যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে অ্যাটর্নি জেনারেল পদে ডেমোক্র্যাটদের জয় শুধু একটি অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনী ফল নয়। এর মধ্য দিয়ে দেশটির রক্ষণশীল রাজনৈতিক ও আইনি আন্দোলন এমন একটি প্রতিষ্ঠান হারাতে যাচ্ছে, যা প্রায় তিন দশক ধরে তাদের আইনজীবী তৈরি, আইনি লড়াই পরিচালনা এবং জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। টেক্সাসের অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের জন্য এমন এক শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল, যেখান থেকে ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্টদের নীতি ও কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আইনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হতো।
এই পরিবর্তনের তাৎপর্য শুধু কতগুলো মামলা বন্ধ হবে বা নতুন মামলা দায়ের হবে, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং রক্ষণশীল আইনি আন্দোলনের জন্য বড় প্রশ্ন হলো, যে প্রতিষ্ঠান কয়েক প্রজন্ম ধরে তাদের আইনজীবী, নেতৃত্ব ও কৌশল তৈরির ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে, সেটির বিকল্প কোথায় পাওয়া যাবে?
টেক্সাসের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী নাথান জনসন ৫২ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট পেয়ে রিপাবলিকান প্রার্থী মেইস মিডলটনকে পরাজিত করেছেন। জনসন একজন অঙ্গরাজ্য সিনেটর ও বাণিজ্যিক আইনজীবী। অন্যদিকে মিডলটন তেল ও গ্যাস খাতের ব্যবসায়ী এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র। একই নির্বাচনে বিদায়ী অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনও সিনেট নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন। জাতীয় ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যের যে ঢেউ টেক্সাসেও ছড়িয়ে পড়েছে, এই ফল তারই অংশ।
একটি কার্যালয়, একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের পতন
টেক্সাসের অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল আইনজীবীদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে এসেছে। এখান থেকে উঠে এসেছেন সিনেটর টেড ক্রুজ ও জন কর্নিন, ফেডারেল আপিল আদালতের বিচারক, বড় করপোরেশনের প্রধান আইন কর্মকর্তা এবং প্রভাবশালী আইন প্রতিষ্ঠানের অংশীদারেরা।
প্রায় ৪ হাজার কর্মীর এই কার্যালয়ে রয়েছেন ৮০০ আইনজীবী। এত বড় জনবল, আইনি দক্ষতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের সমন্বয় যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়গুলোর মধ্যে একে বিশেষ অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিল।
মার্কিন রাজনীতিতে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে বারাক ওবামা ও জো বাইডেনের প্রেসিডেন্ট থাকাকালে। অভিবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশনীতি এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে টেক্সাস একের পর এক মামলা করেছে। সব মামলায় জয় আসেনি। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এসব মামলা কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি বাস্তবায়ন বিলম্বিত করেছে, প্রশাসনিক ব্যয় বাড়িয়েছে এবং ডেমোক্র্যাট সরকারের রাজনৈতিক কর্মসূচিকে চাপে ফেলেছে।
রক্ষণশীল আইনজীবী ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা জাড স্টোনের মূল্যায়ন, দেশের সবচেয়ে বড় রক্ষণশীল জনস্বার্থভিত্তিক আইনি প্রতিষ্ঠান কার্যত ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যাচ্ছে। তাঁর বক্তব্যে এই পরাজয়ের রাজনৈতিক গুরুত্ব স্পষ্ট।

অ্যাটর্নি জেনারেল কি দলের আইনজীবী?
নাথান জনসনের সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো কার্যালয়টির রাজনৈতিক পরিচয় বদলে একে আইনের শাসনভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
জনসনের বক্তব্য, কোনো প্রেসিডেন্ট আইন ভঙ্গ করলে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব। সেটি ডোনাল্ড ট্রাম্প হোন কিংবা কোনো ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট। তাঁর মতে, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিগত আইন প্রতিষ্ঠান হতে পারে না।
এই অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, টেক্সাসের কার্যালয় দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে রিপাবলিকানদের রাজনৈতিক ও আইনি প্রতিরোধের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। জনসন নিজেও ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতি, শুল্ক এবং কেন্দ্রীয় অর্থায়ন বন্ধের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ডেমোক্র্যাট অ্যাটর্নি জেনারেলদের করা মামলাগুলোর প্রশংসা করেছেন। তবে তিনি বলেছেন, রিপাবলিকানদের আমলে দায়ের করা প্রতিটি চলমান মামলার যৌক্তিকতা নতুন করে পর্যালোচনা করা হবে। যেসব মামলার আইনগত ভিত্তি থাকবে, সেগুলো চলবে; অন্যগুলো বন্ধ হতে পারে।
এতে গর্ভপাত, ট্রান্সজেন্ডার অধিকার, অভিবাসনসহ রিপাবলিকানদের অগ্রাধিকারভিত্তিক বিভিন্ন বিষয়ে চলমান আইনি লড়াইয়ের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
কীভাবে জাতীয় রাজনীতির শক্তিকেন্দ্র হলো টেক্সাস
একসময় যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলোর অ্যাটর্নি জেনারেলদের কাজ মূলত নিজ নিজ এলাকার আইন প্রয়োগ ও প্রশাসনিক বিষয় দেখাশোনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ১৯৯৯ সালে রিপাবলিকান অ্যাটর্নি জেনারেলদের সংগঠন গঠনের পর এই পদগুলোর রাজনৈতিক গুরুত্ব দ্রুত বাড়তে থাকে। অঙ্গরাজ্যের আইন কর্মকর্তারা ক্রমে জাতীয় নীতিনির্ধারণের সক্রিয় অংশীদার হয়ে ওঠেন।
টেক্সাস এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেয়। জন কর্নিন ও গ্রেগ অ্যাবটের সময় থেকেই কার্যালয়টি কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে বড় বড় মামলা পরিচালনার জন্য পরিচিতি পেতে শুরু করে। অ্যাবটের সময় ওবামা প্রশাসনের স্বাস্থ্যসেবা, অভিবাসন ও পরিবেশনীতি নিয়ে একের পর এক মামলা করা হয়। পরে কেন প্যাক্সটন সেই ধারাকে আরও বিস্তৃত করেন। তাঁর কার্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বাইডেন প্রশাসনের বিরুদ্ধে ১০০টির বেশি মামলা করা হয়েছিল।
তবে প্যাক্সটনের মেয়াদ শুধু আইনি লড়াইয়ের জন্য আলোচিত ছিল না। তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক খাতের জালিয়াতির অভিযোগ, রাজনৈতিক দাতাকে সুবিধা দিতে সরকারি পদ ব্যবহারের অভিযোগ এবং ২০২৩ সালে অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসনের ঘটনাও প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্যাক্সটনের বিরুদ্ধে বিতর্ক ক্রমেই তাঁর কার্যালয়ের জন্য বোঝা হয়ে উঠেছিল।

রক্ষণশীল আইনজীবীদের সামনে নতুন সংকট
জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর জনসন কার্যালয়টির নেতৃত্বে পরিবর্তন আনার এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে কাজ করা ব্যক্তিদের সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। তবে তিনি মনে করেন, বহু অভিজ্ঞ সরকারি কর্মকর্তা তাঁদের পদে বহাল থাকবেন। নতুন নেতৃত্ব নিয়োগের পাশাপাশি ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ রাখার কথাও বলেছেন তিনি।
টেক্সাসে রক্ষণশীলদের পরাজয় মানেই যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তাদের আইনি প্রভাব শেষ হয়ে যাওয়া নয়। লুইজিয়ানা, মিসৌরি ও ফ্লোরিডাসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে এখনো রিপাবলিকান অ্যাটর্নি জেনারেলরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তবে টেক্সাসের মতো বিপুল জনবল, অভিজ্ঞতা, আইনি সম্পদ এবং প্রভাবশালী বিচারিক পরিবেশ অন্য কোথাও একইভাবে পাওয়া কঠিন।
বিশেষ করে টেক্সাসের মামলাগুলো সাধারণত এমন একটি ফেডারেল বিচারিক কাঠামোর মধ্যে পড়ে, যার শীর্ষ আপিল আদালত যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম সার্কিট। এই আদালতকে দেশটির সবচেয়ে রক্ষণশীল আপিল আদালতগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে টেক্সাসের আইনি পরিবেশ রক্ষণশীলদের জন্য বাড়তি কৌশলগত সুবিধা তৈরি করেছিল।
এই নির্বাচনের ফলে তাই শুধু একটি পদে দলীয় নিয়ন্ত্রণ বদলাচ্ছে না; বদলে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আইনি রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিকেন্দ্রের ভবিষ্যৎ। ডেমোক্র্যাটরা এখন সেই প্রতিষ্ঠানকে নতুনভাবে সাজানোর সুযোগ পেয়েছে, যেটি দীর্ঘদিন তাদের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর আইনি প্রতিপক্ষ ছিল। আর রক্ষণশীলদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ—টেক্সাসের বাইরে এমন একটি প্রতিষ্ঠান ও আইনজীবী তৈরির ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা তাদের হারানো প্রভাবের কিছুটা হলেও পুনরুদ্ধার করতে পারে।












