দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বয়কট ও ভোটবিমুখতা পেছনে ফেলে ইসরায়েলের নির্বাচনে রেকর্ডসংখ্যক ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আরব নাগরিক ভোট দিয়েছেন। দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে ডানপন্থি সরকারের চার বছর পার হওয়ার পর এবার বিপুলসংখ্যক আরব ভোটার মনে করেছেন, নির্বাচনে অংশ না নিলে নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ হাতছাড়া হবে।
মঙ্গলবারের নির্বাচনে আরব ভোটারদের উপস্থিতি প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে। আগের নির্বাচনে এই হার ছিল ৫৩ শতাংশ। নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন মুসাওয়া সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, এই অংশগ্রহণের ফলে ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্টে আরব দলগুলোর আসন দাঁড়িয়েছে ১৯টিতে। ফলে সরকার গঠনের হিসাব-নিকাশে তাদের প্রভাব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে।
ভোট বাড়ার পেছনে অপরাধ, বৈষম্য ও নেতানিয়াহুবিরোধী ক্ষোভ
আরব ভোটারদের ব্যাপক অংশগ্রহণের পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে আরব অধ্যুষিত এলাকায় সহিংস অপরাধের বিস্তার, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে ক্ষোভ এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি জোট সরকারের অবসান ঘটানোর আকাঙ্ক্ষা।
ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এবং অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচের মতো কট্টর ডানপন্থি নেতাদের নীতির বিরুদ্ধেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভোটাররা। নির্বাচনের ফল স্পষ্ট হওয়ার পর প্রধান আরব রাজনৈতিক জোট জয়েন্ট লিস্টের নির্বাচনী কার্যালয়ে ‘বেন-গভির, বাড়ি ফিরে যাও’ স্লোগান ওঠে।
নেতানিয়াহুর সরকারের আমলে গাজায় দীর্ঘ তিন বছর ধরে চলা যুদ্ধে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। একই সময়ে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতাও অব্যাহত রয়েছে।
জয়েন্ট লিস্টের নেতা আহমেদ তিবি বলেন, নেতানিয়াহু, স্মোত্রিচ ও বেন-গভিরের নীতিতে সৃষ্ট পরিস্থিতি বদলাতে এবং বর্তমান সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরাতেই আরব সম্প্রদায়ের মানুষ ভোট দিতে এসেছেন।
সরকার গঠনে নির্ধারক হতে পারে আরব দল
ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আরব নাগরিক। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার সময় যারা নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত হননি বা পালিয়ে যাননি, তাদের বংশধররাই মূলত এই জনগোষ্ঠী। নাগরিকত্ব পেলেও ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত তারা সামরিক শাসনের অধীনে ছিলেন। এরপরও ইসরায়েলি সমাজে বৈষম্যের শিকার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাদের।
নির্বাচনে আরব দলগুলোর ভালো ফলের কারণে নেতানিয়াহুর জোট কিংবা বিরোধী শিবির—কোনো পক্ষই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। ফলে জয়েন্ট লিস্ট ও আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ দল রা’আম সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তিবি জানিয়েছেন, সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বে বিরোধীদের সংখ্যালঘু সরকার গঠনে তারা সহায়তা করতে প্রস্তুত। তবে সরকারে যোগ দেওয়া বা মন্ত্রিত্ব নেওয়ার দাবি জানাবেন না তারা। তাদের শর্ত হলো, আরব সম্প্রদায়ের মধ্যে অপরাধ দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং বেদুইনদের বাড়িঘর ভাঙা বন্ধ করতে হবে।
তবে আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের বিষয়টি ইসরায়েলের রাজনীতিতে বিতর্কিত। অধিকাংশ ইহুদি ভোটার এমন ব্যবস্থার বিরোধী। বিরোধী জোটের কয়েকটি দলও আগে এ ধরনের সহযোগিতার সম্ভাবনা নাকচ করেছে। বামপন্থি ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান অবশ্য আরব নাগরিকদের সঙ্গে অংশীদারত্বে পরিবর্তনের সরকার গঠনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
নির্বাচনের ফল নিয়ে বিতর্ক, তদন্তের দাবি
আরব দলগুলোর সাফল্যের পর নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি অভিযোগ করেছে, তারা নির্বাচনের ফল ‘চুরি’ করেছে। বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির প্রধান নোয়াম সোলবার্গ দেশটির নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেতের প্রধানকে চিঠি লিখে আরব ভোটারদের উপস্থিতি বাড়াতে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ তদন্তের অনুরোধ জানান।
তবে চিঠিতে তিনি স্বীকার করেছেন, এসব সন্দেহের পক্ষে নিশ্চিত কোনো তথ্য তার কাছে নেই। ইসরায়েলি পুলিশও জানিয়েছে, অভিযোগের সমর্থনে তাদের কাছে কোনো প্রমাণ আসেনি।
আরব দলগুলোর নেতারা এসব অভিযোগকে উসকানিমূলক বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। রা’আম নেতা মানসুর আব্বাস তদন্তে সহযোগিতার কথা জানিয়েছেন। জয়েন্ট লিস্টের চেয়ারম্যান ইউসুফ জাবারিন বলেছেন, নেতানিয়াহু পরাজিত হয়েছেন এবং ভোটারদের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছেন না।
ভোটের মাধ্যমে অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা
নির্বাচনের দিন আরব অধ্যুষিত কয়েকটি এলাকায় কট্টর ডানপন্থি সমর্থকদের ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও উঠেছে। তায়বেহ শহরের এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, চাপ ও ভয়ভীতির কারণে এক বৃদ্ধা ও একজন অন্তঃসত্ত্বা নারী ভোট না দিয়েই কেন্দ্র ছেড়ে চলে যান।
তবে এসব পরিস্থিতির মধ্যেও আরব ভোটারদের বড় অংশ এবার নিজেদের রাজনৈতিক অধিকার প্রয়োগ করেছেন। ৬০ বছর বয়সী তিরার বাসিন্দা মুনথের মানসুর বলেন, দৈনন্দিন জীবনে বর্ণবাদ ও বৈষম্যের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় মানুষ এবার ভোট দিতে বাধ্য হয়েছেন বলে মনে করেছেন।
তার ভাষায়, তারা এই দেশেরই অংশ। তাই নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভোট দেওয়া জরুরি।
ইসরায়েলের নির্বাচনে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আরব নাগরিকদের রেকর্ড ভোটে বদলে যাচ্ছে ক্ষমতার সমীকরণ। ১৯ আসন নিয়ে সরকার গঠনে নির্ধারক হতে পারে আরব দলগুলো।












