একসময় ঢাকার বিপণিবিতানগুলো ছিল মধ্যবিত্তের কেনাকাটা ও অবসর কাটানোর অন্যতম জায়গা। ঈদ বা উৎসবের কেনাকাটা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন প্রয়োজন—সবকিছুর জন্যই এসব মার্কেটে ছিল ক্রেতাদের ভিড়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে সেই চিত্র। অনেক বিপণিবিতানে ক্রেতার আনাগোনা কমেছে, বিক্রি নেমেছে, কোথাও দোকান বন্ধ হচ্ছে। এতে শুধু ব্যবসার আয় কমছে না, ঝুঁকিতে পড়ছে মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের সঞ্চয় ও বিনিয়োগ।
ঢাকার ইস্টার্ন প্লাজা, রাপা প্লাজা, সেজান পয়েন্ট, হোসাফ টাওয়ার, ফরচুন শপিং মল, টুইন টাওয়ার, সুবাস্তু শপিং কমপ্লেক্স, রাজধানী সুপার মার্কেট, পলওয়েল কারনেশন ও ঝমঝম টাওয়ারসহ বিভিন্ন বিপণিবিতানে ব্যবসা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি এক নয়। কোথাও ক্রেতাসংকট, কোথাও দোকান ছেড়ে যাওয়ার প্রবণতা, আবার কোথাও মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে সব মিলিয়ে অনেক ব্যবসায়ীর সামনে টিকে থাকার প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির বন্ধ হয়ে যাওয়া
এই সংকটের বড় উদাহরণ কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি। রাজধানীর কাকরাইলে অবস্থিত বিপণিবিতানটি ১ অক্টোবর থেকে বন্ধ হয়ে গেছে। ১৯৯৮ সালে চালু হওয়া এই মার্কেটে মোট দোকান ছিল ১৯৮টি। বন্ধ হওয়ার আগে চালু ছিল মাত্র ২৫টি। দোকানমালিকেরা যৌথভাবে মার্কেট বন্ধের সিদ্ধান্ত নেন। ভবন বা মালিকানার অংশ বিক্রির বিষয়েও তাঁদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এক দশকের বেশি সময় ধরে সেখানে বিক্রি কমছিল। মগবাজার-মালিবাগ উড়ালসড়ক নির্মাণের সময় দীর্ঘদিনের যানজট ও চলাচলের অসুবিধায় ক্রেতা কমে যায়। পরে অনেক ব্যবসায়ী সাময়িকভাবে দোকান সরিয়ে নিলেও আর ফেরেননি। করোনাকালেও শতাধিক দোকান বন্ধ হয়ে যায়। কিছু দোকানে নিম্নমানের প্রসাধনী বিক্রির অভিযোগ মার্কেটটির সুনামেও প্রভাব ফেলেছিল। এখন সেখানে হাসপাতাল, ব্যাংক বা করপোরেট প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য জায়গা বিক্রির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
ক্রেতার হাতে টাকা কম, চাপে ব্যবসা
বিপণিবিতানের মন্দার পেছনে ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়াও বড় কারণ। মূল্যস্ফীতির কারণে খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে পরিবারের ব্যয় বেড়েছে। ফলে পোশাক, প্রসাধনী ও অন্যান্য পণ্যে খরচ কমাচ্ছেন অনেকে।
ঢাকা চেম্বারের একটি জরিপে ৭৬২টি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দুর্বল চাহিদা, মূল্যস্ফীতি এবং পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির চাপ উঠে এসেছে। খুচরা ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোও এর প্রভাবের বাইরে নয়। বিক্রি কমলেও দোকানভাড়া, কর্মীদের বেতন, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খরচ নিয়মিত বহন করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ আয় বৃদ্ধির তুলনায় পণ্যমূল্য বেড়েছে বেশি। এতে সাধারণ মানুষের হাতে কেনাকাটার জন্য বাড়তি অর্থ থাকছে কম।
বদলে যাচ্ছে কেনাকাটার ধরন
ক্রেতাসংকটের আরেকটি কারণ কেনাকাটার অভ্যাসের পরিবর্তন। নতুন বিপণিবিতান, ব্র্যান্ডের নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্র এবং অনলাইন কেনাকাটার বিস্তারে পুরোনো মার্কেটগুলোকে বাড়তি প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হচ্ছে। অনেক ক্রেতা এখন ঘরে বসেই পণ্য বেছে নিচ্ছেন। আবার নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের পণ্য কিনতে সরাসরি সেই প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়কেন্দ্রে যাচ্ছেন।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সন্ধ্যায় দোকান বন্ধের সময়সীমা। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য রাত ৮টার মধ্যে দোকান ও বিপণিবিতান বন্ধ রাখার নির্দেশনার পর কিছু পোশাক ও জীবনধারাভিত্তিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিক্রি ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছে। অথচ দোকানভাড়া, কর্মীদের বেতনসহ স্থায়ী ব্যয় কমেনি।
বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে আরও বিপণিবিতান?
দোকানমালিকদের সংগঠনের নেতাদের ভাষ্য, প্রায় দুই থেকে আড়াই বছর ধরে বিপণিবিতানের ব্যবসায় মন্দা চলছে। কোনো কোনো দোকানে কয়েক দিনেও বিক্রি হচ্ছে না। অনেক ব্যবসায়ী এখন পণ্য বিক্রির আয় থেকে নতুন পণ্য কেনার বদলে কর্মীদের বেতন ও অন্যান্য খরচ মেটাচ্ছেন। ফলে ব্যবসার মূলধন ক্রমেই কমছে।
এ অবস্থায় ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের পক্ষে দীর্ঘদিন লোকসান সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠছে। বিক্রি না বাড়লে দোকান বন্ধ করা, ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া কিংবা মালিকানার অংশ বিক্রি করে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন অনেকে। কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির ঘটনা সেই আশঙ্কাকে আরও দৃশ্যমান করেছে।
বিপণিবিতান বন্ধ হলে ক্ষতিগ্রস্ত হন শুধু দোকানমালিকেরা নন। এর সঙ্গে যুক্ত কর্মচারী, সরবরাহকারী, পরিবহনকর্মী এবং তাঁদের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর আয়ও সংকুচিত হয়। তাই ঢাকার বিপণিবিতানগুলোর সংকট কেবল কেনাকাটার জায়গা হারানোর বিষয় নয়; এটি শহরের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা এবং মধ্যবিত্তের জীবিকার ওপরও চাপের ইঙ্গিত।












