নতুন অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে রান্না করা খাবারের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করতে পারে বিষাক্ত ধাতু সিসা। বিশেষ করে নতুন হাঁড়িতে প্রথম কয়েকবার রান্না করা খাবারে সিসার মাত্রা বেশি থাকতে পারে। বাংলাদেশের স্থানীয়ভাবে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি নিয়ে গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটি করেছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) ও যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা।
গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন ও পুরোনো—দুই ধরনের হাঁড়ি থেকেই রান্নার সময় খাবারে সিসা মিশতে পারে। নতুন হাঁড়িতে প্রথমবার রান্না করা ভাতে প্রতি কেজিতে সর্বোচ্চ ৩০৫ মাইক্রোগ্রাম এবং খিচুড়িতে ৪২০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত সিসা পাওয়া গেছে।
শিশুদের জন্য নির্ধারিত যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) মানদণ্ড অনুযায়ী, এ ধরনের খাবারে সিসার গ্রহণযোগ্য মাত্রা প্রতি কেজিতে ১০ মাইক্রোগ্রাম। অর্থাৎ গবেষণায় পাওয়া সর্বোচ্চ মাত্রা এই মানদণ্ডের তুলনায় অনেক বেশি।
নতুন হাঁড়িতে সিসার মাত্রা বেশি
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘জার্নাল অব এক্সপোজার সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল এপিডেমিওলজি’ সাময়িকীতে। এতে স্থানীয় পরিবারের কাছ থেকে সংগ্রহ করা সাতটি পুরোনো হাঁড়ি এবং একজন সরবরাহকারীর কাছ থেকে কেনা ২০টি নতুন হাঁড়ি পরীক্ষা করা হয়।
প্রথমে হাঁড়িগুলোর ধাতুতে কী পরিমাণ সিসা রয়েছে, তা নির্ণয় করেন গবেষকেরা। এরপর সেগুলো গরম করে ভাত ও ডাল-চালের মিশ্রণে তৈরি খিচুড়ি রান্না করা হয়। পরে অত্যন্ত সংবেদনশীল পরীক্ষাগার পদ্ধতিতে রান্নার তরল ও খাবারে সিসার উপস্থিতি পরিমাপ করা হয়।
পরীক্ষায় দেখা যায়, প্রতিটি হাঁড়ি থেকেই রান্নার সময় সিসা বেরিয়ে এসেছে। নতুন হাঁড়িতে বারবার রান্নার সঙ্গে সিসার পরিমাণ কমেছে। তবে তৃতীয়বার ব্যবহারের পরও খাবারে সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, পরীক্ষা করা সাতটি পুরোনো হাঁড়ির মধ্যে ছয়টিতে রান্না করা ভাতেও সিসা পাওয়া গেছে।
হাঁড়ি পরিষ্কারেও বাড়তে পারে সিসা
গবেষণায় রান্নার পাত্র পরিষ্কার ও ব্যবহারের পদ্ধতির প্রভাবও উঠে এসেছে। নতুন হাঁড়ি স্টিলের তারযুক্ত মাজুনি দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করলে সিসা নির্গমনের পরিমাণ না ঘষে ব্যবহারের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেড়ে যায়।
এ ছাড়া ধাতব খুন্তি দিয়ে খাবার নাড়াচাড়া করলেও হাঁড়ি থেকে সিসা বের হওয়ার পরিমাণ বাড়তে পারে বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশে পুরোনো অ্যালুমিনিয়ামের বাসনপত্রের বদলে নতুন হাঁড়ি নেওয়ার প্রচলন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো কাপড়ের বিনিময়েও নতুন বাসন পাওয়া যায়। গবেষণাটিতে এই বিনিময়প্রথা পরীক্ষা করা হয়নি। তবে গবেষকেরা বলছেন, নতুন বা চকচকে হাঁড়ি দেখেই সেটিকে নিরাপদ মনে করার সুযোগ নেই।
স্থানীয়ভাবে তৈরি অনেক অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি পুরোনো ও ফেলে দেওয়া ধাতু গলিয়ে তৈরি করা হয়। এসব ধাতব বর্জ্যে সিসা থাকলে তা নতুন হাঁড়িতেও চলে আসতে পারে। ব্যবহৃত কাঁচামাল যথাযথভাবে পরীক্ষা না করা হলে এ ধরনের ঝুঁকি থেকে যায়।
শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি
সিসা শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ, শেখার ক্ষমতা ও আচরণের ওপর দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, রক্তে সিসার এমন কোনো মাত্রা জানা নেই, যাকে নিরাপদ বলা যায়।
গবেষণার লেখকেরা বাংলাদেশের গ্রামীণ শিশুদের সাধারণত ভাত খাওয়ার পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে হিসাব করেছেন, এ ধরনের হাঁড়িতে রান্না করা ভাত নিয়মিত খেলে একটি শিশু খাবারের মাধ্যমে দৈনিক সিসা গ্রহণের ক্ষেত্রে এফডিএর নির্ধারিত নির্দেশক মাত্রার পাঁচ গুণেরও বেশি সিসা গ্রহণ করতে পারে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প আনলিডেডের পরিচালক ডা. জেনা ফোরসাইথ বলেন, গবেষকেরা হাঁড়ির ধাতু এবং সেই হাঁড়িতে রান্না করা খাবার—দুই জায়গাতেই সিসার উপস্থিতি পরিমাপ করেছেন। এর মাধ্যমে প্রতিদিনের ব্যবহৃত রান্নার পাত্র কীভাবে সিসার সংস্পর্শের উৎস হয়ে উঠতে পারে, তা বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে।
গবেষকেরা নিরাপদ রান্নার পাত্র ব্যবহারের পাশাপাশি পরিবারগুলোর জন্য এ বিষয়ে আরও স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।












