ইরানের সামরিক বাহিনী কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করছে, তার একটি বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে এক অনুসন্ধানে। ইরানের গোপন সামরিক সরবরাহ নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আড়ালে থাকা পাঁচ হাজারের বেশি সংস্থাকে ঘিরে। এর মাধ্যমে দেশটি সামরিক সরঞ্জাম, বিস্ফোরক তৈরির উপকরণ, রকেটের জ্বালানি তৈরির রাসায়নিক এবং ভারী ট্রাক আমদানি করছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এই নেটওয়ার্কের একটি সংস্থাই প্রায় ২৩০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম আমদানি করেছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক নথি, ব্যাংক হিসাব, সরকারি রেকর্ড এবং আমদানি-রপ্তানির তথ্য বিশ্লেষণ করে এই চিত্র পাওয়া গেছে। ইরানের সামরিক ক্রয়ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলো চীন, রাশিয়া, জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য দেশ থেকে বিভিন্ন পণ্য সংগ্রহ করেছে। পণ্যগুলো স্থলপথ, সমুদ্রপথ ও আকাশপথে ইরানে পৌঁছেছে। চলতি বছরের যুদ্ধের মধ্যেও সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আড়ালে পাঁচ হাজারের বেশি সংস্থা
ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনীর রসদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গোপন সংস্থাগুলোর নামের শুরুতে সাধারণত এমওডি অক্ষর থাকে। ফারসি ভাষায় একই পরিচয় প্রকাশ করা হয় ভিওডিজেএ নামে। প্রতিটি সংস্থার নামের সঙ্গে পাঁচ বা ছয় অঙ্কের একটি নম্বর যুক্ত থাকে। নথিতে সংস্থাগুলোর ঠিকানা হিসেবে তেহরানে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একই ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে।
সংস্থাগুলোর নিবন্ধনের তারিখ দেখানো হয়েছে ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইরানে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে। তবে অনুসন্ধানে পাওয়া নথি অনুযায়ী, এসব সংস্থার অধিকাংশ বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৩ সালে। তখন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি ও মুদ্রার মান বড় সংকটে পড়েছিল।
ইসরায়েলি-আমেরিকান ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ২৪০ অ্যানালিটিকসের সহযোগিতায় এই নেটওয়ার্কের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষক নোয়াম বিনস্টক ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সেপাহের বিপুলসংখ্যক নথি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে প্রথম এসব সংস্থার অস্তিত্ব শনাক্ত করেন। নথিগুলো টেলিগ্রাম ও উইকিইরান নামের একটি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছিল। পরে আমদানি নথি, কোম্পানির নিবন্ধন এবং অন্যান্য সরকারি তথ্য মিলিয়ে নেটওয়ার্কটির কার্যক্রম অনুসন্ধান করা হয়।
ব্যাংক সেপাহ ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সদস্যদের বেতন ও পেনশন পরিশোধের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ব্যাংকটির নথিতে হাজার হাজার সামরিক সংস্থার হিসাবের সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব হিসাবে বিদেশি মুদ্রার পাশাপাশি স্থানীয় মুদ্রায়ও বড় অঙ্কের অর্থ জমা ছিল।
২০২৪ সালের শেষ দিকে ৩৬টি সংস্থার বৈদেশিক মুদ্রার হিসাবে মোট ১২০ কোটি ডলার জমা ছিল বলে নথিতে দেখা যায়। নেটওয়ার্কের অন্য সংস্থাগুলোর স্থানীয় মুদ্রার হিসাবে ছিল আরও প্রায় ১৮০ কোটি ডলার। এই হিসাবগুলো ইরানের সামরিক ক্রয়ব্যবস্থার আর্থিক সক্ষমতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা কর্মসূচি তৈরিতে কাজ করা সাবেক কর্মকর্তা মিয়াদ মালেকির মতে, এই সংস্থাগুলো ইরানের সামরিক বাণিজ্যব্যবস্থার একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামো হিসেবে কাজ করছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বহু বছর ধরে নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর ক্ষেত্রেও এই নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
অর্থের লেনদেন ছাড়াই বিদেশ থেকে পণ্য কেনা
এই ব্যবস্থার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে অর্থ সরাসরি এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাঠানো হয় না। অনুসন্ধানে পর্যালোচনা করা চালানের ৯৭ শতাংশের ক্ষেত্রে আমদানি নথিতে লেনদেনের ধরন হিসেবে ‘মুদ্রা স্থানান্তর ছাড়া’ উল্লেখ ছিল।
এর অর্থ, বিদেশে অবস্থানরত মধ্যস্থতাকারী বা বিশ্বস্ত প্রতিনিধিরা বিদেশি ব্যাংকে থাকা অর্থ ব্যবহার করে পণ্য কিনতেন। পরে সেসব পণ্য ইরানে পাঠানো হতো। এভাবে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অর্থ স্থানান্তরের সঙ্গে যুক্ত সম্ভাব্য সতর্কসংকেত এড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। ইরানের বিদেশে তেল বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থের একটি অংশ এ ধরনের ক্রয়ে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
ইরানের গোপন সামরিক সরবরাহ নেটওয়ার্কের সঙ্গে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস এবং দেশটির প্রভাবশালী আধা-সরকারি ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর সম্পর্ক রয়েছে। ইরানে এসব গোষ্ঠী ‘বোনিয়াদ’ নামে পরিচিত। দেশটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিজাতদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকগুলোর সম্পদের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর রাজপরিবার ও অন্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে বাজেয়াপ্ত করা সম্পদ দিয়ে।
ব্যাংক সেপাহের নথিতে থাকা ৯১টি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ফোন নম্বর আইআরজিসি সদস্যদের ব্যাংক হিসাবের তথ্যেও পাওয়া গেছে। এসব ব্যক্তির মধ্যে অন্তত দুজন সামরিক কমান্ডার রয়েছেন, যাঁদের বিরুদ্ধে বেসামরিক বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ এনেছে যুক্তরাষ্ট্র।
ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরির উপকরণ আমদানি
নেটওয়ার্কটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোর একটি এমওডি ৩৪৬৪২৮। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এই সংস্থা ২৩০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম আমদানি করেছে বলে আমদানি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে।
সংস্থাটি রকেটের জ্বালানি তৈরির রাসায়নিক, বিস্ফোরক, অস্ত্রের যন্ত্রাংশ এবং ভারী ট্রাক সংগ্রহ করেছে। এসব উপকরণ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরি এবং সেগুলো উৎক্ষেপণের কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। তবে আমদানি করা সব পণ্যের প্রকৃত ব্যবহার স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। কয়েকটি পণ্য বেসামরিক শিল্পেও ব্যবহার করা যায়।
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে সংস্থাটি চীন থেকে ইরানের বন্দর আব্বাস বন্দরে ৮৮৬ টন রাসায়নিক আমদানি করে। নথিতে এসব পণ্যের উৎস হিসেবে চীনের নাম ছিল। রাসায়নিকগুলোর শ্রেণিবিন্যাসে সোডিয়াম ক্লোরেট ও অন্যান্য পারক্লোরেট অন্তর্ভুক্ত ছিল, যেগুলো কঠিন জ্বালানিচালিত রকেটের জ্বালানি তৈরিতে ব্যবহৃত হতে পারে।
চূড়ান্ত চালানটি পৌঁছানোর তিন দিন পর বন্দর আব্বাসে একটি বড় বিস্ফোরণ ঘটে। ২০২৫ সালের ২৬ এপ্রিলের ওই বিস্ফোরণে অন্তত ৭০ জন নিহত এবং ১ হাজার ২০০ জনের বেশি আহত হন। ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত দুই ব্যক্তি জানিয়েছেন, বন্দর এলাকায় কনটেইনারে রাখা সোডিয়াম পারক্লোরেট জ্বলে ওঠায় বিস্ফোরণ ঘটে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছিল, রাসায়নিকগুলো সিনা পোর্ট অ্যান্ড মেরিন সার্ভিসেস ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির তত্ত্বাবধানে ছিল। প্রতিষ্ঠানটি বোনিয়াদ মোস্তাজাফানের মালিকানাধীন, যা ইরানের সর্বোচ্চ নেতার নিয়ন্ত্রণাধীন একটি প্রভাবশালী সংস্থা। তবে আমদানি করা রাসায়নিকের সর্বশেষ ৭৫ টনের চালানটি বিস্ফোরণের জন্য দায়ী ছিল কি না, তা নিশ্চিত করতে পারেনি অনুসন্ধানী দল। বিস্ফোরণের পর প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা চালানের উপাদান সম্পর্কে ভুল তথ্য এবং নথিপত্রের ঘাটতির বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন।
যুদ্ধ শুরুর আগের মাসেও ইরানে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক পৌঁছায়। ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বন্দর আব্বাসে চীন থেকে ৯৩ টন অপরিশোধিত টাইটানিয়াম আসে। উচ্চশক্তিসম্পন্ন এই ধাতু ক্ষেপণাস্ত্রের বাইরের কাঠামো ও রকেটের মোটর তৈরিতে ব্যবহার করা যায়। একই মাসে বিভিন্ন জাহাজে মোট ২৬৮ টন নাইট্রোসেলুলোজ এবং আরও ২৭৬ টন রাসায়নিক আসে। এগুলোর মধ্যে রকেটের জ্বালানি ও বিস্ফোরক তৈরিতে ব্যবহৃত হতে পারে এমন উপাদান ছিল।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে আমদানি করা পণ্যের মধ্যে ছিল ১৯ লাখ ডলারের ডেটোনেটর, বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক, উড়োজাহাজের ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ, রকেটের জ্বালানি তৈরির উপাদান এবং ভারী যানবাহন। অস্ত্র ও নিষেধাজ্ঞাবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উপকরণ শাহেদ সিরিজের ড্রোনসহ বিভিন্ন ধরনের ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী সহকারী অধ্যাপক পিটার স্যালিসবারি ইরানের অস্ত্র সরবরাহ নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি বলেন, এই তথ্য ইরানের বিদ্যমান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের বহর পুনর্গঠন বা সম্প্রসারণের শিল্পভিত্তিক প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয়। তাঁর মতে, নতুন নতুন সরবরাহপথ খুঁজে নেওয়ার ক্ষেত্রে ইরানের ব্যবস্থাটি যথেষ্ট অভিযোজনক্ষম।
যুদ্ধের মধ্যেও থামেনি আমদানি
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালায়। এর মধ্যে অস্ত্র উৎপাদনকারী কারখানাও ছিল। তবে হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতার কতটা ক্ষতি হয়েছে, তা স্বাধীনভাবে নির্ধারণ করা যায়নি।
আমদানি তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম মাস মার্চে ইরানের সামরিক সরঞ্জাম আমদানি আগের মাসের তুলনায় ৪৭ শতাংশ কমে ৫ কোটি ৪০ লাখ ডলারে নেমে আসে। কিন্তু মে মাসে তা আবার বেড়ে ৭ কোটি ৭০ লাখ ডলারে পৌঁছায়। নথি অনুযায়ী, রাশিয়া থেকে ক্যাস্পিয়ান সাগর পেরিয়ে জাহাজে, মধ্য এশিয়া থেকে ট্রাকে এবং চীন থেকে মালবাহী উড়োজাহাজে বিভিন্ন পণ্য ইরানে এসেছে।
২০২৫ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত রাশিয়া থেকে পাঁচটি চালানে মোট ৭৬ লাখ ডলারের ডেটোনেটর এসেছে। সর্বশেষ চালানটি ছিল ২০২৬ সালের জুনে, যার মূল্য ১৯ লাখ ডলার। ডেটোনেটর উচ্চক্ষমতার বিস্ফোরক সক্রিয় করতে ব্যবহৃত হতে পারে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের উৎস হিসেবে নথিভুক্ত প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ ডলারের পণ্য ইরানের সামরিক বাহিনী কিনেছে। এসব পণ্যের প্রায় সবই সমুদ্রপথে পৌঁছেছে। সর্বশেষ চালানটি ২৭ জুন ইলেকট্রনিক পণ্য হিসেবে নথিভুক্ত হয়, যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ স্থগিতের ঘোষণা দেওয়ার নয় দিন পর। জুলাইয়ের মাঝামাঝি অবরোধ আবার চালু হয়। ইরানের সামরিক বাহিনী যখন সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবকাঠামো ও অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালাচ্ছিল, তখনই একই উৎস থেকে পণ্য আসার তথ্য দুই দেশের জটিল বাণিজ্যিক পরিস্থিতিকে সামনে এনেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো থেকেও ইরানের সামরিক নেটওয়ার্কে পণ্য এসেছে। আমদানি নথিতে জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য দেশের উৎস হিসেবে কয়েক শ কোটি ডলারের ট্রাক, উড়োজাহাজের ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ ও ইলেকট্রনিক পণ্যের তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে ৩ কোটি ৪০ লাখ ডলারের আইভেকো ট্রাকও ছিল। তবে সব চালানের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়নি। কিছু ক্ষেত্রে পণ্যের ধরন ও ঘোষিত উৎস শনাক্ত করতে শুল্কসংক্রান্ত শ্রেণিবিন্যাসের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। ফলে প্রতিটি চালানের উৎস ও চূড়ান্ত ব্যবহার স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণে ব্যবহৃত ভারী ট্রাক
ইরানের সামরিক বাহিনী ভারী বাণিজ্যিক ট্রাক পরিবর্তন করে মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযান হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এসব যান সাধারণ পণ্যবাহী ট্রাকের মতো দেখালেও প্রয়োজন অনুযায়ী সামরিক সরঞ্জাম বহন ও উৎক্ষেপণের কাজে ব্যবহার করা যায়।
এমওডি ৩৪৬৪২৮ সংস্থা ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত আরও ৪৩৫টি আইভেকো ট্রাক আমদানি করেছে। উপগ্রহচিত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও এবং আমদানি নথি বিশ্লেষণ করে কয়েকটি ট্রাককে তেহরানের উপকণ্ঠে একটি শুল্কগুদামে শনাক্ত করা হয়েছে। তিনটি গাড়ির শনাক্তকরণ নম্বরও আমদানি তথ্যের সঙ্গে মেলানো হয়েছে।
এর আগে ২০২২ সালের শরতে ইতালিতে বসবাসরত এক ইরানি গাড়ি ব্যবসায়ী ৪ লাখ ২৬ হাজার ইউরোতে ছয়টি আইভেকো ইউরোকার্গো ট্রাক কিনেছিলেন। উইকিইরানের নথি অনুযায়ী, ট্রাকগুলো দুবাইয়ের ডেইলামি ট্রেডিং কোম্পানির কাছে পাঠানো হয়। পরে সেগুলো বন্দর আব্বাসে পৌঁছায়। চালানের শেষ ক্রেতার পরিচয়সংক্রান্ত নম্বরটি এমওডি ৩৪৬৪২৮-এর সঙ্গে মিলে যায়। নথিতে গাড়িগুলোর চূড়ান্ত প্রাপক হিসেবে ড্রোন উৎপাদন ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত সাহারা থান্ডারের নাম ছিল।
২০২৬ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করে। এতে ইরানের একটি ছদ্মবেশী মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযানে হামলার দৃশ্য দেখানো হয়। যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা বিশ্লেষকেরা ভিডিওতে দেখা ট্রাকটিকে আইভেকো মডেলের বলে শনাক্ত করেন। তবে সেটি এমওডি ৩৪৬৪২৮-এর আমদানি করা গাড়িগুলোর একটি ছিল কি না, তা নিশ্চিত করা যায়নি।
আইভেকো জানিয়েছে, তাদের অনুমোদিত পরিবেশকদের নিশ্চিত করতে হয় যে পণ্য সামরিক, রাসায়নিক, জীবাণু বা পারমাণবিক কাজে ব্যবহৃত হবে না। নিষিদ্ধ দেশ, সংস্থা বা ব্যক্তির কাছে পণ্য পৌঁছানো ঠেকাতে কোম্পানিটির চুক্তিভিত্তিক সুরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। কোম্পানিটির বক্তব্য, যেসব তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে তাদের সরাসরি চুক্তি নেই, তাদের মাধ্যমে পণ্য স্থানান্তর বা রপ্তানির ওপর আইভেকোর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ইরানে আইভেকো গাড়ির উপস্থিতি কোম্পানিটির নিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্বের বাইরে ঘটেছে বলেও দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২২ সালের ওই বিক্রির কোনো রেকর্ড তাদের কাছে নেই এবং ২০২৫ সালে শনাক্ত করা অধিকাংশ ট্রাক মধ্য এশিয়ায় যাওয়ার কথা ছিল বলে জানিয়েছে আইভেকো।
আইভেকোর পাশাপাশি ইরান হাজার হাজার টয়োটা হাইলাক্স ও ল্যান্ড ক্রুজার ট্রাকও আমদানি করেছে। এসব গাড়ির পেছনের খোলা অংশে ভারী মেশিনগান বসিয়ে ব্যবহার করতে পারে আইআরজিসি ও তাদের সহযোগী গোষ্ঠীগুলো। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এমওডি ৩৪৬৪২৮ চারটি টয়োটা টুন্ড্রা আমদানি করে। আইআরজিসি ড্রোন পরিবহনের কাজে এ ধরনের গাড়ি ব্যবহার করে বলে জানা গেছে। টয়োটা জানিয়েছে, তারা ইরানে কোনো ব্যবসা পরিচালনা করে না এবং অনুসন্ধানে উল্লেখ করা কেনাকাটায় তাদের অংশগ্রহণ ছিল না। জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ও বলেছে, জাতীয় নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট পণ্যের রপ্তানিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
সামরিক সরবরাহের সঙ্গে রাজনৈতিক ও দমনমূলক কাঠামোর যোগ
অনুসন্ধানে শুধু অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম আমদানিই নয়, ইরানের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে এই নেটওয়ার্কের সম্পর্কও উঠে এসেছে।
এর একটি উদাহরণ ফাউন্ডেশন ফর দ্য প্রিজারভেশন অব রেলিকস অ্যান্ড পাবলিকেশন অব স্যাক্রেড ডিফেন্স ভ্যালুজ। প্রতিষ্ঠানটির কাজের মধ্যে ইরানের সরকারি আদর্শ, প্রতিরোধ, আত্মত্যাগ ও জিহাদের সংস্কৃতি প্রচার করা রয়েছে। নথিতে দেখা যায়, ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠানটি চারটি চালানে ইলেকট্রনিক পণ্য ও শীতলীকরণ যন্ত্রাংশ গ্রহণ করেছিল। চালানের পরিচয়সংক্রান্ত নম্বরটি আবারও এমওডি ৩৪৬৪২৮-এর সঙ্গে মিলে যায়।
প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বে ইরানের ৩১টি প্রদেশের আইআরজিসির জ্যেষ্ঠ কমান্ডাররা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। খুজেস্তান প্রদেশে এই কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান শাহভারপুরের বিরুদ্ধে অতীতে বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ এনেছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞাসংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালে মহশাহর এলাকায় জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভের সময় শাহভারপুরের অধীন বাহিনীর সদস্যরা অন্তত ১০০ বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মানবাধিকারকর্মীদের বর্ণনা অনুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনী সাঁজোয়া যান দিয়ে পালানোর পথ আটকে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে শাহভারপুরের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
২০২১ সালে খুজেস্তানে আইআরজিসির একটি নতুন ভবন নির্মাণের জন্য শাহভারপুর একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্পাত কোম্পানির কাছে ৫ হাজার কোটি রিয়াল চেয়েছিলেন বলে একটি নথিতে দেখা যায়। অর্থ পাঠানোর জন্য নির্ধারিত হিসাবটি এমওডি ৪২৪০০০ নামে একটি সংস্থার ছিল।
চলতি বছরের শুরুতে ইরানের অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে দেশজুড়ে নতুন বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে খুজেস্তানেও নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের অভিযোগ ওঠে। দুই মানবাধিকারকর্মীর দাবি, তাঁরা সেখানে নিহত ৪৬ জনের নাম নথিভুক্ত করেছেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, ৮ ও ৯ জানুয়ারি আইআরজিসির গুলিতে বেশির ভাগ মানুষ নিহত হন।
এ ধরনের ঘটনা সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের নেটওয়ার্ক এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে সম্ভাব্য যোগসূত্রের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তবে আমদানি করা প্রতিটি পণ্য সরাসরি দমনমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছে, এমন প্রমাণ অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি।
চীন ও রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১২ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছিলেন, চীন ও রাশিয়া ইরানের যুদ্ধ প্রচেষ্টায় উল্লেখযোগ্য সহায়তা দিচ্ছে বলে তিনি মনে করেন না। তাঁর বক্তব্য ছিল, সহায়তা দিয়ে থাকলেও তা খুবই সীমিত, কারণ এ ধরনের পদক্ষেপে দুই দেশের অনেক কিছু হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।
কিন্তু আমদানি নথিতে চীন থেকে রাসায়নিক, টাইটানিয়াম ও অন্যান্য সামগ্রী এবং রাশিয়া থেকে ডেটোনেটর আসার তথ্য পাওয়া গেছে। এর পাশাপাশি জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য দেশ থেকে ট্রাক, ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ ও ইলেকট্রনিক পণ্য সরবরাহের রেকর্ড রয়েছে।
তবে ইরানের গোপন সামরিক সরবরাহ নেটওয়ার্কে আসা এসব বাণিজ্যিক চালানের তথ্য থেকেই সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে ইরানের যুদ্ধ প্রচেষ্টায় সহায়তা করেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। কিছু পণ্য দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য, অর্থাৎ বেসামরিক শিল্প ও সামরিক উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা সম্ভব। চালানের উৎস হিসেবে কোনো দেশের নাম থাকা এবং সেই দেশের সরকার সরাসরি সামরিক সহায়তা দেওয়া এক বিষয় নয়।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা বর্ণিত পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত নয়। আঞ্চলিক সংঘাতের সঙ্গে চীনকে বিদ্বেষপূর্ণভাবে যুক্ত করা বা দেশটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে বলেও জানিয়েছে বেইজিং।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, হোয়াইট হাউস এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি। ইরানের সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেও বিস্তারিত প্রশ্ন পাঠানো হলেও তাদের কাছ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেছেন, ওয়াশিংটন ইরানের সরকারের অর্থনৈতিক আয়ের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলো বন্ধ করেছে। তাঁর দাবি, নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে সামরিক কর্মসূচির অর্থায়ন ও বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহের চেষ্টা চললেও যুক্তরাষ্ট্র এসব প্রচেষ্টার চেয়ে এগিয়ে রয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা কতটা কার্যকর, নতুন প্রশ্ন
ইরানের সামরিক সংস্থাগুলো কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকলেও অনুসন্ধানে নথিভুক্ত নম্বরযুক্ত সংস্থাগুলোর কোনোটি পশ্চিমা সরকারগুলোর নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছে, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অথচ এসব সংস্থার সঙ্গে সামরিক সরঞ্জাম আমদানি, বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব এবং নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর বিভিন্ন ব্যবস্থার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ২০২৪ সালে সাহারা থান্ডারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। প্রতিষ্ঠানটি রাশিয়ার কাছে ড্রোন তৈরি ও সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। একই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ভারী ট্রাক ও সামরিক সরঞ্জাম কেনার তথ্যও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে শুধু পরিচিত সামরিক প্রতিষ্ঠান বা নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে তালিকাভুক্ত করাই যথেষ্ট নয়। তাদের সঙ্গে যুক্ত মধ্যস্থতাকারী, আড়াল করা কোম্পানি, আর্থিক হিসাব এবং পণ্য পরিবহনের বিকল্প পথও শনাক্ত করা জরুরি।
অনুসন্ধানের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। আমদানি তথ্যের প্রায় ১৯ হাজার রেকর্ডের একটি অংশ জাহাজ চলাচলের নথি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও এবং রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। সব চালানের পণ্য, উৎস ও চূড়ান্ত ব্যবহার স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তারপরও নথিগুলো ইঙ্গিত দেয়, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধের মধ্যেও ইরানের সামরিক সরবরাহব্যবস্থা বিকল্প পথ ব্যবহার করে সক্রিয় থাকতে পেরেছে। গোপন সংস্থা, বিদেশে থাকা মধ্যস্থতাকারী এবং জটিল আর্থিক ব্যবস্থার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ইরানের গোপন সামরিক সরবরাহ নেটওয়ার্ক দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কর্মসূচি সচল রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।












