ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে সর্বোচ্চ ২ কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তথ্যদাতার নিরাপদে অন্যত্র বসবাসের ব্যবস্থাও করার প্রস্তাব দিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ‘রিওয়ার্ডস ফর জাস্টিস’ কর্মসূচির আওতায় এ পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনা, সরঞ্জাম ও ব্যক্তিদের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য দিতে পারলে এই অর্থ পাওয়া যেতে পারে।
এর আগে গত বছর ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, দেশটির পরমাণু অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে ইরান বরাবরই বলে আসছে, তাদের পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।
পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে তথ্যের ঘাটতি
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণসংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা পূরণে ইরানের ব্যর্থতার কারণে দেশটির পরমাণু কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে সংস্থাটির ধারাবাহিক নজরদারি ব্যাহত হয়েছে।
বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার কাজে ব্যবহৃত সেন্ট্রিফিউজের উৎপাদন ও মজুত সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না বলে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি।
সেন্ট্রিফিউজের মাধ্যমে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা হয়। এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বেসামরিক কাজে পারমাণবিক চুল্লির জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। তবে প্রায় ৯০ শতাংশ বা তার বেশি মাত্রায় সমৃদ্ধ করা হলে তা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতেও ব্যবহার করা সম্ভব।
ইরানের ওপর নজরদারিতে নতুন মার্কিন টাস্কফোর্স
এদিকে ইরানের সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র ও নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত পণ্য পরিবহন ঠেকাতে নতুন একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের কথা জানিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
‘টাস্কফোর্স আয়রন গেট’ নামের এই ইউনিট যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের টাম্পা থেকে কাজ করবে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, সরকারের অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে তারা কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
অস্ত্র পরিবহনের পাশাপাশি দ্বৈত ব্যবহারের উপযোগী পণ্য এবং অবৈধ অর্থের প্রবাহ বন্ধ করাও এই টাস্কফোর্সের লক্ষ্য।
সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি, ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধের কারণে দেশটির ২৫০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
নতুন করে হামলার আশঙ্কা ও আলোচনার সম্ভাবনা
ইরানে আবার বড় ধরনের সামরিক হামলা চালানো হতে পারে—এমন আলোচনা চলছিল যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে। তবে নির্বাচনের আগে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেছিলেন, এ বিষয়ে তিনি তাড়াহুড়ো করছেন না।
নির্বাচনের আগের দিন ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ইরানের পরমাণু কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’-এ হামলার সম্ভাবনার কথাও বলেন। তাঁর দাবি, সেখানে হামলা চালানো কঠিন কিছু নয় এবং এক ঘণ্টার মধ্যেই তা করা সম্ভব।
এর আগে একাধিকবার এই স্থাপনায় বোমা হামলার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প।
তবে ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের বিরূপ মনোভাব মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। এ কারণে সংঘাত আরও বাড়ানোর বিষয়ে হোয়াইট হাউসের আগ্রহ কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শুক্রবার ট্রাম্প দাবি করেন, আট মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসান ঘটাতে ইরান আগ্রহী। তাঁর ভাষায়, ইরানের অর্থনীতি ও সামরিক সক্ষমতা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করতে চাইছে।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রও জানিয়েছেন, দুই পক্ষের কাছে দেওয়া প্রস্তাব ও ধারণাগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর বিষয়ে কাতার এখনো আশাবাদী।
মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের দেওয়া সাতটি শর্ত পূরণ করলে দুই দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
এর আগে জুনে যুদ্ধ বন্ধ ও হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছিল। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরানের জাহাজ চলাচলে হামলা আবার শুরু হওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ পুনর্বহালের পর সেই সমঝোতা ভেঙে যায়।












