জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাড়তে থাকা তাপপ্রবাহ শুধু জনজীবন ও পরিবেশের জন্য নয়, গর্ভবতী নারী ও অনাগত সন্তানের জন্যও বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাভাবিকের তুলনায় তাপমাত্রা বাড়লেই গর্ভপাত, মৃত সন্তান প্রসব, উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভফুলের জটিলতা এবং সময়ের আগেই সন্তান জন্ম দেওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। এমনকি যেসব অঞ্চলে সাধারণত তীব্র গরম পড়ে না, সেখানকার নারীরাও এই ঝুঁকির বাইরে নন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের দীর্ঘ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বিভিন্ন দেশের প্রায় ২০০টি বৈজ্ঞানিক গবেষণা পর্যালোচনা এবং মেক্সিকোর ৮০ লাখের বেশি জন্মের তথ্য বিশ্লেষণ করে তাপমাত্রা ও গর্ভাবস্থার জটিলতার মধ্যে শক্তিশালী সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভবতী নারীর বসবাসের এলাকার গড় তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে পরবর্তী সময়ে অপরিণত সন্তান জন্মের আশঙ্কা ৪ শতাংশ বেড়ে যায়। আর তাপপ্রবাহ শেষ হওয়ার পরের সপ্তাহে এই ঝুঁকি বেড়ে দাঁড়ায় ২৬ শতাংশে।
শুধু প্রচণ্ড গরম নয়, স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রাও বিপজ্জনক
গবেষকদের মতে, গর্ভাবস্থায় তাপের ঝুঁকি নির্ধারণে শুধু কোনো এলাকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বিবেচনা করলে চলবে না। একজন নারী যে আবহাওয়ায় অভ্যস্ত, তার তুলনায় তাপমাত্রা কতটা বেড়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
একটি বড় গবেষণায় ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসকে এমন একটি তাপমাত্রা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার পর গর্ভাবস্থার জটিলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে শুরু করে। তবে ১৪টি দরিদ্র দেশের ওপর পরিচালিত আরেক গবেষণায় আরও কম তাপমাত্রাতেও অপরিণত সন্তান জন্ম ও মৃত সন্তান প্রসবের ঝুঁকির প্রমাণ পাওয়া গেছে।
চীনের ২০ লাখ নারীর ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় অস্বাভাবিক গরমের সঙ্গে প্রি-এক্লাম্পসিয়ার ঝুঁকি ১৩ শতাংশ বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এই জটিলতায় গর্ভবতী নারীর উচ্চ রক্তচাপ তৈরি হতে পারে এবং গুরুতর অবস্থায় কিডনি বিকল, হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি দেখা দেয়। বিশ্বে মাতৃমৃত্যুর সাত ভাগের এক ভাগের বেশি মৃত্যুর সঙ্গে প্রি-এক্লাম্পসিয়া জড়িত।
মেক্সিকোতে বছরে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি অপরিণত জন্ম
রয়টার্স ২০০৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মেক্সিকোর ৮০ লাখের বেশি জন্মের তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। এতে দেখা গেছে, সন্তান জন্মের আগের চার সপ্তাহে তাপপ্রবাহ বা অতিরিক্ত গরমের পরিস্থিতি তৈরি হলে অপরিণত সন্তান জন্মের হার প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে যায়। এর অর্থ, শুধু গরমের মৌসুমেই দেশটিতে বছরে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি শিশু সময়ের আগে জন্ম নিতে পারে।
তাপের সংস্পর্শ যত বাড়ে, ঝুঁকিও তত বাড়ে। তুলনামূলক কম তাপের ক্ষেত্রে অপরিণত জন্মের হার প্রায় ৪ শতাংশ বাড়লেও সর্বোচ্চ তাপের সংস্পর্শে তা ১৮ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়।
মেক্সিকোর রাজধানী মেক্সিকো সিটিতে ২০২৪ সালের বসন্তে তাপমাত্রা রেকর্ড ৩৪ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল। ওই সময় হাসপাতালগুলোতে গর্ভবতী নারীদের উচ্চ রক্তচাপ, প্রি-এক্লাম্পসিয়া এবং গর্ভফুল বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো জটিলতা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি চিকিৎসকেরা লক্ষ করেন।
দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ নারীদের বিপদ বেশি
তাপপ্রবাহের প্রভাব সব নারীর ক্ষেত্রে সমান নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, দরিদ্র নারী, অপেক্ষাকৃত বেশি বয়সী গর্ভবতী নারী, ধূমপায়ী, নিয়মিত ওষুধ গ্রহণকারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত নারীদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। যমজ সন্তান ধারণ করা নারীরাও বিশেষভাবে ঝুঁকিতে থাকেন।
দক্ষিণ আফ্রিকার গবেষক দর্শনিকা লাখুর নিজের গর্ভাবস্থার অভিজ্ঞতাও এই ঝুঁকির চিত্র তুলে ধরেছে। যমজ সন্তান ধারণের সময় জোহানেসবার্গে তাঁর গর্ভাবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে ৭৪ দিন তাপপ্রবাহ ছিল। শেষ মাসে অস্বাভাবিক গরমের মধ্যে তাঁর রক্তচাপ বেড়ে যায় এবং প্রি-এক্লাম্পসিয়ার লক্ষণ দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ের আগেই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দিতে হয়। নবজাতকদের শ্বাস নিতে সহায়তা দিতে নিবিড় পরিচর্যায় রাখতে হয়েছিল।
তবে কোনো নির্দিষ্ট গর্ভাবস্থার জটিলতার একমাত্র কারণ তাপমাত্রা কি না, তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন।
সুরক্ষায় প্রয়োজন স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মপরিবেশে পরিবর্তন
তাপ কীভাবে গর্ভাবস্থার ক্ষতি করে, তা নিয়ে গবেষণা এখনো চলছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, অতিরিক্ত গরমে মায়ের শরীর ঠান্ডা রাখতে রক্তপ্রবাহের পরিবর্তন হতে পারে, যার প্রভাব পড়ে গর্ভফুল ও ভ্রূণের ওপর।
গবেষকেরা গর্ভবতী নারীদের পর্যাপ্ত পানি পান, ঢিলেঢালা পোশাক পরা এবং অতিরিক্ত গরমে বাইরে থাকা কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন। চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষার পাশাপাশি নারীরা কতটা তাপের মধ্যে থাকছেন, সেটিও জানতে চান তাঁরা।
এ ছাড়া গর্ভাবস্থায় মাতৃত্বকালীন ছুটির সুযোগ, বিনা মূল্যে পানির ব্যবস্থা এবং মোবাইল শীতলীকরণ কেন্দ্র চালুর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। দক্ষিণ আফ্রিকায় মাত্র ৭ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবারের শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র রয়েছে। ফলে দরিদ্র নারীদের জন্য ব্যক্তিগতভাবে গরম থেকে সুরক্ষা নেওয়াও কঠিন।
গবেষকদের মতে, তাপপ্রবাহের বিস্তার বাড়তে থাকায় গর্ভবতী নারীদের সুরক্ষাকে এখন মাতৃস্বাস্থ্যসেবার নিয়মিত অংশ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।












