যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে আবারও তুমুল বিতর্ক। সম্প্রতি তিনি একটি বর্ণবাদী অনলাইন ভিডিও শেয়ার করে পরে মুছে ফেলেন। ভিডিওটিতে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও মিশেল ওবামাকে অবমাননাকরভাবে উপস্থাপন করা হয়। তবে বিতর্কের আরেকটি দিক ছিল, সেখানে ট্রাম্পকে দেখানো হয় ‘জঙ্গলের রাজা’ হিসেবে। এই ঘটনাকে অনেক বিশ্লেষক দেখছেন তাঁর ক্রমবর্ধমান আত্মপ্রচারের ধারাবাহিক অংশ হিসেবে।
আত্মপ্রচার থেকে ‘ব্যক্তিত্বের পূজা’
দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর ট্রাম্প নিজেকে বিশ্বের একক প্রভাবশালী নেতা হিসেবে তুলে ধরার প্রচেষ্টা আরও জোরদার করেছেন। কখনও রাজা, কখনও অতিমানব, কখনও সামরিক নায়ক—বিভিন্ন প্রতীকী রূপে নিজেকে উপস্থাপন করছেন তিনি। সমালোচকদের মতে, এটি কেবল ব্যক্তিগত অহমিকা নয়, বরং ক্ষমতাকে আরও সুসংহত করার কৌশল।
ইতিহাসবিদদের একাংশ বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এত প্রকাশ্য আত্মমহিমা প্রতিষ্ঠার নজির খুব কম। অতীতে প্রেসিডেন্টরা নিজেদের ভাবমূর্তি গড়ে তুললেও ট্রাম্পের প্রচেষ্টা অনেক বেশি ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং সর্বব্যাপী।
সরকারি স্থাপনায় নাম ও প্রতিকৃতি
হোয়াইট হাউস ও বিভিন্ন ফেডারেল ভবনে ট্রাম্পের ছবি ও নাম ব্যবহারের ঘটনা বেড়েছে। জন এফ কেনেডি পারফর্মিং আর্টস সেন্টারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাঁর নাম খোদাই করা হয়েছে। এমনকি তাঁর সমর্থকদের উদ্যোগে ফ্লোরিডার ডোরালে তাঁর গলফ কমপ্লেক্সে স্থাপনের জন্য স্বর্ণআবৃত ব্রোঞ্জের বিশাল মূর্তি নির্মাণ করা হয়েছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ডন কলোসাস’।
কিছু মিত্র আইনপ্রণেতা তাঁর মুখ যুক্ত করার প্রস্তাব তুলেছেন মাউন্ট রাশমোরে। যদিও সেটি এখনো বাস্তব রূপ পায়নি, তবু প্রস্তাবটিই রাজনৈতিক মহলে আলোড়ন তুলেছে।
ক্ষমতা প্রসারের কৌশল?
প্রেসিডেন্ট ইতিহাসবিদ মাইকেল বেসলসের মতে, এটি নিছক আত্মতৃপ্তি নয়। বরং সর্বত্র উপস্থিত থাকার মাধ্যমে ক্ষমতা আরও বিস্তারের প্রয়াস। তাঁর ভাষায়, একজন প্রেসিডেন্ট যত বেশি দৃশ্যমান, তত বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন—এমন বিশ্বাস থেকেই এই প্রচেষ্টা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, ব্যক্তিত্বনির্ভর রাজনীতি অনুসারীদের নীতির চেয়ে ব্যক্তির প্রতি বেশি অনুগত করে তোলে। এতে নেতা অচ্যুত ও একমাত্র সমাধানদাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। ট্রাম্প অতীতেও বলেছেন, “আমি একাই ঠিক করতে পারি।” আবার শপথ নেওয়ার সময় দাবি করেছিলেন, ঈশ্বর তাঁকে আমেরিকাকে মহান করতে পাঠিয়েছেন।
সমালোচনা ও উদ্বেগ
ট্রাম্পের সাবেক সহকারী সারাহ ম্যাথিউস অভিযোগ করেছেন, সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের বদলে নিজের স্মারক নির্মাণেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন তিনি। তাঁর মতে, এটি দেশসেবার চেয়ে ব্যক্তিগত প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা।
সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন রাজনীতিতে ‘ব্যক্তিত্বের পূজা’ শব্দবন্ধটি আরও বেশি উচ্চারিত হচ্ছে। বিরোধী শিবিরের নেতারা আশঙ্কা করছেন, এতে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হতে পারে এবং কংগ্রেস নির্বাহী শাখার অনুগত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ইতিহাসের তুলনা
অতীতের প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন রাজকীয় সম্বোধন এড়িয়ে ‘মিস্টার প্রেসিডেন্ট’ পরিচয় বেছে নিয়েছিলেন, যাতে গণতান্ত্রিক দৃষ্টান্ত স্থাপন হয়। অধিকাংশ স্মৃতিস্তম্ভ ও স্থাপনার নামকরণ হয়েছে তাঁদের মৃত্যুর পর। জীবিত ও দায়িত্বে থাকা অবস্থায় নিজের নামে স্থাপনা গড়ার উদ্যোগ খুবই বিরল ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট নিজে নামকরণ করলে সেটি ক্ষমতার প্রকাশ; আর জনগণ নামকরণ করলে সেটি সম্মানের প্রতিফলন। এই পার্থক্যই আজকের বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।
গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ প্রশ্নে
রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞান বিষয়ক গবেষকদের একাংশ সতর্ক করে বলেছেন, ব্যক্তিত্বকেন্দ্রিক অনুসারী গোষ্ঠী গণতন্ত্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। এতে নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও আইনের শাসন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাঁদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই সেই পথে অনেক দূর এগিয়ে গেছে।












