চীনের ব্যাংকিং খাতে বড় ঋণখেলাপি ব্যবসায়ীদের প্রভাব নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। দেশটির ব্যাংক অব সাংহাইয়ের সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদন বলছে, ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে ব্যাংকটির নিট মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯৩ শতাংশ কমে ৩৫ কোটি ইউয়ানে নেমে এসেছে। একই সময়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণও দ্রুত বেড়েছে। ব্যাংকটির এই সংকটের পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে চীনের ব্যবসায়ী ইয়াও ঝেনহুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিপুল অঙ্কের ঋণ।
গত ৩১ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে ব্যাংক অব সাংহাই জানায়, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে তাদের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৭৫ শতাংশ। সম্ভাব্য ঋণক্ষতি সামাল দিতে সংরক্ষিত মূলধনের পরিমাণও গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। এ খবর প্রকাশের পর ব্যাংকটির শেয়ারের দাম এক দিনেই ১০ শতাংশের বেশি পড়ে যায়।
এক ব্যবসায়ীর উচ্চাভিলাষী বিনিয়োগ
ইয়াও ঝেনহুয়া ২০১৫ সাল থেকে চীনের আর্থিক খাতে আলোচিত নাম। ওই বছর তাঁর ব্যবসায়িক গোষ্ঠী বাওনেং দেশটির বড় আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ভ্যাঙ্কে অধিগ্রহণের উদ্যোগ নেয়। চীনে এ ধরনের প্রতিকূল অধিগ্রহণের ঘটনা বিরল। তার ওপর ভ্যাঙ্কের আংশিক মালিকানা ছিল রাষ্ট্রের হাতে। ফলে উদ্যোগটি ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক—দুই দিক থেকেই আলোচনার জন্ম দেয়।
অধিগ্রহণের অর্থ জোগাতে ইয়াও নিজের মালিকানাধীন কয়েকটি বিমা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাওয়া প্রিমিয়ামের অর্থ ব্যবহার করেন। চীনে বিমার অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে তাঁর এই অর্থ ব্যবহারের পদ্ধতিকে বেআইনি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের আশির দশকের করপোরেট অধিগ্রহণকারীদের সঙ্গে তুলনা করে ইয়াওকে ‘বারবারিয়ান’ বা ‘বর্বর’ নামে অভিহিত করা হয়। তবে ভ্যাঙ্কে অধিগ্রহণের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ২০১৭ সালে তাঁকে ১০ বছরের জন্য বিমা খাতের কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ করা হয়।
এরপরও অন্যান্য খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণের চেষ্টা চালান ইয়াও। এর মধ্যে ছিল বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কোরোসে ৬৬০ কোটি ইউয়ানের ঋণনির্ভর বিনিয়োগ। কিন্তু সেই বিনিয়োগও সফল হয়নি।
১২৯০ কোটি ইউয়ানের ঋণ আদায়ে ব্যর্থতা
বাওনেং ও ইয়াওয়ের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে আইনি লড়াই চালাচ্ছে ব্যাংক অব সাংহাই। ব্যাংকটির দাবি, ইয়াওয়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে তাদের অন্তত ১ হাজার ২৯০ কোটি ইউয়ান ঋণ পাওনা রয়েছে।
২০২০ সালে এসব ঋণের বিপরীতে সম্পত্তি ও ইয়াওয়ের ব্যক্তিগত জামানত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চীনের আবাসন খাতে বড় ধরনের মন্দা দেখা দেওয়ায় জামানত হিসেবে রাখা সম্পত্তির মূল্যও কমে যায়। অন্যদিকে কোরোস প্রত্যাশিতসংখ্যক গাড়ি বিক্রি করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ইয়াও অভিযোগ করেন, গাড়ি প্রতিষ্ঠানটিতে তাঁর বিনিয়োগের অর্থ স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তারা প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছেন। তাঁর ঋণমান এতটাই খারাপ হয়েছে যে বাণিজ্যিক বিমানে ভ্রমণ এবং বিলাসবহুল হোটেলে থাকার ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছেন তিনি।
তবে ব্যাংক অব সাংহাইয়ের প্রকাশ করা সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, ইয়াও ও তাঁর প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ঋণের অর্থ আদায়ের মতো কোনো কার্যকর সম্পদ পাওয়া যাচ্ছে না। অর্থাৎ, ঋণের বিপরীতে থাকা জামানত বা অন্যান্য সম্পদ বিক্রি করেও পাওনা অর্থ উদ্ধারের বাস্তব সুযোগ নেই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত কিছু ছবিতে ইয়াওয়ের মতো দেখতে একজনকে দক্ষিণ চীনের শেনঝেন শহরে বিলাসবহুল গাড়ির বদলে মেট্রোরেলে চলাচল করতে দেখা গেছে। তবে ব্যাংকের বিনিয়োগকারীদের কাছে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই বিপুল অঙ্কের ঋণ অনাদায়ী হয়ে পড়ায় ব্যাংকটির মুনাফায় বড় ধাক্কা লেগেছে। ঋণ থেকে সম্ভাব্য ক্ষতি হিসাব করে বিপুল অর্থ সংরক্ষণ করতে গিয়ে মুনাফার বড় অংশ হারিয়েছে ব্যাংকটি।
অন্য ব্যাংকও পড়তে পারে ঝুঁকিতে
ইয়াও ঝেনহুয়া ও বাওনেংয়ের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকা অন্য চীনা ব্যাংকগুলোর জন্যও একই ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। ব্যাংক অব সাংহাইয়ের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে বিপুল ঋণ দেওয়ার পর সেই ঋণ আদায় অসম্ভব হয়ে পড়লে একটি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থায় কতটা চাপ তৈরি হতে পারে।
চীনের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এ ধরনের ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ২০১৯ সালে আরেক ধনকুবের শিয়াও জিয়ানহুয়া দেশটির আর্থিক খাতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছিলেন। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন। আরেক ঋণগ্রস্ত ব্যবসায়ী লাই শিয়াওমিনকে ২০২১ সালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি আর্থিক খাত থেকে অনিয়ম ও প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু ব্যাংক অব সাংহাইয়ের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ঋণঝুঁকি এখনো দেশটির আর্থিক ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।












