মিয়ানমার ও চীনের সম্পর্ক নিয়ে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্কে নতুন একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে: চীনের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখার অর্থ কি মিয়ানমারের সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না? বাস্তবতা হলো, প্রতিবেশী শক্তির সঙ্গে সুসম্পর্ক এবং নিজের রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষা পরস্পরবিরোধী নয়। বরং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম ইলেভেন মিডিয়া গ্রুপের একটি নিবন্ধকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক বিতর্ক এই প্রশ্নকে আরও সামনে এনেছে। চীনা বংশোদ্ভূত মিয়ানমার-সংশ্লিষ্ট ভাষাবিদ ও লেখক দাও সাও কিয়ি তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে অভিযোগ করেছেন, নিবন্ধটি চীনবিরোধী মনোভাব উসকে দিচ্ছে। কিন্তু কোনো সংবাদমাধ্যমের বক্তব্যকে চীনবিরোধী আখ্যা দেওয়ার আগে দেখতে হবে, সেখানে আসলে কী বলা হয়েছে এবং তার পক্ষে কী তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে।
ইলেভেন মিডিয়া গ্রুপের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল মিয়ানমারের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং চীনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। এই দুটি অবস্থানকে পরস্পরের বিপরীতে দাঁড় করানোর কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। একটি দেশ চীনের সঙ্গে সহযোগিতা করতে পারে, একই সঙ্গে নিজের ভূখণ্ড, জনগণের অধিকার এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্নে আপসহীন থাকতে পারে।
সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে চীনা প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ
মিয়ানমারের উত্তর শান রাজ্যে মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মির (এমএনডিএএ) নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় চীনা ভাষা, লিপি ও মুদ্রার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার অভিযোগ এই বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এটি কেবল প্রশাসনিক ভাষা পরিবর্তনের বিষয় নয়। কোনো অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন জীবন, স্থানীয় সংস্কৃতি, ভূমির অধিকার এবং ঐতিহাসিক পরিচয়ের সঙ্গে ভাষার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্মতি ছাড়া বাইরের কোনো ভাষা ও মুদ্রা চাপিয়ে দেওয়া হলে তা তাদের নিজস্ব পরিচয় ও অধিকার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করতেই পারে।

২৩ অক্টোবর শান স্টেট জয়েন্ট অ্যাকশন কমিটি (এসএসজেএসি) এক বিবৃতিতে এমএনডিএএর বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর জবরদস্তিমূলক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ তোলে। কমিটির বক্তব্য অনুযায়ী, স্থানীয় জনগণের কাছে অপরিচিত একটি ভাষাকে প্রশাসনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি জনপরিসরেও বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। কয়েক প্রজন্ম ধরে প্রচলিত ভূমি ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা, স্থানীয় সম্মতি ছাড়া জমি অধিগ্রহণ এবং বিদেশিদের জন্য ভূমির মালিকানা অর্জনের সুযোগ তৈরির বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ঐতিহাসিক শহর ও গ্রামের নাম এবং জনসাধারণের ব্যবহারের বিভিন্ন সাইনবোর্ড পরিবর্তন করে স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কহীন নাম ও ভাষা ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের গ্রেপ্তার, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও দমন-পীড়নের অভিযোগও করেছে কমিটি।
এসএসজেএসির মতে, এসব পদক্ষেপ ২০২২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি গৃহীত শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ঘোষণাপত্র এবং একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় গণতান্ত্রিক ইউনিয়নের মৌলিক নীতির পরিপন্থী। তাদের এই বক্তব্য দেখায়, উত্তর শানের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ শুধু কোনো সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব অবস্থান নয়; স্থানীয় জাতিগোষ্ঠীর সংগঠনগুলোর মধ্যেও এ নিয়ে আপত্তি রয়েছে।
ভূখণ্ডের সীমানা ও স্থানীয় পরিচয়ের প্রশ্ন
এই বিতর্কে হসেনি এলাকার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহাসিকভাবে উত্তর শান রাজ্যের সবচেয়ে বিস্তৃত ও প্রভাবশালী শান শাসিত অঞ্চলগুলোর একটি ছিল হসেনি। এমএনডিএএর সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর এলাকাটিকে চীনা নাম ‘মুবাং’ দিয়ে পরিচিত করার বিষয়টি স্থানীয় পরিচয় ও ভূখণ্ডগত অবস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
মিয়ানমারের ২০০৮ সালের সংবিধান অনুযায়ী, হসেনি লাশিও জেলার একটি টাউনশিপ। এটি কোকাং স্বশাসিত অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত নয়। সংবিধানে কোকাং স্বশাসিত অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে লাউকাই, চিনশেহাও, কনকিয়ান এবং মাওতাইক উপশহরের কথা বলা হয়েছে।
সুতরাং কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলেই একটি এলাকার সাংবিধানিক অবস্থান কিংবা স্থানীয় মানুষের ঐতিহাসিক পরিচয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তিত হয়ে যায় না। ভূখণ্ডের প্রশ্নে সামরিক বাস্তবতা এবং রাষ্ট্রের আইনগত কাঠামোর পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি।
মিয়ানমারের ইতিহাসও এই সংবেদনশীলতার ব্যাখ্যা দেয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, ফ্যাসিবাদী জাপানের আগ্রাসন এবং কুওমিনতাং বাহিনীর অনুপ্রবেশ দেশটির রাষ্ট্রীয় স্মৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। স্বাধীনতার পরও চীনা সীমান্তবর্তী অঞ্চলকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সশস্ত্র সংঘাত ও বিদ্রোহ মিয়ানমারের সার্বভৌমত্বের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ফলে বিদেশি প্রভাব ও ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দেশটির মানুষের সতর্কতা ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার সঙ্গেই সম্পর্কিত।
স্বাধীন গণমাধ্যমের অবস্থান কেন গুরুত্বপূর্ণ
ইলেভেন মিডিয়া গ্রুপের বিরুদ্ধে চীনবিরোধী প্রচারণার অভিযোগের জবাবে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের সম্পাদকীয় অবস্থান ও আন্তর্জাতিক পরিচিতির বিষয়টি সামনে এসেছে।

প্রতিষ্ঠানটি দাবি করে, ২৭ বছর ধরে ‘সত্য ছাড়া কিছুই সঠিক নয়’ নীতিতে সাংবাদিকতা করে আসছে তারা। ২০১১ সালে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স তাদের ‘মিডিয়া অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার দেয়। ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী ড. থান হুত আং বিশ্ব সংবাদ প্রকাশক সমিতির (ওয়ান-ইফরা) গোল্ডেন পেন অব ফ্রিডম পুরস্কার পান।
ইলেভেন মিডিয়া গ্রুপ ওয়ান-ইফরা এবং এশিয়া নিউজ নেটওয়ার্কেরও সদস্য। এশিয়া নিউজ নেটওয়ার্কে বাংলাদেশের দ্য ডেইলি স্টার, চীনের চায়না ডেইলি, ভারতের দ্য স্টেটসম্যান, জাপানের দ্য জাপান নিউজসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সংবাদমাধ্যম রয়েছে। ২০২৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর বেইজিংয়ে নেটওয়ার্কটির বোর্ড সভায় ইলেভেন মিডিয়া গ্রুপের একজন নির্বাহী পরিচালক অংশ নেন। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, চীনা সরকারি কর্মকর্তা ও সংবাদমাধ্যমগুলোর সঙ্গেও তাদের সুসম্পর্ক রয়েছে।
এসব সম্পর্কের উল্লেখের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত একটি বিষয় পরিষ্কার করা: চীনের সঙ্গে যোগাযোগ বা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেও একটি সংবাদমাধ্যম স্বাধীনভাবে চীনের নীতি কিংবা মিয়ানমারে চীনা প্রভাবের সমালোচনা করতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বন্ধুত্ব মানে নীরবতা নয়। বরং প্রকৃত বন্ধুত্বের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান ও স্পষ্ট বক্তব্যের সুযোগ।
চীনবিরোধিতা নয়, স্বাধীন অবস্থানের অধিকার
ইলেভেন মিডিয়া গ্রুপের সম্পাদক-প্রধান কো কিয়াও জাও লিনের বক্তব্যে প্রতিষ্ঠানটির দুটি মৌলিক অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে: গণতন্ত্র ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি বিশ্বাস এবং মিয়ানমারকে শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল, নিরাপদ ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কও এই নীতির ভিত্তিতেই বজায় রাখা হয়। তারা কোনো দেশের প্রতিনিধি বা প্রক্সি হিসেবে কাজ করে না।
এই অবস্থানকে চীনবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা হলে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিসর সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। কোনো সংবাদমাধ্যমের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত থাকলে তার নির্দিষ্ট তথ্য, যুক্তি ও বিশ্লেষণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। কিন্তু প্রমাণ ছাড়াই পুরো প্রতিষ্ঠানকে বিদেশবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কের বিকল্প হতে পারে না।
একইভাবে, মিয়ানমারের জনগণ ও চীনের জনগণের মধ্যে শত্রুতা তৈরি করা যেমন অনাকাঙ্ক্ষিত, তেমনি চীনের সঙ্গে সুসম্পর্কের অজুহাতে মিয়ানমারের জনগণের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার নিয়ে কথা বলার সুযোগ বন্ধ করাও গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রকৃত বন্ধুত্বের ভিত্তি হওয়া উচিত সমতা, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা এবং পারস্পরিক স্বার্থের স্বীকৃতি। কোনো প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখার অর্থ নিজের জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপস করা নয়। মিয়ানমারের জন্যও চ্যালেঞ্জটি সেখানেই—চীনের সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রাখা, কিন্তু সেই সহযোগিতাকে যেন নিজস্ব ভূখণ্ড, পরিচয় ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা না হয়।












