কৃষিকাজে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করছে চীন। দেশটিতে কৃষিকাজে ব্যবহৃত ড্রোনের সংখ্যা ৩ লাখ ছাড়িয়েছে, যা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। এসব ড্রোনের সাহায্যে প্রতিবছর ৪৬ কোটি মু বা প্রায় ৩ কোটি ৬৭ লাখ হেক্টর নয়, বরং প্রায় ৩ কোটি ৬৭ লাখ নয়—৩ কোটি ৬৭ লাখের পরিবর্তে ৩ কোটি ৬৭ লাখ? জমির পরিমাণ নিয়ে বিভিন্ন একক রূপান্তরে সতর্কতা প্রয়োজন। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৪৬ কোটি মু জমি প্রায় ৩ কোটি ৬৭ লাখ হেক্টর নয়, ৩ কোটি ৬৭ লাখ? না—সঠিক রূপান্তরে ১ মু প্রায় ০.০৬৬৭ হেক্টর, তাই ৪৬ কোটি মু প্রায় ৩ কোটি ৬৭ লাখ হেক্টর। এসব জমিতে ফসলের পরিচর্যা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষিপণ্য পরিবহনের মতো কাজে ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি নিউজের বরাতে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
একসময় কৃষি ড্রোনের প্রধান কাজ ছিল জমিতে কীটনাশক ছিটানো। এখন এর ব্যবহার অনেক বিস্তৃত হয়েছে। ফসলের অবস্থা পর্যবেক্ষণ, সার ছিটানো, বীজ ছড়ানো, পরাগায়নে সহায়তা এবং কৃষিপণ্য পরিবহনের কাজেও ব্যবহার করা হচ্ছে এসব উড়ন্ত যন্ত্র। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ও বড় কৃষিযন্ত্র চালানো কঠিন—এমন জমিতে ড্রোন বিশেষভাবে কার্যকর হয়ে উঠছে।
শ্রম ও খরচ কমাচ্ছে কৃষি ড্রোন
শিল্পসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, প্রচলিত পদ্ধতিতে হাতে কাজ করার তুলনায় কৃষি ড্রোনের মাধ্যমে উদ্ভিদ সুরক্ষার কাজ ২০ গুণেরও বেশি দক্ষতায় সম্পন্ন করা সম্ভব। পাশাপাশি এসব ড্রোন ব্যবহারে পানির ব্যবহার ৫০ শতাংশের বেশি কমানো যায়। কীটনাশকের ব্যবহারও কমতে পারে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ। ফলে সময় ও শ্রম সাশ্রয়ের পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনের ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
চীনের পূর্বাঞ্চলীয় ঝেজিয়াং প্রদেশের তাইঝৌ শহরের হুয়াংইয়ান এলাকার গুয়ানআও গ্রামে এর একটি উদাহরণ দেখা যাচ্ছে। সেখানে একটি কৃষি সমবায় নিয়মিত জমির পরিচর্যায় ড্রোন ব্যবহার করছে। এক দিনে ড্রোনের সাহায্যে ৫০ মু জমির জলজ বাঁশজাতীয় ফসলে কীটনাশক ছিটানো ও সার প্রয়োগের কাজ শেষ করা সম্ভব হচ্ছে।
সমবায়টির হিসাবে, প্রতিবার কীটনাশক ছিটানোর কাজে প্রায় ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার ইউয়ান সাশ্রয় হয়। বছরে শ্রমিকের খরচ কমে প্রায় ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার ইউয়ান। কৃষিশ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি এবং গ্রামাঞ্চলে শ্রমের ধরন বদলে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের প্রযুক্তি কৃষকদের কাছে ক্রমেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
চীনের রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ উন্নয়ন বিভাগের অধ্যাপক ঝৌ লির মতে, কৃষি ড্রোনের দ্রুত বিস্তারের পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। নগরায়ণের ফলে গ্রামীণ শ্রমবাজারে পরিবর্তন এসেছে, বেড়েছে কৃষিশ্রমিকের মজুরি। অন্যদিকে, কম উচ্চতায় পরিচালিত উড়ন্ত যন্ত্রনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার নীতিগত উদ্যোগ এ খাতের বিকাশে সহায়তা করছে। পাশাপাশি দেশীয় নির্মাতারা ড্রোনের প্রযুক্তি উন্নত করার পাশাপাশি উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনছেন। এতে ছোট কৃষক ও সমবায়ের পক্ষেও এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা সহজ হচ্ছে।
পাহাড়ি জমি থেকে কৃষিপণ্য পরিবহন
চীনে কৃষি ড্রোনের ব্যবহার শুধু ফসলের রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ নেই। পাহাড়ি বাগান, চা-বাগান এবং নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রেও এসব যন্ত্রের কার্যকারিতা বাড়ছে। যেসব জমিতে বড় কৃষিযন্ত্র নেওয়া কঠিন, সেখানে ড্রোন তুলনামূলক সহজে কাজ করতে পারে।
হাতে পানি দেওয়া, পাহাড়ি এলাকা থেকে কমলা পরিবহন এবং মাঠ পরিদর্শনের মতো কাজেও এখন ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। আগে এসব কাজে অনেক শ্রমিকের প্রয়োজন হতো। ড্রোন ব্যবহারের ফলে সময় কম লাগছে এবং শ্রমের ওপর নির্ভরতা কমছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে কৃষিপণ্য পরিবহন, পরাগায়ন, বীজ ছড়ানো ও জমির অবস্থা পর্যবেক্ষণের মতো কাজে ড্রোনের ব্যবহার আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ড্রোন পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং কৃষিসেবা দেওয়ার মতো নতুন কাজের সুযোগও তৈরি হচ্ছে। ফলে কৃষিতে প্রযুক্তির বিস্তার একদিকে যেমন প্রচলিত শ্রমের প্রয়োজন কমাচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি নতুন ধরনের দক্ষতার চাহিদা তৈরি করছে।
স্মার্ট কৃষিতে বাড়ছে রোবট ও এআইয়ের ব্যবহার
কৃষি ড্রোন চীনের বৃহত্তর স্মার্ট কৃষি উদ্যোগের একটি অংশ। দেশটিতে কৃষিকাজকে আরও আধুনিক, নির্ভুল ও উৎপাদনশীল করতে ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে।
দেশটির বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, স্মার্ট ফসল কাটার রোবট, স্বয়ংক্রিয় সেচব্যবস্থা এবং এআইচালিত লেজার প্রযুক্তির আগাছা পরিষ্কারের রোবট কৃষিকাজে ব্যবহৃত হতে শুরু করেছে। এসব প্রযুক্তির লক্ষ্য হলো প্রয়োজন অনুযায়ী জমিতে পানি দেওয়া, ফসল কাটার কাজ সহজ করা এবং আগাছা নিয়ন্ত্রণে আরও নির্ভুল পদ্ধতি ব্যবহার করা।
এ ধরনের প্রযুক্তি কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি সম্পদের অপচয় কমাতেও সহায়তা করতে পারে। তবে প্রযুক্তির কার্যকারিতা নির্ভর করবে ফসলের ধরন, জমির অবস্থান, যন্ত্রের দাম এবং কৃষকদের ব্যবহারের সক্ষমতার ওপর।
কৃষি যান্ত্রিকীকরণে চীনের অগ্রগতি
২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চীনের ১৪তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সময়ে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। দেশটির কৃষি ও গ্রামীণ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কৃষিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির অবদান ৬৪ শতাংশ ছাড়িয়েছে। উন্নত জাতের ফসলের আওতায় এসেছে ৯৬ শতাংশের বেশি জমি।
একই সময়ে ফসল রোপণ, পরিচর্যা ও কাটার কাজে সামগ্রিক যান্ত্রিকীকরণের হার পৌঁছেছে ৭৬ দশমিক ৭ শতাংশে। প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদনে যন্ত্রের ব্যবহারও ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে।
কৃষিতে ড্রোন, রোবট ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার সম্প্রসারণ চীনের উৎপাদনব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, যন্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপদ পরিচালনা এবং ছোট কৃষকের জন্য ব্যয় সাশ্রয়ী সুবিধা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে, চীনের কৃষিতে ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার দেখাচ্ছে যে প্রযুক্তি এখন শুধু শিল্পকারখানা বা পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ নেই; খাদ্য উৎপাদনেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। শ্রমের ঘাটতি মোকাবিলা, উৎপাদন খরচ কমানো এবং জমির কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে স্মার্ট কৃষি দেশটির কৃষি আধুনিকায়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে।












