কফি পানের অভ্যাস কমাতে চাইলে বিকল্প হিসেবে ম্যাচা চা বেছে নেওয়া যেতে পারে। উজ্জ্বল সবুজ রঙের এই চা এখন বিশ্বজুড়ে বেশ জনপ্রিয়। স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের কাছে ম্যাচা শুধু পানীয় নয়, সুস্থ জীবনযাপনের অংশ হয়ে উঠেছে। তবে প্রশ্ন হলো, ম্যাচা চায়ের স্বাস্থ্য উপকারিতা নিয়ে প্রচলিত দাবিগুলোর কতটা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে?
কফি পানের অভ্যাস কমাতে কফির বদলে ম্যাচা পান করে দেখেছেন এক সাংবাদিক। পাশাপাশি তিনি ম্যাচার স্বাস্থ্যগত উপকারিতা নিয়ে প্রচলিত ধারণাগুলোও খতিয়ে দেখেছেন।
ম্যাচা আসলে কী?
ম্যাচা একধরনের গুঁড়া করা সবুজ চা। সাধারণ সবুজ চায়ের মতো শুধু পাতার নির্যাস পান করা হয় না। ম্যাচায় পুরো চা-পাতা সূক্ষ্ম গুঁড়া করে পানির সঙ্গে মিশিয়ে পান করা হয়। ফলে চা-পাতার বিভিন্ন উপাদান সরাসরি শরীরে প্রবেশ করে।
ম্যাচা তৈরির চা-গাছ সাধারণত সংগ্রহের আগে কয়েক সপ্তাহ ছায়ায় রাখা হয়। এতে পাতায় ক্লোরোফিল ও কিছু অ্যামিনো অ্যাসিডের পরিমাণ বাড়ে। এ কারণেই ম্যাচার রং উজ্জ্বল সবুজ হয় এবং স্বাদেও বিশেষ বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়।
ক্যাফেইন আছে, তবে কফির মতো নয়
কফি ও ম্যাচা, দুটিতেই ক্যাফেইন রয়েছে। এই উপাদান মস্তিষ্কের সতর্কতা বাড়াতে এবং সাময়িকভাবে ক্লান্তি কমাতে সাহায্য করে। তবে দুই পানীয়তে ক্যাফেইনের পরিমাণ এক নয়।
এক কাপ ম্যাচায় সাধারণত প্রায় ৩০ থেকে ৭০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন থাকতে পারে। এক কাপ কফিতে থাকতে পারে প্রায় ৮০ থেকে ১০০ মিলিগ্রাম বা তারও বেশি। পানীয় তৈরির পদ্ধতি, গুঁড়ার পরিমাণ এবং পরিবেশনের আকারের ওপর এই পরিমাণ নির্ভর করে।
তাই যাঁরা কফির ক্যাফেইন কমাতে চান, তাঁদের জন্য ম্যাচা একটি বিকল্প হতে পারে। তবে বেশি পরিমাণে ম্যাচা পান করলেও ক্যাফেইন গ্রহণ বেড়ে যেতে পারে।
অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের সম্ভাব্য উপকারিতা
ম্যাচা চায়ের স্বাস্থ্য উপকারিতা নিয়ে আলোচনায় ক্যাটেচিনের নাম সবার আগে আসে। এটি একধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা শরীরের কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
ম্যাচায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য একটি ক্যাটেচিন হলো ইজিসিজি। বিভিন্ন গবেষণায় এর সম্ভাব্য প্রদাহনাশক ও বিপাকীয় উপকারিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তবে পরীক্ষাগার ও প্রাণীর ওপর পরিচালিত গবেষণার ফল মানুষের শরীরেও একইভাবে কার্যকর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ম্যাচা পান করলেই হৃদ্রোগ, ক্যানসার বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি কমে যাবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো নেই।
মনোযোগ ও মানসিক সতর্কতায় ভূমিকা
ম্যাচায় ক্যাফেইনের পাশাপাশি এল-থিয়ানিন নামের একটি অ্যামিনো অ্যাসিড রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি মস্তিষ্কের কার্যক্রম ও মানসিক সতর্কতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
ক্যাফেইন ও এল-থিয়ানিনের সম্মিলিত প্রভাব মনোযোগ ধরে রাখতে এবং কিছু ক্ষেত্রে মানসিক কর্মক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। এ কারণে অনেকে ম্যাচা পান করার পর কফির চেয়ে ভিন্ন ধরনের সতেজতা অনুভব করেন। তবে এই অভিজ্ঞতা সবার ক্ষেত্রে একরকম নয়। ম্যাচা মানসিক চাপ দূর করে বা উদ্বেগ কমায়, এমন দাবির পক্ষেও আরও শক্তিশালী মানবভিত্তিক গবেষণা দরকার।
কফির পরিবর্তে ম্যাচা কতটা ভালো?
কফিরও বেশ কিছু সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত উপকারিতা রয়েছে। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় নিয়মিত কফি পানের সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, কিছু হৃদ্রোগ এবং নির্দিষ্ট কিছু রোগের কম ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এই সম্পর্ক থেকে প্রমাণ হয় না যে কফিই ঝুঁকি কমানোর কারণ।
অন্যদিকে ম্যাচা চায়ের স্বাস্থ্য উপকারিতা নিয়ে গবেষণার পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। ফলে কফির চেয়ে ম্যাচা বেশি স্বাস্থ্যকর, এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
কোন পানীয় ভালো, তা অনেকটাই নির্ভর করে ব্যক্তির ক্যাফেইন সহনশীলতা, স্বাস্থ্যের অবস্থা এবং পানীয় তৈরির পদ্ধতির ওপর। অতিরিক্ত চিনি বা মিষ্টি সিরাপ মিশিয়ে ম্যাচা পান করলে এর স্বাস্থ্যগত সুবিধাও অনেকটা কমে যেতে পারে।
কাদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন?
ম্যাচা প্রাকৃতিক পানীয় হলেও সবার জন্য সীমাহীনভাবে পান করার উপযোগী নয়। অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ করলে ঘুমের সমস্যা, বুক ধড়ফড়, অস্থিরতা বা উদ্বেগ বাড়তে পারে।
যাঁরা ক্যাফেইনের প্রতি সংবেদনশীল, ঘুমের সমস্যায় ভুগছেন বা চিকিৎসকের পরামর্শে ক্যাফেইন সীমিত রাখছেন, তাঁদের পরিমাণ নিয়ে সতর্ক থাকা দরকার। গর্ভাবস্থায়ও দৈনিক মোট ক্যাফেইন গ্রহণ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করা উচিত।
ম্যাচার সঙ্গে চা-পাতার নির্যাসের ঘন সম্পূরকের পার্থক্য রয়েছে। অতিরিক্ত মাত্রায় গ্রিন টি এক্সট্র্যাক্ট গ্রহণের সঙ্গে বিরল ক্ষেত্রে যকৃতের ক্ষতির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তাই ঘন নির্যাসকে সাধারণ ম্যাচা চায়ের সমতুল্য মনে করা ঠিক নয়।
শেষ পর্যন্ত কোনটি বেছে নেবেন?
কফি থেকে ম্যাচায় যাওয়া ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। যাঁরা কফির স্বাদ বা ক্যাফেইনের মাত্রা কমাতে চান, তাঁদের জন্য ম্যাচা ভালো বিকল্প হতে পারে। এতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও এল-থিয়ানিনের মতো উপাদানও রয়েছে।
ম্যাচা চায়ের স্বাস্থ্য উপকারিতা থাকতে পারে, তবে একে অলৌকিক স্বাস্থ্যপানীয় হিসেবে দেখার কারণ নেই। সুস্থ থাকতে একটি পানীয়ের ওপর নির্ভর না করে সুষম খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে মনোযোগ দেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।












