ঢাকা, ৪ নভেম্বর (রয়টার্স) — কম মজুরি এবং পশ্চিমা গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোতে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের সুবিধা কাজে লাগিয়ে চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। তবে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চলমান বিক্ষোভ এমন একটি শিল্পের ব্যয়গত সুবিধাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি জোগান দেয়।
গত শনিবার রাজধানী ঢাকার আশপাশের শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের বিক্ষোভ শুরু হয়। এর জেরে কয়েক শ পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়। শ্রমিকেরা বর্তমান মজুরির তুলনায় ১৪০ শতাংশ বাড়িয়ে মাসিক ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়েছেন। এ নিয়ে সংঘর্ষের সময় পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করেছে।
বিক্ষোভ এমন সময়ে শুরু হয়েছে, যখন প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী পোশাকশিল্পে এইচঅ্যান্ডএম, প্রাইমার্ক ও ওয়ালমার্টের মতো বড় ব্র্যান্ডের বসন্তকালীন পোশাক উৎপাদনের প্রস্তুতি চলছিল। কম উৎপাদন ব্যয় ও সময়মতো পণ্য সরবরাহের জন্য পরিচিত এই শিল্প এখন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বাড়ার মধ্যে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির চাপ সামলানোর চ্যালেঞ্জে পড়েছে।
কারখানার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক উৎপাদন বিঘ্নের কারণে বিদেশি ক্রেতারা পণ্য সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ জানাতে শুরু করেছেন। এর আগে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট এবং ২০২৪ সালের সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময়ও উৎপাদন ব্যাহত হয়েছিল।
জারা, গ্যাপ ও মার্কস অ্যান্ড স্পেনসারের মতো ব্র্যান্ডের পোশাক তৈরি করে স্প্যারো গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, বড় একটি জনতা তাদের কারখানায় হামলা চালানোর পর সোমবার উৎপাদন বন্ধ করা হয়।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, একদল মানুষ ইট-পাথর ছুড়ছে, জানালা ভাঙছে এবং প্রধান ফটক ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে। স্প্যারো গ্রুপের প্রধান শোভন ইসলাম জানান, পাঁচ হাজারের বেশি শ্রমিককে নিরাপদে কারখানা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কারা এই হামলার পেছনে ছিল, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
শোভন ইসলাম বলেন, “এটি পোশাকশিল্পের সবচেয়ে ব্যস্ত মৌসুম। নভেম্বরে বড় বড় চালান পাঠানোর কথা রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “এই পর্যায়ে যেকোনো ধরনের বিঘ্ন অত্যন্ত ক্ষতিকর। উৎপাদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এটি কাজ ব্যাহত করছে। আমার সব ক্রেতাই উদ্বিগ্ন।”
মজুরি বাড়লে কমতে পারে মূল্য প্রতিযোগিতার সুবিধা
বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। শ্রমিকেরা তা বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়েছেন। ২০২৩ সালে সর্বশেষ মজুরি বৃদ্ধির সময় বেতন ৫৬ শতাংশের বেশি বাড়ানো হয়েছিল। এর আগের কয়েক দফায় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৫০ থেকে ৭৭ শতাংশের মধ্যে।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুর রহমান তারাফদার জানান, মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং রপ্তানি কার্যক্রমের মতো বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নতুন মজুরি সুপারিশ করার জন্য রোববার সরকার একটি মজুরি বোর্ড গঠন করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় পোশাক ও জুতা কোম্পানিগুলোর সংগঠন আমেরিকান অ্যাপারেল অ্যান্ড ফুটওয়্যার অ্যাসোসিয়েশন বলেছে, শ্রমিকদের নিজেদের ও পরিবারের ভরণপোষণের উপযোগী ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই বোর্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। সংগঠনটি প্রতিবছর মজুরি পর্যালোচনার ব্যবস্থাও চালুর আহ্বান জানিয়েছে।
বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে পোশাকশিল্পের অবদান প্রায় ১০ শতাংশ। অতীতের মতো বড় পরিসরে মজুরি বাড়ানো হলে বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম বস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ ভারতের চেয়েও বেশি হয়ে যেতে পারে।
শিল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হিসাবে, ভারতে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি সাধারণত ১৩ হাজার থেকে ১৫ হাজার রুপি। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, চীন ও ভিয়েতনামে পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতা বাড়ছে
চট্টগ্রামভিত্তিক পোশাক প্রতিষ্ঠান ক্লিফটন গ্রুপের প্রধান নির্বাহী এম. মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ভারত বাংলাদেশের জন্য ক্রমেই শক্তিশালী প্রতিযোগী হয়ে উঠছে। দেশটির নিজস্ব তুলা উৎপাদন, শক্তিশালী সুতা শিল্প এবং পোশাক খাতকে সহায়তা দেওয়ার সরকারি প্রণোদনা রয়েছে।
বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও কানাডার মতো বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা পেলেও ভারতের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে। যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার।
৩০ জুন শেষ হওয়া অর্থবছরে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয় আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ৬৫ শতাংশ কমে ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ১০ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার হয়েছে।
বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়, কমছে মুনাফার সুযোগ
মহিউদ্দিন চৌধুরী জানান, সম্প্রতি এক মার্কিন ক্রেতা একটি নিট পোশাকের অর্ডারে প্রতি পিসের দাম ৩ সেন্ট কমানোর দাবি করেন। ভারতীয় উৎপাদকদের কাছ থেকে কম দামের প্রস্তাব পাওয়ার পর ওই ক্রেতা এমন অবস্থান নেন।
তিনি বলেন, “আমাদের মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না।”
অন্যদিকে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, জাহাজ পরিবহন ও পণ্য পরিবহনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় গত এক বছরে সরবরাহ ও লজিস্টিকস খরচ ৫ থেকে ৭ শতাংশ বেড়েছে।
মহিউদ্দিন চৌধুরীর ভাষায়, “সব দিক থেকেই ব্যয় বাড়ছে, অথচ ক্রেতারা এখনো দাম কমানোর চাপ দিচ্ছেন।”
তিনি বলেন, কারখানাগুলোর মুনাফার হার যেখানে সাধারণত ২ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে সীমিত, সেখানে অতিরিক্ত ব্যয় বহনের সুযোগ খুব কম। শ্রমিকদের দাবি যৌক্তিক হলেও দীর্ঘস্থায়ী উৎপাদন বিঘ্ন কর্মসংস্থান ও কারখানার টিকে থাকার সক্ষমতাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
বর্তমানে পোশাকশিল্পের মোট উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় ১০ থেকে ১৩ শতাংশ শ্রমিকদের মজুরি বাবদ খরচ হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, বিদেশি ক্রেতাদের কাছে নির্ভরযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর মতে, কোনো সরবরাহকারী সামান্য কম দামে পণ্য দিতে পারলেও অর্ডার সরবরাহে বিলম্ব, পণ্যের মানের অসামঞ্জস্য কিংবা শ্রমিক অসন্তোষের কারণে বারবার উৎপাদন বন্ধ হলে শেষ পর্যন্ত তার কাছ থেকে পণ্য কেনার খরচ বেড়ে যেতে পারে।












