প্রায় তিন দশক পর প্রথমবারের মতো শিশুখাদ্য বা শিশুদের জন্য তৈরি গুঁড়া দুধের পুষ্টিমানসংক্রান্ত নিয়ম হালনাগাদ করার উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ)। নতুন প্রস্তাবে শিশুখাদ্যে আয়োডিন ও ভিটামিন ডি-এর ন্যূনতম পরিমাণ বাড়ানো এবং ম্যাঙ্গানিজ ও ভিটামিন এ-এর পরিমাণ কিছুটা কমানোর কথা বলা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার এফডিএর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক কাইল ডায়ামান্টাস এ তথ্য জানান। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ‘অপারেশন স্টর্ক স্পিড’ উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ২০২৫ সালের মার্চে উদ্যোগটি ঘোষণা করা হয়েছিল।
প্রথম পর্যায়ে শিশুখাদ্যে বাধ্যতামূলকভাবে থাকা ৩০টি পুষ্টি উপাদানের মধ্যে চারটির পরিমাণ পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে এফডিএ। এগুলো হলো আয়োডিন, ম্যাঙ্গানিজ, ভিটামিন এ ও ভিটামিন ডি।
আয়োডিনের পরিমাণ তিন গুণ করার প্রস্তাব
শিশুর থাইরয়েড হরমোন তৈরি এবং মস্তিষ্কের বিকাশে আয়োডিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বর্তমানে প্রতি ১০০ ক্যালরির শিশুখাদ্যে ন্যূনতম ৫ মাইক্রোগ্রাম আয়োডিন থাকার নিয়ম রয়েছে। নতুন প্রস্তাবে তা বাড়িয়ে ১৫ মাইক্রোগ্রাম করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে ৫০ মাইক্রোগ্রাম।
অন্যদিকে, ম্যাঙ্গানিজের ন্যূনতম পরিমাণ কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি। এই খনিজ উপাদান শরীরের বিভিন্ন এনজাইমের কার্যক্রম এবং হাড়ের বিকাশে সহায়তা করে। বর্তমানে প্রতি ১০০ ক্যালরিতে কমপক্ষে ৫ মাইক্রোগ্রাম ম্যাঙ্গানিজ থাকার নিয়ম থাকলেও নতুন প্রস্তাবে তা কমিয়ে ১ মাইক্রোগ্রাম করার কথা বলা হয়েছে। সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে ৫০ মাইক্রোগ্রাম।
ভিটামিন এ-এর ক্ষেত্রেও ন্যূনতম পরিমাণ কিছুটা কমানোর প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে প্রতি ১০০ ক্যালরির শিশুখাদ্যে ২৫০ আন্তর্জাতিক একক ভিটামিন এ থাকার নিয়ম রয়েছে। নতুন প্রস্তাবে তা কমিয়ে ২৩৩ আন্তর্জাতিক একক করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ভিটামিন এ পরিমাপের একক আন্তর্জাতিক একক (আইইউ) থেকে পরিবর্তন করে রেটিনল অ্যাক্টিভিটি ইকুইভ্যালেন্টস বা আরএই (RAE) ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। দৃষ্টিশক্তি, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং কোষের বৃদ্ধির জন্য ভিটামিন এ গুরুত্বপূর্ণ।
ভিটামিন ডি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব
প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ভিটামিন ডি-এর পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়টিকে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। শিশুদের হাড় ও দাঁতের বিকাশে ভিটামিন ডি প্রয়োজন। পাশাপাশি এটি রিকেটস বা হাড় নরম হয়ে যাওয়ার রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে।
বর্তমানে প্রতি ১০০ ক্যালরির শিশুখাদ্যে ন্যূনতম ১ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন ডি থাকার নিয়ম রয়েছে। নতুন প্রস্তাবে তা দ্বিগুণ করে ২ মাইক্রোগ্রাম করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ অনুমোদিত পরিমাণ ৩ মাইক্রোগ্রাম নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।
টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেল মেডিকেল স্কুলের অধ্যাপক ও শিশু বিশেষজ্ঞ স্টিভেন আব্রামস বলেছেন, শিশুখাদ্যের পুষ্টিমান হালনাগাদের উদ্যোগটি অনেক আগেই নেওয়া প্রয়োজন ছিল। প্রস্তাবের প্রথম পর্যায়ের কাজকে তিনি যথাযথ ও সুপরিকল্পিত বলে উল্লেখ করেছেন।
আব্রামসের মতে, নতুন প্রস্তাবের মধ্যে ভিটামিন ডি বাড়ানোর বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। বর্তমানে শিশুখাদ্যে ভিটামিন ডি-এর পরিমাণ শিশুদের জন্য সুপারিশ করা মাত্রার তুলনায় কিছুটা কম। এ কারণে অনেক অভিভাবক শিশুর খাবারের পাশাপাশি অতিরিক্ত ভিটামিন ডি দিয়ে থাকেন।
এফডিএর প্রস্তাবিত নিয়ম কার্যকর হলে দেরিতে দেখা দেওয়া হাইপোক্যালসেমিয়া বা রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা কমে যাওয়ার সমস্যাসংশ্লিষ্ট চিকিৎসা ব্যয় বছরে প্রায় ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার পর্যন্ত কমতে পারে বলে সংস্থাটির প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে। ভিটামিন ডি খাবার থেকে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস শোষণে শরীরকে সহায়তা করে।
নিয়ম পরিবর্তনে আরও কয়েক বছর লাগতে পারে
তবে প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো দ্রুত বাজারের শিশুখাদ্যে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করেন আব্রামস। তাঁর মতে, এফডিএ একসঙ্গে সব পুষ্টি উপাদান পর্যালোচনা না করে ধাপে ধাপে কাজ করছে। প্রথম পর্যায়ে চারটি উপাদানের পর আগামী এক বছর বা তার কিছু সময়ের মধ্যে আরও ১২টি উপাদান পর্যালোচনা করা হবে। এরপর বাকি ১০টি উপাদান নিয়ে কাজ হবে।
ফলে নতুন নিয়ম অনুযায়ী তৈরি শিশুখাদ্য বাজারে আসতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। অর্থাৎ, এ মুহূর্তে অভিভাবকেরা শিশুখাদ্যের কৌটায় উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন দেখতে পাবেন না।
এফডিএর নিজস্ব বিজ্ঞানীদের মাধ্যমে পুষ্টি উপাদানগুলোর পর্যালোচনা করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, প্রস্তাবগুলো পরবর্তী সময়ে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনার জন্য জমা দেওয়া হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের সচিব রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র বলেছেন, শিশুকে খাওয়ানোর প্রতিটি বোতল নিয়ে অভিভাবকদের নিশ্চিন্ত থাকার অধিকার রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের ‘অপারেশন স্টর্ক স্পিড’ এবং ‘মেক আমেরিকা হেলদি এগেইন’ কর্মসূচির আওতায় শিশুখাদ্যের পুষ্টিমান আরও কঠোর করা, দূষিত রাসায়নিকের উপস্থিতি পরীক্ষা এবং পরীক্ষার ফলাফল সরাসরি অভিভাবকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
আরও কয়েকটি পুষ্টি উপাদান বাধ্যতামূলক করার চিন্তা
শিশুখাদ্যে বর্তমানে বাধ্যতামূলক নয়, তবে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত যেসব পুষ্টি উপাদান যুক্ত করে, সেগুলো নিয়েও জনমত জানতে চেয়েছে এফডিএ।
এগুলোর মধ্যে রয়েছে এআরএ (ARA) ও ডিএইচএ (DHA)-এর মতো দীর্ঘ শৃঙ্খলযুক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড এবং এল-কার্নিটিন। শরীরের চর্বি ভেঙে তা বিভিন্ন টিস্যুতে ব্যবহারের উপযোগী করতে এল-কার্নিটিন সহায়তা করে।
এফডিএর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক কাইল ডায়ামান্টাস জানিয়েছেন, এসব উপাদান শিশুর স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশ ও স্বাস্থ্যে ভূমিকা রাখতে পারে—এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে। তাই এগুলো যুক্তরাষ্ট্রের শিশুখাদ্যে বাধ্যতামূলক করা উচিত কি না, সে বিষয়ে বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের মতামত নিতে চায় সংস্থাটি।
এদিকে শিশুখাদ্যের বাকি পুষ্টি উপাদানগুলোর পর্যালোচনাও চলমান রয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে বিদ্যমান সব বাধ্যতামূলক পুষ্টি উপাদানের পাশাপাশি নতুন কোনো উপাদান যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা এবং শিশুখাদ্যে ব্যবহৃত শর্করার উৎস নিয়েও মূল্যায়ন করা হবে।
শিশুখাদ্যে রাসায়নিক দূষণ রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের চলমান পরীক্ষার ফলাফলও প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। কাইল ডায়ামান্টাস জানিয়েছেন, সর্বশেষ পরীক্ষার ফলাফলও এখন পর্যন্ত আশ্বস্ত হওয়ার মতো।












