প্রশান্ত মহাসাগরের নীল জলরাশিতে ভেসে বেড়ায় এক অদ্ভুত প্রাণী। শরীরের ওপরের অংশ কালচে, নিচের অংশ উজ্জ্বল হলুদ। লেজটি চ্যাপ্টা, অনেকটা বৈঠার মতো। আকারে খুব বড় নয়—সাধারণত এর দৈর্ঘ্য প্রায় এক মিটার। তবু সাপের জগতে এর পরিচয় অনন্য। কারণ, আকারে নয়, বিস্তৃতির দিক থেকে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে থাকা সাপ।
প্রাণীটির নাম ইয়েলো-বেলিড সি স্নেক বা হলুদ-পেট সামুদ্রিক সাপ। বৈজ্ঞানিক নাম হাইড্রোফিস প্লাটুরাস; আগে এটি পেলামিস প্লাটুরাস নামে পরিচিত ছিল। ভারত মহাসাগর থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ জলরাশি পেরিয়ে মধ্য আমেরিকার উপকূল পর্যন্ত এর বিচরণ। সমুদ্রের স্রোতকে সঙ্গী করে হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পারে এই সাপ।
সমুদ্রই যার একমাত্র আবাস
অধিকাংশ সাপের মতো এই প্রাণীকে ডাঙায় উঠতে হয় না। এটি প্রকৃত অর্থেই সমুদ্রনির্ভর; জীবনের পুরোটা সময় পানিতে কাটায়। অন্য অনেক সামুদ্রিক সাপ উপকূল, প্রবালপ্রাচীর কিংবা সমুদ্রের তলদেশের কাছাকাছি থাকে। কিন্তু ইয়েলো-বেলিড সি স্নেকের বিশেষত্ব হলো, এটি উপকূল থেকে অনেক দূরের খোলা সমুদ্রেও বিচরণ করে।
এর শরীরের গঠনও পানিতে চলাচলের উপযোগী। চ্যাপ্টা ও বৈঠার মতো লেজ সাঁতারে সাহায্য করে। শরীরের ওপরের কালচে রং এবং নিচের উজ্জ্বল হলুদ অংশ একে সহজেই শনাক্ত করতে সাহায্য করে। লেজেও হলুদ ও কালচে দাগ থাকে। এ প্রজাতির সবচেয়ে বড় নথিভুক্ত নমুনার দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১১৩ সেন্টিমিটার।
স্রোতের সঙ্গে হাজার মাইলের যাত্রা
এই সাপের বিস্তৃতির পেছনে সমুদ্রস্রোতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গবেষকদের ধারণা, ইয়েলো-বেলিড সি স্নেক সব সময় শুধু নিজের শক্তিতে দীর্ঘ পথ সাঁতরে পাড়ি দেয় না। সমুদ্রের উপরিভাগের স্রোত ও ঘূর্ণাবর্তের সঙ্গে ভেসে নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।
২০১৬ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় সমুদ্রস্রোতের গতি ও দিক বিবেচনায় নিয়ে এই সাপের বিস্তার বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণাটিতে দেখা যায়, স্রোতের সহায়তায় এটি পৃথিবীর পরিধির দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি দূরত্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম। প্রশান্ত মহাসাগরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে এর উপস্থিতি ব্যাখ্যা করতেও স্রোতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
ভাসমান খাবারের অপেক্ষায়
ইয়েলো-বেলিড সি স্নেকের খাদ্যতালিকায় প্রধানত ছোট মাছ। সমুদ্রের উপরিভাগে ভাসমান শৈবাল, উদ্ভিদাংশ ও অন্যান্য জৈব পদার্থ জমে থাকা অংশের আশপাশে ছোট মাছ আশ্রয় নেয়। সাপটি এসব ভাসমান উপাদানের কাছে স্থির হয়ে অপেক্ষা করে। মাছ কাছে এলে দ্রুত শিকার করে।
এই সাপের শিকার ধরার কৌশল অনেকটা মাছের আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করা ভাসমান উপাদানের মতো। এটি পানিতে স্থির থেকে মাছের কাছে আসার অপেক্ষা করে। বিশেষ অভিযোজন হিসেবে ত্বকের মাধ্যমেও পানি থেকে অক্সিজেন শোষণ করতে পারে।
বিষধর হলেও মানুষের জন্য কতটা বিপজ্জনক?
দেখতে আকর্ষণীয় হলেও এই সাপ বিষধর। এর বিষে স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে এবং গুরুতর ক্ষেত্রে শ্বাসপ্রশ্বাসের পেশি অকার্যকর হয়ে পড়লে প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তবে মানুষের সঙ্গে এই সাপের সংঘাত তুলনামূলকভাবে বিরল। সামুদ্রিক সাপের কামড়ের অনেক ঘটনা ঘটে জেলেরা যখন জালে আটকে পড়া সাপ ছাড়ানোর চেষ্টা করেন।
তাই জালে বা নৌকার কাছে এমন সাপ দেখা গেলে সেটিকে ধরা বা স্পর্শ করার চেষ্টা করা উচিত নয়। সমুদ্রের এই প্রাণীকে দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করাই নিরাপদ।
আটলান্টিকে নেই কেন?
ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরে সামুদ্রিক সাপের বিভিন্ন প্রজাতি দেখা গেলেও আটলান্টিক মহাসাগর ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক সাপের স্বাভাবিক বিস্তার নেই। ইয়েলো-বেলিড সি স্নেকের মতো বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম এই প্রজাতির ক্ষেত্রেও সমুদ্রের তাপমাত্রা ও স্রোতের ধরন গুরুত্বপূর্ণ। আটলান্টিকের তুলনামূলক শীতল জলরাশি এবং দুই মহাসাগরের মধ্যবর্তী ভৌগোলিক ও পরিবেশগত প্রতিবন্ধকতা সামুদ্রিক সাপের বিস্তার সীমিত করেছে।
ইয়েলো-বেলিড সি স্নেক তাই কেবল একটি বিষধর সামুদ্রিক প্রাণী নয়; সমুদ্রস্রোত কীভাবে কোনো প্রাণীর বিস্তার, চলাচল ও জীবনধারাকে প্রভাবিত করতে পারে, তারও একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। শরীরের দৈর্ঘ্যে বড় না হয়েও পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে থাকা সাপ হিসেবে প্রশান্ত মহাসাগরের এই বাসিন্দা প্রকৃতির এক বিস্ময়।
প্রশান্ত মহাসাগরের ইয়েলো-বেলিড সি স্নেক আকারে ছোট হলেও বিস্তৃতির বিচারে অনন্য। সমুদ্রস্রোতের সহায়তায় ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরের বিশাল জলরাশিতে ছড়িয়ে থাকা এই বিষধর প্রাণীর জীবনযাপন বিজ্ঞানীদের কাছে বিশেষ আগ্রহের বিষয়।












