মানুষের চোখ কীভাবে সূক্ষ্ম বস্তুকে স্পষ্টভাবে দেখতে এবং বিভিন্ন রং চিনতে শেখে, তা নিয়ে দীর্ঘদিনের একটি বৈজ্ঞানিক ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে নতুন গবেষণা। যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ভিটামিন এ থেকে তৈরি একটি অণু চোখের রেটিনায় বিশেষ ধরনের আলোকসংবেদী কোষ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ প্রক্রিয়ায় থাইরয়েড হরমোনও সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস-এ। এতে দেখা গেছে, ভ্রূণের বিকাশের সময় প্রথমে নীল আলো শনাক্ত করতে সক্ষম কিছু কোষ পরে লাল ও সবুজ আলো শনাক্তকারী কোষে রূপান্তরিত হতে পারে। প্রায় তিন দশক ধরে প্রচলিত একটি ব্যাখ্যার সঙ্গে এই পর্যবেক্ষণের পার্থক্য রয়েছে।
গবেষণাটির নেতৃত্ব দেন জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক রবার্ট জে. জনস্টন জুনিয়র। তাঁর মতে, রেটিনার কেন্দ্রীয় অংশ কীভাবে গড়ে ওঠে, তা বোঝার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। চোখের এই অংশটি ম্যাকুলার ডিজেনারেশনে আক্রান্ত হলে দৃষ্টিশক্তির গুরুতর ক্ষতি হতে পারে।
দৃষ্টিশক্তির কেন্দ্রে যে বিশেষ কোষ
গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল রেটিনার কেন্দ্রের ক্ষুদ্র একটি অঞ্চল ফোভিওলা। বই পড়া, মানুষের মুখ চেনা এবং সূক্ষ্ম বিবরণ দেখার জন্য এই অংশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রেটিনার আয়তনের তুলনায় ফোভিওলা খুব ছোট হলেও মানুষের মোট দৃশ্যগত উপলব্ধির প্রায় অর্ধেকের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে বলে গবেষকদের ধারণা।
ফোভিওলায় থাকে বিশেষ ধরনের আলোকসংবেদী কোষ, যেগুলোকে কোন কোষ বলা হয়। মানুষের চোখে এ ধরনের কোষের তিনটি প্রধান ধরন রয়েছে। এগুলো মূলত নীল, সবুজ ও লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যে সাড়া দেয়। তবে ফোভিওলার বিশেষত্ব হলো, এখানে লাল ও সবুজ আলো শনাক্তকারী কোন কোষ থাকলেও নীল আলো শনাক্তকারী কোষ থাকে না।
এই বৈশিষ্ট্য কীভাবে তৈরি হয়, তা বোঝার জন্য গবেষকেরা পরীক্ষাগারে মানুষের রেটিনার ক্ষুদ্র প্রতিরূপ বা অর্গানয়েড তৈরি করেন। কয়েক মাস ধরে এসব টিস্যুর বিকাশ পর্যবেক্ষণ করে তাঁরা কোষের পরিবর্তনের ধাপগুলো শনাক্ত করেন।
ভিটামিন এ ও থাইরয়েড হরমোনের ভূমিকা
গবেষণায় দেখা যায়, ভ্রূণের বিকাশের ১০ থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে ফোভিওলায় অল্পসংখ্যক নীল আলো শনাক্তকারী কোষ তৈরি হয়। ১৪তম সপ্তাহ নাগাদ এসব কোষের কিছু লাল ও সবুজ আলো শনাক্তকারী কোষে রূপান্তরিত হয়েছে বলে পর্যবেক্ষণে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
এ প্রক্রিয়ায় দুটি উপাদানের ভূমিকা চিহ্নিত করেছেন বিজ্ঞানীরা। ভিটামিন এ থেকে তৈরি রেটিনয়িক অ্যাসিড কোষের বিকাশ নিয়ন্ত্রণ করে এবং রেটিনার কেন্দ্রীয় অংশে নীল আলো শনাক্তকারী কোষের গঠন সীমিত রাখতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, থাইরয়েড হরমোন অবশিষ্ট নীল আলো শনাক্তকারী কোষগুলোর কিছু অংশকে লাল ও সবুজ আলো শনাক্তকারী কোষে রূপান্তরে ভূমিকা রাখে।
আগের একটি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিকাশমান ফোভিওলায় তৈরি নীল আলো শনাক্তকারী কোষগুলো নিজেদের পরিচয় অক্ষুণ্ন রেখে রেটিনার অন্য অংশে সরে যায়। নতুন গবেষণা বলছে, অন্তত কিছু কোষ স্থান পরিবর্তনের বদলে নিজেদের বৈশিষ্ট্য বদলে ফেলতে পারে। তবে কোষের স্থানান্তরের সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি গবেষকেরা।
তাঁরা স্পষ্ট করেছেন, এই আবিষ্কার ভ্রূণের বিকাশে ভিটামিন এ-সংক্রান্ত জৈবিক সংকেতের ভূমিকা নিয়ে। এর অর্থ এই নয় যে, প্রাপ্তবয়স্কদের ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে দৃষ্টিশক্তি উন্নত হবে।
ভবিষ্যতে দৃষ্টিশক্তি ফেরানোর সম্ভাবনা
এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে ম্যাকুলার ডিজেনারেশনের মতো রোগের চিকিৎসা গবেষণায় কাজে লাগতে পারে। এ রোগে রেটিনার কেন্দ্রীয় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফলে পড়া, গাড়ি চালানো কিংবা মানুষের মুখ চেনার মতো কাজে সমস্যা দেখা দিতে পারে। বর্তমানে কিছু চিকিৎসা রোগের অগ্রগতি ধীর করতে পারলেও এর নিরাময় নেই।
গবেষক দলটি এমন রেটিনাল অর্গানয়েড তৈরির চেষ্টা করছে, যেগুলো মানুষের চোখের গঠন ও কার্যকারিতার আরও কাছাকাছি হবে। দীর্ঘমেয়াদে এসব টিস্যু থেকে বিশেষায়িত আলোকসংবেদী কোষ তৈরি করে ক্ষতিগ্রস্ত রেটিনায় প্রতিস্থাপনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গবেষণার সহলেখক ও জনস্টনের গবেষণাগারের সাবেক পিএইচডি শিক্ষার্থী কাতারজিনা হাসি মনে করেন, এ প্রযুক্তি ভবিষ্যতে কোষ প্রতিস্থাপনভিত্তিক চিকিৎসার পথ তৈরি করতে পারে। তবে সুস্থ কোষ তৈরি, সেগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত রেটিনায় কার্যকরভাবে যুক্ত করা এবং দৃষ্টিশক্তি ফেরানোর সক্ষমতা যাচাই করতে আরও বিস্তর গবেষণা প্রয়োজন। নিরাপত্তা ও কার্যকারিতার পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ পদ্ধতি মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহারের উপযোগী বলে বিবেচনা করা যাবে না।
ভিটামিন এ, থাইরয়েড হরমোন এবং রেটিনার কোষের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে এই গবেষণা মানুষের চোখের বিকাশ সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা আরও স্পষ্ট করতে পারে। একই সঙ্গে দৃষ্টিশক্তি হারানোর চিকিৎসায় নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবনের গবেষণাকেও এগিয়ে নিতে পারে।












