কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) প্রায় ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসন সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত আবাসন না থাকায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসের বাইরে ভাড়া বাসা বা মেসে থাকতে হচ্ছে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকটের পাশাপাশি যাতায়াতের পথে নিরাপত্তাহীনতা ও যৌন হয়রানির অভিযোগও উঠেছে।
১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্যগুলোর একটি ছিল শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রতিষ্ঠার ৪৭ বছর পরও সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৯ হাজার ৬৬৯। বিপরীতে পাঁচটি ছাত্র হল ও তিনটি ছাত্রী হলে আবাসন সুবিধা রয়েছে মাত্র ৩ হাজার ৯৭৩ জনের। ফলে প্রায় ১৬ হাজার শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সুবিধার বাইরে থাকতে হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯টি অনুষদের অধীনে ৩৬টি বিভাগে ১১ হাজার ৮৮৯ জন ছাত্র এবং ৭ হাজার ৭৮০ জন ছাত্রী রয়েছেন।
কুষ্টিয়া শহর থেকে প্রায় ২৪ কিলোমিটার এবং ঝিনাইদহ শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়টিতে যাতায়াতও শিক্ষার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিদিন ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশ নিতে অনেক শিক্ষার্থীকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। অন্যদিকে, অনেকে ক্যাম্পাসের আশপাশে ভাড়া বাসা ও মেসে থাকেন।
নারী শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট বেশি
আবাসন সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে নারী শিক্ষার্থীদের ওপর। ছাত্রী হলগুলোতে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ থাকায় অনেককে গণরুমে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও একাধিক শিক্ষার্থীকে একই বিছানা ভাগাভাগি করতে হচ্ছে।
এতে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক ঘুম, পড়াশোনা ও ব্যক্তিগত পরিসর ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে, ক্যাম্পাসের বাইরে বসবাসকারী নারী শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন যাতায়াতের সময় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে থাকতে হচ্ছে।
ক্যাম্পাস ও যাতায়াতের পথে যৌন হয়রানির অভিযোগ
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, স্থানীয় বাস, আশপাশের বাজার ও বিভিন্ন এলাকায় বহিরাগতদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন নারী শিক্ষার্থী।
তবে ভুক্তভোগীদের অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটির কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করছেন না। সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার আশঙ্কা, ভয় এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে না পারার মতো বিষয়কে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তাঁরা।
লোকপ্রশাসন নয়, লোকসংস্কৃতি বিভাগের এক নারী শিক্ষার্থী জানান, স্থানীয় বাসে একাধিকবার বহিরাগতদের অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শের শিকার হয়েছেন তিনি।
২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়াবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষার্থীর অভিযোগ, এক সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসে কয়েকজন ব্যক্তি তাঁকে অনুসরণ করেন। এ সময় তাঁরা শিস দিতে থাকেন এবং বারবার তাঁকে উদ্দেশ করে ডাকতে থাকেন। আশপাশে কোনো যানবাহন না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ভয়ে দৌড়ে সেখান থেকে চলে যান তিনি।
২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের লোকসংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী জিন্নাত মালিয়াত সিমার অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। এমনকি কমিটির সদস্যদের বিরুদ্ধেও শিক্ষার্থীদের হয়রানির অভিযোগ করেন তিনি। এ কারণে ভুক্তভোগীদের ওই কমিটির কাছে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
তবে কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. হামিদা খাতুন জানান, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নবীনবরণ অনুষ্ঠানে নির্দেশিকা বিতরণ, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ব্যানার স্থাপন এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহিনুজ্জামান বলেন, ক্যাম্পাসে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে প্রশাসন চেষ্টা চালাচ্ছে। লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ‘ক্যাম্পাসে যৌন হয়রানি প্রতিরোধের চেষ্টা করছি আমরা। তবে ক্যাম্পাসের বাইরের এসব ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।’
প্রভোস্ট কাউন্সিলের সভাপতি অধ্যাপক ড. আইনুল হক আকন্দ জানান, বর্তমান প্রশাসন আবাসন সংকট সমাধানে কাজ করছে।
শিক্ষার্থী উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মামুন আল রশিদ বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এ ধরনের কোনো অভিযোগ তিনি পাননি। কোনো শিক্ষার্থী হয়রানির শিকার হয়ে তাঁর কাছে অভিযোগ করলে উপাচার্যের সহযোগিতায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ কে এম মতিনুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
নতুন হল নির্মাণের অপেক্ষা
বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকটি নতুন আবাসিক হলের নির্মাণকাজ শিগগিরই শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এসব হল চালু হলে আবাসন সংকট কিছুটা কমবে বলে আশা করছেন শিক্ষার্থীরা।
তবে শিক্ষার্থীদের একাংশের মতে, শুধু নতুন হল নির্মাণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আশপাশের শহর থেকে ক্যাম্পাসে যাতায়াতের জন্য নিরাপদ পরিবহন, নির্জন সড়কে নিরাপত্তা জোরদার এবং আবাসস্থল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াতের পথে কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।












