ডিফেন্স অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্টস এজেন্সি (ডারপা) যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা। সংস্থাটি সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একটি নতুন সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিল। এর লক্ষ্য ছিল এমন একটি পদ্ধতি তৈরি করা, যাতে ইবোলার মতো প্রাণঘাতী রোগ ঠেকাতে মানুষের শরীরকেই প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি তৈরির কারখানা হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
এটি ২০১৫ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের তথ্য। ওই প্রতিবেদনে মূলত গবেষণার একটি পরিকল্পনা ও সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল। ইবোলাসহ কোনো সংক্রামক রোগের প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসাপদ্ধতি হিসেবে একে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
এই সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ প্রযুক্তির মূল ধারণা হলো, কোনো রোগ থেকে সুস্থ হওয়া মানুষের শরীর থেকে কার্যকর অ্যান্টিবডি সংগ্রহ করা। এরপর ওই অ্যান্টিবডি তৈরির জিনগত নির্দেশনা আরএনএর মাধ্যমে সংরক্ষণ করে অন্য মানুষের শরীরে প্রবেশ করানো হবে। তখন শরীরের কোষগুলো সেই নির্দেশনা অনুসরণ করে নিজেরাই অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারবে।
প্রচলিত টিকায় শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে কোনো নির্দিষ্ট জীবাণু চিনতে ও তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ডারপার প্রস্তাবিত পদ্ধতিতে শরীরকে সরাসরি কার্যকর অ্যান্টিবডি তৈরির নির্দেশনা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। অর্থাৎ শরীরকে অ্যান্টিবডি তৈরির তথ্য সরবরাহ করাই এই প্রযুক্তির প্রধান বৈশিষ্ট্য।
কীভাবে কাজ করবে এই প্রযুক্তি?
প্রথম ধাপে সুস্থ হয়ে ওঠা ব্যক্তির শরীর থেকে কার্যকর অ্যান্টিবডি শনাক্ত ও সংগ্রহ করা হবে। এসব অ্যান্টিবডি কীভাবে নির্দিষ্ট ভাইরাস বা জীবাণুকে প্রতিহত করে, তা বিশ্লেষণ করে সেগুলো তৈরির জিনগত নির্দেশনা বের করা হবে।
পরের ধাপে সেই নির্দেশনা আরএনএর মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করানো হবে। কোষগুলো নির্দেশনা অনুযায়ী অ্যান্টিবডি তৈরি শুরু করবে। ফলে বাইরে থেকে প্রস্তুত অ্যান্টিবডি সরবরাহের বদলে শরীরের ভেতরেই তা উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো গতি। নতুন কোনো সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়লে আক্রান্তদের শরীর থেকে কার্যকর অ্যান্টিবডি শনাক্ত করে তুলনামূলক দ্রুত তার জিনগত নির্দেশনা তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। ফলে নতুন টিকা বা চিকিৎসা উদ্ভাবনের দীর্ঘ অপেক্ষা কমতে পারে।
ইবোলার মতো প্রাণঘাতী রোগে সম্ভাবনা
ইবোলার মতো মারাত্মক রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে দ্রুত কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা তৈরি করা জরুরি। বিশেষ করে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের সুরক্ষায় দ্রুত অ্যান্টিবডি সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ডারপার পরিকল্পনা অনুযায়ী এই সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ প্রযুক্তি শুধু ইবোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা ছিল না। বিভিন্ন রোগের বিরুদ্ধে কার্যকর অ্যান্টিবডির নির্দেশনা ব্যবহার করে একই ধরনের ব্যবস্থা গড়ে তোলার সম্ভাবনাও ছিল।
উৎপাদনব্যবস্থাও একটি দিক। প্রচলিত অ্যান্টিবডি চিকিৎসায় অনেক ক্ষেত্রে বিশেষায়িত উৎপাদন, সংরক্ষণ ও সরবরাহব্যবস্থা লাগে। শরীরের ভেতরেই অ্যান্টিবডি তৈরি কার্যকর করা গেলে চিকিৎসার ব্যয় ও উৎপাদনের জটিলতা কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে চ্যালেঞ্জ
ধারণাটি যতটা আশাব্যঞ্জক, বাস্তবে প্রয়োগ করা ততটাই জটিল। শরীরে প্রবেশ করানো আরএনএ কতটা নিরাপদ থাকবে, কোষগুলো কত দিন অ্যান্টিবডি তৈরি করবে এবং প্রয়োজনীয় মাত্রায় উৎপাদন নিশ্চিত করা যাবে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
প্রতিটি রোগের জন্য কার্যকর অ্যান্টিবডি শনাক্ত করা, শরীরে তার কার্যকারিতা ধরে রাখা এবং সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করাও বড় চ্যালেঞ্জ। কোনো প্রযুক্তির তাত্ত্বিক সম্ভাবনা থাকলেই তা মানুষের চিকিৎসায় নিরাপদ ও কার্যকর প্রমাণিত হয় না। এ জন্য বিস্তৃত গবেষণা, পরীক্ষাগারভিত্তিক মূল্যায়ন এবং ধাপে ধাপে মানবদেহে পরীক্ষা দরকার।
ডারপার এই উদ্যোগ সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি সম্ভাবনাময় দিক তুলে ধরে। তবে ২০১৫ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি মূলত গবেষণার পরিকল্পনা ও সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিল। এই সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ প্রযুক্তিকে বর্তমানে ইবোলাসহ কোনো রোগের প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসাপদ্ধতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।












