ইসরায়েলের সাম্প্রতিক নির্বাচন দেশটির রাজনৈতিক সংকটের একটি পুরোনো বাস্তবতাকে আবার সামনে এনেছে। ভোটের ফল প্রকাশের পরও সরকার গঠনের পথ পরিষ্কার হয়নি। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি এককভাবে সবচেয়ে বড় দল হলেও তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরাতে আগ্রহী দলগুলোর সম্মিলিত আসনসংখ্যা বেশি। কিন্তু সেই বিরোধী শিবিরও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারছে না। কারণ, নেতানিয়াহুবিরোধিতাই তাদের একমাত্র অভিন্ন অবস্থান; রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ, নিরাপত্তা, ফিলিস্তিন প্রশ্ন এবং আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে তাদের মধ্যে গভীর মতপার্থক্য রয়েছে।
এই অচলাবস্থা শুধু কোনো নেতার জনপ্রিয়তা কিংবা একটি নির্বাচনের ফলাফলের সমস্যা নয়। এর শিকড় ইসরায়েলের নির্বাচনী কাঠামো, সমাজের অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং কয়েক দশকের রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যে নিহিত। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা এবং পরবর্তী গাজা যুদ্ধ সেই বিভাজনকে আরও তীব্র করেছে। ফলে এবারের নির্বাচনকে শুধু নেতানিয়াহুর পক্ষে বা বিপক্ষে গণভোট হিসেবে দেখলে ইসরায়েলি রাজনীতির গভীর সংকটটি বোঝা যাবে না।
নির্বাচনী ব্যবস্থায় বিভাজনের প্রতিফলন
ইসরায়েলের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় দেশটির অন্যতম প্রধান নেতা ডেভিড বেন-গুরিয়ন সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি ভিন্ন কাঠামো চেয়েছিলেন। তাঁর পছন্দ ছিল ব্রিটেনের মতো নির্বাচনী ব্যবস্থা, যেখানে নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকার ভোটাররা সরাসরি একজন প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন এবং সর্বাধিক ভোট পাওয়া প্রার্থী বিজয়ী হবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলকে গ্রহণ করতে হয় আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা।
এই ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে সংসদে আসন পায়। ফলে ছোট দলগুলোরও সংসদে প্রবেশের সুযোগ থাকে। বহুমাত্রিক সমাজে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি কার্যকর হতে পারে। কিন্তু এর বিপরীত দিক হলো, সংসদে একাধিক ছোট দলের উপস্থিতি এবং সরকার গঠনের জন্য তাদের ওপর নির্ভরশীলতা।
ইসরায়েলের ক্ষেত্রে এই নির্ভরশীলতা দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতার উৎস। দল গঠিত হচ্ছে, ভেঙে যাচ্ছে, আবার নতুন জোট তৈরি হচ্ছে। নির্বাচনের আগে যেসব নীতি ও প্রতিশ্রুতি সামনে আসে, সরকার গঠনের দর-কষাকষিতে সেগুলোর অনেক কিছুই গুরুত্ব হারায়। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ছোট দলগুলোও বড় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
বেন-গুরিয়ন নিজেও পরবর্তী সময়ে এই ব্যবস্থার সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল, প্রচলিত নির্বাচনী কাঠামো শুধু গণতান্ত্রিক ঐকমত্য গড়ে তোলার পথেই বাধা সৃষ্টি করছে না, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও পররাষ্ট্রনীতির কার্যকারিতাকেও দুর্বল করছে।
সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফল সেই আশঙ্কারই আরেকটি উদাহরণ। ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে ১১টি দল নেসেটে প্রবেশ করেছে। এর মধ্যে দুটি দল ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্ব করে, যারা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ। নেতানিয়াহুর লিকুদ সবচেয়ে বড় দল হলেও তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরাতে আগ্রহী দলগুলোর সম্মিলিত অবস্থান সংখ্যার বিচারে শক্তিশালী। কিন্তু তাদের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস এতটাই গভীর যে ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
নেতানিয়াহুর বিরোধিতা করলেই ঐক্য তৈরি হয় না
ইসরায়েলের রাজনীতিতে নেতানিয়াহু গত তিন দশক ধরে অত্যন্ত প্রভাবশালী। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর বিভিন্ন মেয়াদে তিনি দীর্ঘ সময় দেশটির সরকার পরিচালনা করেছেন। তাঁর রাজনৈতিক কৌশল, জোট গঠন এবং প্রতিপক্ষকে মোকাবিলার দক্ষতা ইসরায়েলের ক্ষমতার রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
তবে বর্তমান সংকটের ব্যাখ্যা শুধু নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সাফল্য বা ব্যর্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। তাঁর বিরোধী দলগুলোর মধ্যেও এমন বিভাজন রয়েছে, যা তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরানোর সম্ভাবনাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
নেতানিয়াহুর সমর্থক রাজনৈতিক শিবিরের বাইরে থাকা দলগুলোর একটি বড় অংশ আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের প্রশ্নে অস্বস্তিতে রয়েছে। আবার আরব দলগুলোকে বাদ দিয়ে সরকার গঠনের মতো পর্যাপ্ত আসনও তাদের নেই। অর্থাৎ নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলো সংখ্যার বিচারে কাছাকাছি থাকলেও রাজনৈতিক সহযোগিতার প্রশ্নে একে অপরের কাছে যেতে পারছে না।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, নেতানিয়াহুকে সরাতে হলে ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সঙ্গে কি শেষ পর্যন্ত সমঝোতা করতে হবে? আরব দলগুলোর সমর্থন ছাড়া বিরোধী জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন কঠিন। অথচ তাদের সঙ্গে প্রকাশ্য রাজনৈতিক সহযোগিতা করতে অনেক ইহুদি জাতীয়তাবাদী দল অনিচ্ছুক।
সোভিয়েত অভিবাসীদের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ভূমিকা
ইসরায়েলের বর্তমান রাজনৈতিক বিভাজন বুঝতে হলে ১৯৮৯ সালের পর দেশটিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে আসা অভিবাসীদের প্রভাব বিবেচনায় নিতে হবে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর পরবর্তী এক দশকে রাশিয়া ও সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলো থেকে প্রায় ১০ লাখ মানুষ ইসরায়েলে অভিবাসন করেন। তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন ইহুদি। এই অভিবাসনের ফলে ইসরায়েলের জনসংখ্যা ২০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে যায়।
এই বিপুল জনগোষ্ঠী শুধু দেশের জনসংখ্যাগত কাঠামোই বদলে দেয়নি, রাজনীতির ভাষা ও ক্ষমতা সম্পর্কে মানুষের ধারণাতেও পরিবর্তন এনেছে। তাঁদের অনেকে প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও অন্যান্য পেশায় দক্ষতা নিয়ে এসেছিলেন। একই সঙ্গে তাঁরা সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন সোভিয়েত সমাজে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা এবং রাষ্ট্রক্ষমতা সম্পর্কে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি।
তাঁদের অনেকের পরিবার নাৎসি জার্মানির গণহত্যা, স্তালিনের দমন-পীড়ন এবং সোভিয়েত আমলের দীর্ঘ বৈষম্যের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বেঁচে ছিল। একটি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতরে বেড়ে ওঠার কারণে তাঁদের অনেকের কাছে নিরাপত্তা, রাষ্ট্রের শক্তি এবং রাজনৈতিক কর্তৃত্বের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল।
ইসরায়েলি সমাজে এই অভিবাসীদের প্রভাব নিয়ে লিলি গালিলি ও রোমান ব্রনফম্যান ২০১৩ সালে ‘দ্য মিলিয়ন দ্যাট চেঞ্জড দ্য মিডল ইস্ট’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন। বইটি ইংরেজিতে প্রকাশিত না হলেও ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে এর বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ।
সোভিয়েত অভিবাসীদের আগমন এমন এক সময়ে ঘটেছিল, যখন ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে শান্তি আলোচনার পথ তৈরি হচ্ছিল। ১৯৯২ সালের নির্বাচনে তাঁদের একটি বড় অংশ ইয়িৎসহাক রবিনের নেতৃত্বাধীন লেবার পার্টিকে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাঁদের অনেকেই নেতানিয়াহুর লিকুদ এবং অসলো শান্তিচুক্তির বিরোধী ডানপন্থী দলগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়েন।
এর মধ্য দিয়ে ইসরায়েলের রাজনীতিতে নতুন একটি ভোটারগোষ্ঠী শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তাদের রাজনৈতিক অবস্থান শুধু অভিবাসন বা অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; নিরাপত্তা, জাতীয় পরিচয় এবং ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নেও তাদের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে রুশভাষী জনগোষ্ঠী
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে আসা অভিবাসীদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা নিজস্ব দল গঠনের দিকে এগোয়। এই ধারার সবচেয়ে সফল রাজনৈতিক সংগঠন ইসরায়েল বেইতেনু। দলটির প্রতিষ্ঠাতা আভিগদর লিবারম্যানের জন্ম সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মলদোভা প্রজাতন্ত্রে।
ইসরায়েলে বড় অভিবাসন ঢেউ শুরু হওয়ার আগেই তিনি দেশটিতে এসেছিলেন। একসময় নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত লিবারম্যান পরে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সমঝোতার প্রশ্নে তাঁর সঙ্গে বিরোধে জড়ান। ১৯৯৮ সালের ওয়াই রিভার চুক্তির মধ্য দিয়ে শান্তি আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করার যে চেষ্টা হয়েছিল, সেটিকে কেন্দ্র করেও তাঁদের মতবিরোধ প্রকাশ্যে আসে। ১৯৯৫ সালে রবিন হত্যার পর শান্তি প্রক্রিয়া এমনিতেই গভীর সংকটে পড়েছিল।
১৯৯৯ সালে লিবারম্যান ইসরায়েল বেইতেনু প্রতিষ্ঠা করেন। সোভিয়েত-উত্তর অভিবাসীদের রাজনৈতিক সমর্থন কাজে লাগিয়ে দলটিকে একটি নির্বাচনী শক্তিতে পরিণত করেন।
ইসরায়েলের জটিল জোট রাজনীতিতে নেতানিয়াহু ও লিবারম্যানের সম্পর্কও বহুবার বদলেছে। কখনো তাঁরা প্রতিপক্ষ, কখনো আবার মিত্র হয়েছেন। ২০০৯ সালে নেতানিয়াহু সরকারের উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন লিবারম্যান। ২০১৩ সালের নির্বাচনের আগে তাঁর দল লিকুদের সঙ্গে একীভূত হয়। কিন্তু পরের বছরই আবার আলাদা হয়ে যায়।
লিবারম্যানের রাজনৈতিক প্রভাব এখনো রয়েছে। তবে তাঁর দলের সংসদীয় আসনসংখ্যা ২০০৯ সালের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে কমেছে। এবারের নির্বাচনে দলটি মাত্র সাতটি আসন পেয়েছে। তবু জোট গঠনের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নির্বাচনের আগেই তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, আরব-প্রধান দলগুলোর সঙ্গে তিনি সরকার গঠনে রাজি নন। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরও তিনি একই অবস্থান বজায় রেখেছেন। তাঁর দাবি, আরব দলগুলোকে ছাড়াই নতুন সরকার গঠন সম্ভব।
কিন্তু নির্বাচনের সংখ্যাগত বাস্তবতা তাঁর এই অবস্থানকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
আরব ভোটারদের রাজনৈতিক জাগরণ
এবারের নির্বাচনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের ব্যাপক ভোটদান। দুটি আরব রাজনৈতিক তালিকা সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন পেয়েছে, যা তাদের জন্য নজিরবিহীন অর্জন। ২০২২ সালের নির্বাচনে আরব নাগরিকদের ভোটদানের হার ছিল ৫৩ দশমিক ২ শতাংশ। এবারের নির্বাচনে তা বেড়ে প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে।
এই পরিবর্তনকে কেবল কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থন হিসেবে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। আরব ভোটারদের বড় অংশের কাছে নির্বাচন ছিল নিজেদের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার একটি উপায়।
নাজারেথ থেকে প্রকাশিত আরবি ভাষার সংবাদপত্র ‘কুল আল-আরাব’-এর একটি জনমত জরিপে অংশ নেওয়া আরব ভোটারদের প্রায় ৯২ শতাংশ বলেছেন, তাঁদের ভোট দেওয়ার প্রধান কারণ ছিল বেজালেল স্মোত্রিচ ও ইতামার বেন-গভিরের সরকারে থাকার আশঙ্কা। নেতানিয়াহু সরকারের অর্থমন্ত্রী স্মোত্রিচ এবং জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী বেন-গভির—দুজনই ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ মুখ।
এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয়, আরব নাগরিকদের একটি বড় অংশ এবারের নির্বাচনে নিজেদের দৈনন্দিন নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থেকে ভোটকেন্দ্রে গেছেন। অর্থাৎ তাঁদের অংশগ্রহণের পেছনে শুধু প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর আকাঙ্ক্ষা নয়, ক্ষমতায় থাকা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রভাব ঠেকানোর চেষ্টাও কাজ করেছে।
এখানেই ইসরায়েলের বিরোধী দলগুলোর জন্য রাজনৈতিক বাস্তবতা জটিল হয়ে উঠেছে। তারা যদি নেতানিয়াহুকে সরাতে চায় এবং ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে চায়, তাহলে আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ সীমিত। বিশেষ করে অতি-ধর্মীয় দলগুলো যদি নেতানিয়াহুর জোট ছেড়ে না আসে, তাহলে আরব দলগুলোর সমর্থন ছাড়া বিকল্প সংখ্যাগরিষ্ঠতা গঠন করা কঠিন।
সংখ্যালঘু সরকার কি সমাধান হতে পারে?
ইসরায়েলের রাজনৈতিক অচলাবস্থা থেকে বের হওয়ার একটি সম্ভাব্য পথ হতে পারে সংখ্যালঘু সরকার। বিরোধী দলগুলো যদি আরব দলগুলোকে সরাসরি মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করতে না চায়, তাহলে সংসদে আস্থা ও বাজেটসংক্রান্ত বিষয়ে তাদের সমর্থন নিয়ে সরকার পরিচালনার ব্যবস্থা করতে পারে।
এ ধরনের সমঝোতায় আরব দলগুলো সরকারে সরাসরি অংশ না নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় সিদ্ধান্তে সমর্থন দিতে পারে। এতে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করা সম্ভব হতে পারে।
তবে এই পথও ঝুঁকিমুক্ত নয়। ইসরায়েলের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা নিয়ে আপত্তি শুধু নেতানিয়াহুর সমর্থকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিরোধী শিবিরের মধ্যেও এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। ফলে সংসদীয় সমর্থনের ভিত্তিতে সরকার গঠিত হলেও তার স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে।
সরকার গঠনের প্রক্রিয়াও এখনো শেষ হয়নি। নির্বাচিত প্রতিটি দলের নেতা ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের সঙ্গে পৃথকভাবে বৈঠক করছেন। ছোট দল থেকে বড় দল—প্রত্যেকের নেতাই প্রেসিডেন্টকে জানাবেন, কাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়া উচিত বলে তাঁরা মনে করেন। এরপর প্রেসিডেন্ট একজন নেতাকে সরকার গঠনের ম্যান্ডেট দেবেন।
নেতানিয়াহুবিরোধী শিবিরের প্রধান মুখ, সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট এই দায়িত্ব পাওয়ার সম্ভাব্য প্রার্থী। তবে তাঁর মিত্ররা ইতিমধ্যে একটি ‘জায়নবাদী সরকার’ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এই অবস্থান আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার প্রশ্নে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
ইসরায়েলের গণতন্ত্রের কঠিন পরীক্ষা
ইসরায়েলের এবারের নির্বাচন এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রকাশ করেছে, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য শুধু ভোটের হিসাব যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা, যাদের রাজনৈতিক পরিচয়, জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি এবং নিরাপত্তা সম্পর্কে ধারণা পরস্পরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের রাজনীতি ধর্মীয়, জাতিগত, আদর্শিক ও অভিবাসনভিত্তিক বিভাজনের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়েছে। আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা এসব গোষ্ঠীকে সংসদে স্থান দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাদের মধ্যে একটি কার্যকর রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তোলার নিশ্চয়তা দিতে পারেনি।
৭ অক্টোবরের হামলা এবং গাজা যুদ্ধের পর এই সংকট আরও গভীর হয়েছে। নিরাপত্তা ব্যর্থতার জবাবদিহি, যুদ্ধ পরিচালনার মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে ইসরায়েলি সমাজ এখন তীব্রভাবে বিভক্ত। এই বিভাজনের মধ্যে আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণও নতুন গুরুত্ব পেয়েছে।
নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলোর সামনে এখন একটি মৌলিক সিদ্ধান্ত। তারা কি নিজেদের রাজনৈতিক ও আদর্শিক সীমারেখা অতিক্রম করে আরব নাগরিকদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে কাজ করতে পারবে? নাকি নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর আকাঙ্ক্ষা থাকা সত্ত্বেও পুরোনো বিভাজনই তাদের আটকে রাখবে?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু নতুন সরকার গঠনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না। এটি ইসরায়েলের গণতন্ত্রে আরব নাগরিকদের প্রকৃত রাজনৈতিক অবস্থান এবং বহুজাতিক সমাজ হিসেবে দেশটির ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেবে। নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার থাকাই পূর্ণ রাজনৈতিক অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা নয়; সেই ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে প্রস্তুত থাকাও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
ইসরায়েলের সামনে এখন সেই পরীক্ষাই অপেক্ষা করছে।












