রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপ শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এই ধাপের অনুমোদন দিয়েছে। পরীক্ষার ফল পর্যালোচনার পর তারা সবুজ সংকেত দেয়। এই ধাপের নাম পাওয়ার স্টার্ট। বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আগে এটিই শেষ বড় পরীক্ষা। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান অনুমোদনের কথা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, উৎপাদন শূন্য থেকে শুরু হবে। এরপর ধীরে ধীরে তা বাড়ানো হবে। প্রতিটি ধাপে যন্ত্রপাতির আচরণ খুঁটিয়ে দেখা হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যান মো. মাহমুদুল হাসান বলেছেন, এখন প্রথম ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়ার দিকে এগোবে। কবে এই ধাপ শুরু হবে, তা ঠিক করবে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।
সহজ ভাষায় বললে, এই ধাপে চুল্লির তাপ ধীরে ধীরে বাড়ানো হয়। সেই তাপে দ্বিতীয় বর্তনীতে বাষ্প তৈরি হয়। বাষ্প টারবাইন ঘোরায়, আর টারবাইন থেকে বিদ্যুৎ আসে। প্রকল্পের সাবেক পরিচালক ড. মো. শওকত আকবর একে একটি পরিবর্তনের পর্যায় বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, শুরুতে চুল্লির চাপ ক্ষমতার ১ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে তোলা হবে। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মতে, জেনারেটরকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সফলভাবে সমন্বিত করাই এই ধাপের বড় মাইলফলক। ইউনিটটি এর আগেই পারমাণবিক বিক্রিয়ার পর্ব শেষ করেছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী উৎপাদন ক্ষমতার ৩০ শতাংশে পৌঁছালে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। প্রতিটি ইউনিটের ক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। ফলে ৩০ শতাংশে পৌঁছালে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। কর্মকর্তারা বলছেন, সবকিছু ঠিক থাকলে ডিসেম্বরেই এই সরবরাহ শুরু হতে পারে। পরীক্ষামূলক উৎপাদন চলতে পারে সাত থেকে আট মাস। এরপরই বাণিজ্যিক উৎপাদনের কথা ভাবা হবে। গ্রিডে বিদ্যুৎ গেলে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ৩৩তম পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশ।
পথটা অবশ্য সহজ ছিল না। এই প্রকল্পের মূল সময়সীমা ছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বর। দুই দফা বাড়িয়ে তা এখন ২০২৮ সালের জুন করা হয়েছে। নিরাপত্তা ভালভ পরীক্ষায় ত্রুটি ধরা পড়ায় সেপ্টেম্বরে বিভাজন শুরুর পরিকল্পনা পিছিয়ে যায়। রুশ বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় সমস্যা মেটানোর পর ১১ অক্টোবর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিভাজন প্রক্রিয়ার অনুমোদন দেয়। ডলারের দাম বাড়ায় প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা। মোট ব্যয় দাঁড়াতে পারে ১ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকায়।
পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই কেন্দ্রে দুটি ইউনিট আছে। দুটি চালু হলে মোট উৎপাদন ক্ষমতা হবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। দেশের বিদ্যুৎ খাত এত দিন মূলত গ্যাস, কয়লা ও আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভর করেছে। তাই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে জ্বালানির উৎসে নতুন বৈচিত্র্য আসবে। তবে বাণিজ্যিক উৎপাদনের আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থার আরও ধাপ পেরোতে হবে। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ছাড়া কোনো ধাপ এগোয় না। প্রতিটি ধাপের ফল পর্যালোচনা করেই পরের ধাপের অনুমতি মেলে। তাই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরের কয়েক মাস সতর্ক পরীক্ষা আর নিরাপত্তা যাচাইয়ের সময়।












