যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য পরিচয়, ধর্ম ও সাংস্কৃতিক পার্থক্যকে ব্যবহার করার প্রবণতা নতুন নয়। কিন্তু যখন রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তা একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, বুদ্ধিবৃত্তিক অর্জন ও সাংস্কৃতিক অবদানকে প্রকাশ্যে অস্বীকার করেন, তখন সেটিকে আর সাধারণ রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর বলে উপেক্ষা করার সুযোগ থাকে না। এটি কেবল একটি জনগোষ্ঠীকে অপমান করার ঘটনা নয়; বরং তাদের ইতিহাস ও মানবিক পরিচয়কে রাজনৈতিক প্রয়োজনে মুছে ফেলার চেষ্টা।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের মন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র মিশিগানের এক নির্বাচনী সমাবেশে দাবি করেছেন, বিশ্বের প্রায় ৫০ কোটি আরব কোনো বিজ্ঞানচর্চা করেন না, নোবেল পুরস্কার পান না, গণিত বা বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেন না, এমনকি সাহিত্যও সৃষ্টি করেন না। তাঁর বক্তব্যে আধুনিক আরব সমাজকে মূলত স্থবিরতা, বিদ্বেষ ও সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
এ ধরনের বক্তব্যের সমস্যা শুধু এর বিদ্বেষপূর্ণ চরিত্রে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি ঐতিহাসিক তথ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। মিসরীয়-আমেরিকান বিজ্ঞানী আহমেদ জুয়াইল রসায়নে নোবেল ও উলফ পুরস্কার পেয়েছেন। ধাতু-জৈব কাঠামো নিয়ে গবেষণার জন্য জর্ডানীয়-আমেরিকান রসায়নবিদ ওমর এম ইয়াগিও নোবেল ও উলফ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। গণিতে ফিল্ডস পদক পেয়েছেন মাইকেল আতিয়াহ। আর সাহিত্যে ১৯৮৮ সালে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন মিসরের কথাসাহিত্যিক নাগিব মাহফুজ।
অর্থাৎ আরবদের বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান অস্বীকার করতে হলে শুধু ইতিহাসের ব্যাখ্যা বদলালেই চলবে না, স্বীকৃত আন্তর্জাতিক অর্জনগুলোকেও অস্বীকার করতে হবে। কেনেডির বক্তব্য সেই কাজটিই করেছে।
অজ্ঞতাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানো
এ ধরনের বক্তব্যের রাজনৈতিক কার্যকারিতা বোঝার জন্য বক্তার উদ্দেশ্য এবং শ্রোতাদের লক্ষ্য করা জরুরি। নির্বাচনী সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যের শ্রোতাদের সবাই যে আরব ইতিহাস, আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানচর্চা কিংবা সাহিত্যের নোবেলজয়ীদের সম্পর্কে জানবেন, এমন নয়। বক্তারা অনেক সময় এই জ্ঞানের ঘাটতিকেই কাজে লাগান। যে জনগোষ্ঠী সম্পর্কে শ্রোতাদের প্রত্যক্ষ ধারণা সীমিত, তাদের নিয়ে অতিরঞ্জিত ও মিথ্যা দাবি সহজেই বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।
এখানে শিক্ষাব্যবস্থা ও জ্ঞানচর্চার প্রতি অবিশ্বাস তৈরির রাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ। ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক বক্তব্যে প্রচলিত উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রতারণা হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা দেখা গেছে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও স্বীকৃত জ্ঞানব্যবস্থার প্রতি সন্দেহ তৈরি করার যে রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে ওঠে, সেখানে ইতিহাস ও তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তাও দুর্বল হয়ে পড়ে।
রাজনৈতিক প্রচারণার জন্য এটি সুবিধাজনক। কারণ, তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস দুর্বল হলে কোনো জনগোষ্ঠী সম্পর্কে ভিত্তিহীন সাধারণীকরণ ছড়িয়ে দেওয়া সহজ হয়। তখন রাজনৈতিক বক্তব্যের সত্যতা নয়, বরং তা শ্রোতাদের বিদ্যমান ধারণা ও আবেগের সঙ্গে কতটা মিলে যাচ্ছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
পরিচয়কে রাজনৈতিক অযোগ্যতার প্রতীক বানানো
কেনেডির বক্তব্যের সময় ও স্থানও তাৎপর্যপূর্ণ। মিশিগান যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী অঙ্গরাজ্য। সেখানে সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদ একজন চিকিৎসক, মহামারিবিদ এবং ডেট্রয়েটের সাবেক স্বাস্থ্য পরিচালক। তিনি আরব-আমেরিকান পরিচয়ের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য ও বিজ্ঞানের পেশাগত অভিজ্ঞতা নিয়ে রাজনীতিতে এসেছেন।
এমন একজন প্রার্থীর রাজনৈতিক অবস্থান ও নীতিগত প্রস্তাবের সমালোচনা করার পরিবর্তে তাঁর জাতিগত ও ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে প্রচারণা চালানো হলে সেটি নির্বাচনী বিতর্কের স্বাভাবিক পরিসরকে সংকুচিত করে। প্রার্থীর যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা কিংবা রাজনৈতিক কর্মসূচির বদলে তাঁর বংশপরিচয়কে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়।
এই কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে আগেও দেখা গেছে। বারাক ওবামার নির্বাচনী প্রচারণার সময় তাঁর জন্মস্থান নিয়ে বিতর্ক তৈরি করা হয়েছিল। তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করার জন্য জন্মসনদ দেখানোর দাবি ওঠে। একই সঙ্গে তাঁর মুসলিম হওয়ার বিষয়ে ভিত্তিহীন অভিযোগ ছড়ানো হয়। এসব প্রচারণার উদ্দেশ্য ছিল তাঁর নীতির সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশের বাইরে গিয়ে তাঁর পরিচয়কেই সন্দেহের বিষয় বানানো।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে একই ধরনের কৌশল নতুন পরিচয়ের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে। কেনেডির বক্তব্যের কয়েক দিন আগে জর্জিয়ার এক সমাবেশে ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের নাম নিয়ে কৌতুক করেন। তিনি বলেন, কারও পরিচয় নিয়ে সন্দেহ হলে তাঁকে ‘মোহাম্মদ’ বলে ডাকলেই ৬৫ শতাংশ ক্ষেত্রে সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একটি বহুল ব্যবহৃত নামকে রাজনৈতিক কৌতুকে পরিণত করার মধ্য দিয়ে আরব ও মুসলিম পরিচয়কে সহজেই চিহ্নিতযোগ্য, বিদেশি এবং মূলধারার রাজনীতির বাইরে থাকা পরিচয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
ঘরোয়া রাজনীতির বক্তব্য, আন্তর্জাতিক প্রভাব
নির্বাচনী সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যকে শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অংশ হিসেবে দেখার প্রবণতা রয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৈশ্বিক প্রভাবসম্পন্ন দেশের ক্ষেত্রে এই বিভাজন বাস্তবে কার্যকর নয়। একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর বক্তব্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতামত হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না। সেটি অনেক সময় রাষ্ট্রের রাজনৈতিক মনোভাবের প্রতিফলন হিসেবেও বিবেচিত হয়।
মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিরাপত্তা, বাণিজ্য, জ্বালানি, জনস্বাস্থ্য এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো বহু বিষয়ে বিস্তৃত। এমন অঞ্চলের জনগোষ্ঠীকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অক্ষম এবং সংঘাতপ্রবণ হিসেবে উপস্থাপন করা কূটনৈতিক সম্পর্ককে অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও সাংস্কৃতিক প্রভাব, অর্থাৎ সফট পাওয়ার, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোও এ ধরনের বক্তব্যকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের তুলনামূলকভাবে সম্মানজনক অংশীদার হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পায়।
এর অভ্যন্তরীণ সামাজিক প্রভাবও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা যখন কোনো জনগোষ্ঠী সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণাকে প্রকাশ্যে বৈধতা দেন, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে সেই জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈষম্য, হয়রানি ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ে। আরব-আমেরিকান ও অভিবাসী পরিবারগুলোর জন্য এর প্রভাব কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং দৈনন্দিন সামাজিক জীবনে অনুভূত হতে পারে।
বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো, কেনেডি এমন একটি মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যার কাজের ভিত্তি বৈজ্ঞানিক তথ্য, গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে অসংখ্য আরব-আমেরিকান চিকিৎসক, বিজ্ঞানী ও গবেষক কাজ করছেন। তাঁদের অবদান অস্বীকার করা হলে তা শুধু একটি জনগোষ্ঠীকে অপমান করে না, বরং যে প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব তিনি দিচ্ছেন, তার জ্ঞানভিত্তিক বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে।
রাজনৈতিক শক্তি বিভাজনে নয়, যুক্তিতে
যখন রাজনৈতিক দলগুলো স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা কিংবা প্রশাসনিক দক্ষতার মতো বিষয়ে জনগণকে সন্তুষ্ট করতে ব্যর্থ হয়, তখন সাংস্কৃতিক বিভাজনকে সামনে আনা সহজ বিকল্প হয়ে ওঠে। একটি জনগোষ্ঠীকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করলে জটিল নীতিগত বিতর্কের পরিবর্তে আবেগনির্ভর রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করা যায়। এতে ভোটারদের দৃষ্টি বাস্তব সমস্যা থেকে সরে গিয়ে পরিচয়ভিত্তিক বিরোধের দিকে চলে যায়।
কিন্তু গণতন্ত্রের সুস্থ বিকাশের জন্য এই প্রবণতা বিপজ্জনক। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীদের নীতি, যোগ্যতা, কর্মপরিকল্পনা ও শাসনক্ষমতা নিয়ে কঠোর বিতর্ক হওয়া উচিত। কোনো প্রার্থীর জাতিগত পরিচয়কে তাঁর অযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা কিংবা একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস ও অর্জন অস্বীকার করা সেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে।
আরব জনগোষ্ঠীর বিজ্ঞান, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদান নিয়ে বিতর্কের অবকাশ থাকতে পারে; কিন্তু তাদের অস্তিত্ব ও অর্জনকে অস্বীকার করার কোনো যুক্তিসংগত ভিত্তি নেই। রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ইতিহাস বিকৃত করা সাময়িকভাবে ভোটারদের আবেগ উসকে দিতে পারে, কিন্তু এর সামাজিক ও কূটনৈতিক মূল্য দীর্ঘস্থায়ী।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রকৃত শক্তি প্রতিপক্ষের পরিচয়কে হেয় করার মধ্যে নয়, বরং নিজের নীতি ও কর্মসূচির গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠার মধ্যে। যে রাজনীতি তথ্যের বদলে বিদ্বেষ, যুক্তির বদলে পরিচয় এবং প্রতিযোগিতার বদলে সাংস্কৃতিক অবমাননাকে বেছে নেয়, তা শেষ পর্যন্ত শুধু সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না; গণতন্ত্রের ভিত্তিকেও দুর্বল করে।












