স্পেনে আবারও ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। বুধবার (২৮ অক্টোবর) দেশটির মধ্যাঞ্চলে একটি দ্রুতগতির ট্রেন সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকটি ট্রেনের পেছনে ধাক্কা দিলে অন্তত ৬৮ জন নিহত হন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৮০ জন, যাঁদের মধ্যে ১৫ জনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। দুর্ঘটনার পর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আরও কেউ আটকে আছেন কি না, তা খুঁজে দেখতে উদ্ধারকর্মীরা তল্লাশি চালান। ফলে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চলতি বছর স্পেনে এটি দ্বিতীয় বড় প্রাণঘাতী রেল দুর্ঘটনা। এর আগে জানুয়ারিতে একই রেলপথে আরেকটি দুর্ঘটনায় ৪৬ জন নিহত হয়েছিলেন। সর্বশেষ দুর্ঘটনাটি ২০১৩ সালের পর ইউরোপের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ট্রেন দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ওই বছর স্পেনের সান্তিয়াগো দে কমপোস্তেলায় একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ দুর্ঘটনার পর শোক প্রকাশ করে বলেন, পুরো স্পেন শোকের মধ্যে রয়েছে। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করে যেকোনো ধরনের ত্রুটি চিহ্নিত করার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। একই বছরে দুটি বড় ট্রেন দুর্ঘটনার ঘটনা দেশটির দ্রুতগতির রেলব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে মাদ্রিদে সাংবাদিকদের জানান, সংকেত ব্যবস্থায় কম্পিউটার যোগাযোগের ত্রুটির কারণে লাল সংকেত জারি হয়েছিল। ওই সংকেতের অর্থ ছিল ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ভুল সিদ্ধান্তের কারণে একটি রেনফে ট্রেনকে আবার চলার অনুমতি দেওয়া হয়। সামনে আরেকটি ট্রেন দাঁড়িয়ে থাকায় শেষ পর্যন্ত সংঘর্ষ ঘটে বলে প্রাথমিকভাবে জানানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী সানচেজ বলেন, এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হবে। তদন্তে নিরাপত্তাব্যবস্থার কোনো দুর্বলতা উঠে এলে তা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। দ্রুতগতির রেলব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে নিরাপত্তা আরও জোরদার করার প্রয়োজন হলে সরকার তা করবে বলেও জানান তিনি। তবে জানুয়ারির দুর্ঘটনা ও সর্বশেষ সংঘর্ষের কারণ দুটি পরস্পর সম্পর্কিত বলে এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে না।
ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়েন যাত্রীরা
দুর্ঘটনাটি ঘটে মাদ্রিদের দক্ষিণে কাস্তিয়া-লা মাঞ্চা অঞ্চলের গ্রামীণ এলাকায়, মোরার ও অর্গাজ শহরের মধ্যবর্তী রেলপথে। স্থানীয় সময় সকাল প্রায় ৯টার দিকে সংঘর্ষের পর কয়েকটি বগি লাইনচ্যুত হয়। অন্তত তিনটি বগি উঁচু রেলপথ থেকে নিচের ঢালে পড়ে যায়। ঘটনাস্থলে ছড়িয়ে পড়ে দুমড়েমুচড়ে যাওয়া ধাতব অংশ ও ট্রেনের বিভিন্ন ধ্বংসাবশেষ।
উদ্ধারকাজে অংশ নিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় অ্যাম্বুলেন্স, হেলিকপ্টার ও অন্যান্য জরুরি সেবার দল। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আটকে পড়া যাত্রীদের উদ্ধারের পাশাপাশি হতাহতদের শনাক্ত করার কাজও চলে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার পরও উদ্ধারকর্মীরা তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ক্ষতিগ্রস্ত বগিগুলো সরানোর পর আরও মরদেহ পাওয়া যেতে পারে কি না, সে বিষয়ে তখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আহত যাত্রীদের কয়েকজনের শরীরে রক্তের দাগ ছিল, কারও শরীরে বাঁধা ছিল ব্যান্ডেজ। তাঁদের কাছের একটি সড়ক দিয়ে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যে ১৫ জনের অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর বলে জানিয়েছেন স্পেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোনিকা গার্সিয়া।
৬২ বছর বয়সী যাত্রী সালভাদর আরিজা দুর্ঘটনার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, ট্রেনের দরজার কাছাকাছি থাকায় তাঁর বেরিয়ে আসার সুযোগ ছিল। অন্য যাত্রীরা জানালা ভেঙে বের হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। অনেকেই আসনের মাঝখানে আটকে পড়ায় নড়াচড়া করতে পারছিলেন না।
আরেক যাত্রী রাফায়েল বার্সেলো জানান, কফি খেতে নিজের আসন থেকে উঠে যাওয়ায় তিনি বড় ধরনের বিপদ থেকে বেঁচে গেছেন বলে মনে করছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যাত্রীরা সকালের নাশতা খাচ্ছিলেন এবং কফি পান করছিলেন। হঠাৎ প্রচণ্ড ধাক্কায় তাঁরা ছিটকে পড়েন। তাঁর বগি থেকেই অন্তত আটজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে বলে তিনি জানান।
কীভাবে ঘটল সংঘর্ষ
কাস্তিয়া-লা মাঞ্চা আঞ্চলিক সরকারের এক মুখপাত্র জানান, দুর্ঘটনার সময় ইরিও পরিচালিত ট্রেনটিতে ১৪৭ জন এবং রাষ্ট্রীয় রেল পরিচালনাকারী সংস্থা রেনফের ট্রেনটিতে ৩৯৭ জন যাত্রী ছিলেন। সংঘর্ষে ইরিও ট্রেনের দুটি বগি লাইনচ্যুত হয়।
রেনফে জানিয়েছে, চলাচলের অনুমতি পাওয়ার পর তাদের ট্রেনটি সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ইরিওর ট্রেনের সঙ্গে ধাক্কা খায়। ইরিওর ট্রেনটি কেন দাঁড়িয়ে ছিল, তা তখনো পরিষ্কার হয়নি। রেনফের বক্তব্য অনুযায়ী, ট্রেনটিকে নির্দেশনা অনুসারে চলতে বলা হয়েছিল। কী পরিস্থিতিতে সংঘর্ষ ঘটেছে, ট্রেন চলাচলের অবস্থা কেমন ছিল এবং ঘটনাগুলোর সুনির্দিষ্ট ক্রম কী—এসব তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
ইরিও জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পর তারা জরুরি ব্যবস্থা সক্রিয় করেছে। তবে রেল অবকাঠামো পরিচালনাকারী রাষ্ট্রীয় সংস্থা আদিফ এবং ইরিও এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।
একই রেলপথে দ্বিতীয় বড় দুর্ঘটনা
চলতি বছরের জানুয়ারিতে একই রেলপথে দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষে ৪৬ জন নিহত হওয়ার পর দেশটির রেলব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছিল। ওই দুর্ঘটনায় একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা আরেকটি ট্রেনের সঙ্গে ধাক্কা খায়।
ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত সিভিল গার্ডের একটি প্রাথমিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, জানুয়ারির দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে রেলপথ, রেললাইন অথবা দুটি রেললাইনের সংযোগস্থলে ঝালাইয়ের ত্রুটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে তদন্তকারীরা আরও সাতটি সম্ভাবনাও খোলা রেখেছিলেন।
এবারের দুর্ঘটনার পর একই ধরনের প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে। তবে জানুয়ারির দুর্ঘটনার সঙ্গে বুধবারের সংঘর্ষের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত চলছে।
রেলপথের রক্ষণাবেক্ষণে বিনিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন
স্পেনের রেল নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে লাইনচ্যুতি ও সংঘর্ষসহ বিভিন্ন ধরনের রেল দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে। ২০১৬ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল ৪৫, যা ২০২৪ সালে বেড়ে ৫৭ এবং ২০২৫ সালে ৬৯-এ পৌঁছায়।
স্পেনের প্রতিযোগিতা কর্তৃপক্ষের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশটিতে প্রায় আড়াই কোটি যাত্রী দ্রুতগতির ট্রেনে ভ্রমণ করেছেন। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ সংখ্যা প্রায় ১৪ শতাংশ কম।
ইউরোপীয় কমিশনের তথ্যেও স্পেনের দ্রুতগতির রেলপথের রক্ষণাবেক্ষণে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। দেশটিতে প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দ্রুতগতির রেলপথ রয়েছে। ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এই নেটওয়ার্কে বছরে গড়ে প্রায় ১৫০ কোটি ইউরো ব্যয় করেছে স্পেন, যা ইউরোপের অন্য দেশগুলোর তুলনায় বেশি। তবে এই অর্থের বড় অংশ ব্যয় হয়েছে নতুন রেলপথ নির্মাণে। রক্ষণাবেক্ষণ, পুরোনো অবকাঠামো সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ ছিল মোট অর্থের মাত্র প্রায় ১৬ শতাংশ।
পরপর দুটি বড় দুর্ঘটনার পর রেলপথের নিরাপত্তা, সংকেতব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা এবং অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণে বিনিয়োগের যথার্থতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এদিকে দুর্ঘটনার পর নিহতদের স্বজনদের জন্য একটি বিশেষ ফোনলাইন চালু করেছে রেনফে। মাদ্রিদ থেকে আন্দালুসিয়া পর্যন্ত দ্রুতগতির রেলপথে ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত টিকিট বিক্রি স্থগিত রাখার কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি।
আগামী মাসে নির্বাচনের আগে দুর্ঘটনাটির রাজনৈতিক প্রভাবও পড়তে শুরু করেছে। স্পেনের প্রধান বিরোধী দল পিপলস পার্টি দুর্ঘটনার কারণে দিনের সব নির্বাচনী প্রচার কর্মসূচি বাতিল করেছে।












