্তী লেনদেনে মাইক্রোসফটের শেয়ারের দাম প্রায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। প্রত্যাশার চেয়ে ভালো আর্থিক ফলাফল বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে বলে বাজারের এই গতিবিধিতে প্রতিফলিত হয়েছে।
অন্যদিকে, একই দিনে অ্যালফাবেটের আর্থিক ফলাফল বিনিয়োগকারীদের হতাশ করেছে। গুগলের মূল প্রতিষ্ঠানটির ত্রৈমাসিক নিট মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ শতাংশ কমেছে। এআই খাতে বড় অঙ্কের ব্যয় অব্যাহত রাখার ঘোষণার পর অ্যালফাবেটের শেয়ারের দাম প্রায় ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ কমে যায়।
মাইক্রোসফট ও অ্যালফাবেটের বিপরীতমুখী আর্থিক ফলাফল প্রযুক্তি খাতে এআই বিনিয়োগের সম্ভাবনা ও ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। একদিকে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার ও ক্লাউড সেবার সম্প্রসারণ থেকে আয় বাড়ছে, অন্যদিকে এই প্রযুক্তির জন্য অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল ব্যয় করতে হচ্ছে।
মাইক্রোসফটের সাম্প্রতিক ফলাফল থেকে বোঝা যায়, এআই ও ক্লাউড ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটির প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে গিয়ে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, কর্মীসংখ্যার পুনর্বিন্যাস এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য তৈরি করা হবে, সেটিই এখন প্রযুক্তি জায়ান্টটির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।












