ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ আবারও তীব্র হয়ে উঠেছে। দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার ও হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে লড়াই এখন উত্তরাঞ্চলের আল-জাওফ থেকে পূর্বের মারিব, মধ্যাঞ্চলের তাইজ এবং দক্ষিণ লোহিত সাগর উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত। একই সঙ্গে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন আরব জোটের সঙ্গেও হুতিদের সংঘাত নতুন করে জোরালো হয়েছে। ফলে ইয়েমেনের যুদ্ধ এখন শুধু ক্ষমতা দখলের লড়াই নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে আঞ্চলিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ এবং দেশের ভেতরের সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক বিভাজন।
২০১৪ সালে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে হুতিরা ইয়েমেনের এমন একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে, যেখানে দেশটির প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষের বসবাস। অঞ্চলটি মূলত ১৯৯০ সালে একীভূত হওয়ার আগে উত্তর ইয়েমেন নামে পরিচিত ছিল। তবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকা এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এর মধ্যে রয়েছে তেলসমৃদ্ধ মারিব, লোহিত সাগরের অধিকাংশ উপকূল এবং মধ্যাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ শহর তাইজ। দক্ষিণ ইয়েমেনের সাবেক প্রদেশগুলোতেও হুতিদের কার্যত কোনো উপস্থিতি নেই। সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি পুনরায় একীভূত হওয়ার আগের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার দাবি জানাচ্ছে।
সৌদি আরব-ইরান প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রভাব
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার সৌদি আরবের সমর্থন পায়। অন্যদিকে বিশ্লেষকদের ধারণা, হুতিদের পেছনে ইরানের সহায়তা রয়েছে। তবে তেহরান এই অভিযোগ অস্বীকার করে।
চলতি বছরের জুলাইয়ে হুতিদের নিয়ন্ত্রিত সানা বিমানবন্দরে ইরানের মাহান এয়ারের একটি বিমান অবতরণের চেষ্টা করলে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়। ইয়েমেন সরকার জানায়, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই বিমানটি আসছিল। সরকার আশঙ্কা করেছিল, এতে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কর্মকর্তা এবং অস্ত্র থাকতে পারে। হুতিরা অবশ্য দাবি করে, বিমানটিতে তাদের একটি প্রতিনিধিদল ও ইরানে চিকিৎসা নেওয়া কয়েকজন ইয়েমেনি রোগী ছিলেন।
বিমানটি অবতরণ ঠেকাতে সরকার সানা বিমানবন্দরের একমাত্র সচল রানওয়েতে বোমা হামলা চালায়। এর জবাবে হুতিরা সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে হামলা করে। এতে ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় শুরু হওয়া এবং প্রায় চার বছর ধরে টিকে থাকা অনানুষ্ঠানিক উত্তেজনা প্রশমনের ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।
এরপর সংঘর্ষের মাত্রা বাড়ে। হুতিরা লোহিত সাগরের উপকূলের কয়েকটি অংশ দখল করে বাব আল-মানদেব প্রণালির মায়ুন দ্বীপ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। সেপ্টেম্বরে প্রাথমিক লড়াইয়ের ধাক্কা সামলানোর পর দেখা যায়, তাইজ শহর তিন দিক থেকে অবরুদ্ধ। শহরটিতে দক্ষিণ দিক থেকে রসদ পৌঁছানো ঠেকাতে দুই পক্ষের মধ্যে লড়াই চলতে থাকে।
তাইজ কেন যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু
হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা রাজধানী সানা এবং দক্ষিণের বন্দরনগরী এডেনের মাঝামাঝি অবস্থান তাইজের। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সড়কের সংযোগস্থল হওয়ায় শহরটি ইয়েমেনের প্রধান পরিবহনকেন্দ্র। মোখা বন্দরের সঙ্গেও এর সড়ক যোগাযোগ রয়েছে। একসময় কফি বাণিজ্যের জন্য পরিচিত এই বন্দর আন্তর্জাতিকভাবে ‘কফি বন্দর’ নামেও পরিচিত ছিল।
সানা ও এডেনের পর ইয়েমেনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর তাইজে বাস করে ১০ লাখের বেশি মানুষ। গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপ্রধান অঞ্চলে অবস্থিত শহরটি ঐতিহাসিকভাবে উত্তর ইয়েমেনের শাফেয়ি সুন্নি সম্প্রদায়ের প্রধান কেন্দ্র।
ইয়েমেনের রাজতান্ত্রিক ইমামত শাসনামলে জায়দি ও শাফেয়ি সম্প্রদায়ের বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে সানা ও তাইজের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা উসকে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৬২ সালের প্রজাতান্ত্রিক বিপ্লবের পর সেই উত্তেজনা কিছুটা কমলেও সাবেক প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহের শাসনামলের শেষ দিকে সাম্প্রদায়িক বক্তব্য আবার জোরালো হয়।
বর্তমানে হুতিদের জায়দি শিয়া পরিচয়ের বিপরীতে তাদের প্রতিপক্ষের মধ্যে রয়েছে মুসলিম ব্রাদারহুড-সংশ্লিষ্ট আল-ইসলাহ পার্টি এবং সালাফি গোষ্ঠীগুলো। সরকারপক্ষের হয়ে লড়ছে সালাফি জায়ান্টস ব্রিগেড, নেশনস শিল্ড বাহিনী এবং ফার্স্ট ইমার্জেন্সি ডিভিশন।
তাইজ দখলের পরিণতি কী হতে পারে
হুতিদের কাছে তাইজ দখল করা হবে সরকার ও তাদের সমর্থকদের জন্য বড় সামরিক ও রাজনৈতিক পরাজয়। অন্যদিকে শহরটি হুতিদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখতে পারলে সরকারপক্ষের মনোবল বাড়বে।
তাইজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মাধ্যমে ইয়েমেনে সুন্নি প্রভাব কমিয়ে নিজেদের জায়দি মতাদর্শের অবস্থান শক্ত করার লক্ষ্যও হুতিদের রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শহরটি দখল হলে সেখানকার সুন্নি জনগোষ্ঠীর বড় অংশ দক্ষিণাঞ্চলে বাস্তুচ্যুত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি হুতিবিরোধী নতুন যোদ্ধা সংগ্রহও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
এর প্রভাব পড়তে পারে মারিবের যুদ্ধেও। শহরটির নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে গেলে ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ তেলক্ষেত্র এবং সেখান থেকে পাওয়া রাজস্বের ওপর তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পথ সহজ হতে পারে।
এদিকে সরকার আশঙ্কা করছে, হুতিরা পুরো লোহিত সাগর উপকূলের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য বড় হুমকি তৈরি হবে। হুতিরা ‘বাড়তি উত্তেজনার জবাবে বাড়তি উত্তেজনা, অবরোধের জবাবে অবরোধ’ স্লোগানে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে অবরোধ ঘোষণা করেছে এবং বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে এশিয়ায় তেল পরিবহনকারী সৌদি জাহাজে হামলা চালিয়েছে।
তবে ইরানের মতো বাব আল-মানদেব প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করা সহজ হবে না—এটি হুতিরাও জানে। তাই আপাতত তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য তাইজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। শহরটির ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য নয়, দেশটির তেলসম্পদ ও গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ঘিরে আঞ্চলিক সংঘাতের গতিপথও প্রভাবিত করতে পারে।
ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ, হুতি বিদ্রোহী এবং সৌদি আরব-ইরান প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে তাইজ এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।
ইয়েমেনের যুদ্ধ নতুন করে তীব্র হওয়ায় তাইজ, মারিব ও লোহিত সাগর উপকূলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বাড়ছে সংঘাত। এর প্রভাব পড়তে পারে দেশটির তেলসম্পদ ও আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের নিরাপত্তায়।












