যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের একটি কুকুরের পার্কে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে রাজনৈতিক তর্ক কয়েক মিনিটের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়। একে অপরের রাজনৈতিক মতের বিরোধিতা করতে গিয়ে দুই ব্যক্তি প্রথমে বাকবিতণ্ডায় জড়ান, পরে হাতাহাতি এবং শেষ পর্যন্ত গুলিবিনিময়ে ঘটনা গড়ায়। কয়েক মাস পরও সেই ঘটনার ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন দুজনই।
ঘটনাটি ঘটে এপ্রিল মাসে বেইনব্রিজ টাউনশিপের একটি কুকুরের পার্কে। ৫৫ বছর বয়সী ডেভিড ম্যাটাই তার কুকুর ববকে নিয়ে সেখানে গিয়েছিলেন। অন্যদিকে ৮০ বছর বয়সী ইমানুয়েল ‘মাইক’ ম্যাথিউজ তার কুকুর ফ্র্যাঙ্কিকে নিয়ে পার্কে ছিলেন। ম্যাথিউজ অবসরপ্রাপ্ত মাংস ব্যবসায়ী এবং নিয়মিত ওই পার্কে যেতেন।
ঘটনার শুরুটা ছিল রাজনীতি নিয়ে কথোপকথন। ম্যাথিউজের হাতে ছিল ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর একটি কপি। পত্রিকার একটি শিরোনাম দেখে সেখানে থাকা আরেক ব্যক্তি জেমি জেডলিনস্কি ইরান যুদ্ধ নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেন। ম্যাথিউজ তার সঙ্গে একমত হননি এবং ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পক্ষে কথা বলতে শুরু করেন।
তখন সেখানে থাকা ম্যাটাই আলোচনায় যোগ দেন। তিনি ট্রাম্পের কঠোর সমালোচনা করেন। একপর্যায়ে ম্যাটাই বলেন, ট্রাম্প ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ প্রেসিডেন্ট। জবাবে ম্যাথিউজ বলেন, ট্রাম্পই ইতিহাসের সেরা প্রেসিডেন্ট।

এরপর তর্ক দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শী জেডলিনস্কির ভাষ্য অনুযায়ী, দুজনই একে অপরকে চুপ করতে বলছিলেন। তিনি পরে বলেন, দুজনই তখন নিজের জীবন ও চারপাশের নানা বিষয়ে ক্ষুব্ধ ছিলেন এবং এমন একজনের মুখোমুখি পড়েছিলেন, যিনি পাল্টা চিৎকার করছিলেন।
জেডলিনস্কি দুজনকেই বিষয়টি ছেড়ে দিতে বলেন। কিছু সময় পর ম্যাটাই কুকুর ববকে গাড়িতে তুলে পার্ক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু বব আবার পার্কে থাকতে চাওয়ায় তিনি গাড়ি ঘুরিয়ে ফিরে আসেন।
এরপর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। ম্যাটাই ম্যাথিউজকে পার্ক ছেড়ে যেতে বলেন। ম্যাথিউজ গাড়ির দিকে এগিয়ে গিয়ে আবার ফিরে তাকিয়ে তাকে অপমানজনক মন্তব্য করেন। জবাবে ম্যাটাই বেড়ার ওপাশ থেকে ম্যাথিউজের চুল ধরে টান দেন। জেডলিনস্কি দুজনকে আলাদা করে দেন এবং বাড়ি ফিরে যেতে বলেন।
তবে এরপরই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়।
জেডলিনস্কির ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি শুনতে পান ম্যাটাই বলছেন, ‘তোমার কাছে একটা আছে? আমার কাছেও একটা আছে।’ এরপর গুলির শব্দ শোনা যায়।
ম্যাথিউজের গাড়িতে ছিল একটি .৪৫ ক্যালিবারের পিস্তল। তিনি প্রথমে গুলি চালান। দ্বিতীয়বার ট্রিগার চাপলেও গুলি বের হয়নি। অন্যদিকে ম্যাটাইয়ের গাড়িতে থাকা ৯ মিলিমিটারের পিস্তল থেকে অন্তত চারটি গুলি ছোড়া হয়। সেগুলোর কয়েকটি ম্যাথিউজের গাড়ির দরজা ও চালকের আসনে আঘাত করে। অল্পের জন্য তিনি গুলিবিদ্ধ হওয়া থেকে রক্ষা পান।
ম্যাথিউজের গুলি ম্যাটাইয়ের পিঠে আঘাত করে শরীর ভেদ করে বেরিয়ে যায়। গুলিটি তার অন্ত্র ছিন্ন করে মেরুদণ্ডেও গুরুতর আঘাত করে। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে। তার গাড়ির সামনের আসনে তখনও কুকুর বব ছিল।

‘আমি তাকে গুলি করেছি’
গুলি চালানোর পর ম্যাথিউজ গাড়ি নিয়ে দ্রুত পুলিশ স্টেশনের দিকে রওনা হন। পথে পুলিশের একটি গাড়ি দেখতে পেয়ে তিনি থামেন এবং নিজেই জানান যে তিনি গুলির ঘটনায় জড়িত।
পুলিশের দেহে থাকা ক্যামেরায় ধারণ করা কথোপকথনে ম্যাথিউজ বলেন, তিনি মনে করেছিলেন তার জীবন হুমকির মুখে পড়েছে। তার দাবি ছিল, ম্যাটাই তার দিকে এগিয়ে আসছিলেন এবং তখন তিনি আত্মরক্ষার জন্য গুলি চালান।
তবে তিনি প্রথমে কে অস্ত্র বের করেছিলেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। পুলিশকে তিনি জানান, ম্যাটাই শুধু তার চুল ধরেননি, তাকে মাথা দিয়েও আঘাত করেছিলেন। তবে প্রত্যক্ষদর্শী জেডলিনস্কি মাথা দিয়ে আঘাত করার ঘটনা দেখেছেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত নন।
হাসপাতালে ম্যাটাই গুরুতর অবস্থায় ছিলেন। অস্ত্রোপচারের পর তিনি বেঁচে যান, কিন্তু দ্বিতীয়বার অস্ত্রোপচার করতে হয়। প্রায় দুই সপ্তাহ পর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেও তার দীর্ঘ পুনর্বাসনের প্রয়োজন হয়। তিনি হাঁটতে সমস্যায় পড়েন এবং শরীরের ডান পাশে তীব্র ব্যথা ছিল।
ঘটনার পর ম্যাটাই নিজের জীবনেও বড় পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ঘরে থাকা সব ভদকা ফেলে দেন এবং রাজনৈতিক বক্তব্য লেখা বাম্পার স্টিকারগুলোও আবর্জনায় ফেলে দেন। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে আর কারও সঙ্গে রাজনৈতিক মত নিয়ে সংঘাতে জড়াবেন না।
তবে ঘটনার জন্য নিজেরও দায় রয়েছে বলে মনে করেন ম্যাটাই। তার ভাষায়, এই সহিংস ঘটনা তাকে নিজের জীবনযাত্রা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। একই সঙ্গে তিনি ম্যাথিউজের কারাদণ্ড চান।
দুই পক্ষের বিরুদ্ধেই মামলা
ম্যাথিউজের বিরুদ্ধে গুরুতর হামলার অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার সর্বোচ্চ আট বছরের কারাদণ্ড হতে পারে এবং অন্তত তিন বছর কারাগারে কাটানোর বিধান প্রযোজ্য হতে পারে। ৫০ হাজার ডলারের বন্ডে মুক্তি পাওয়ার পর তার পায়ে জিপিএস নজরদারি যন্ত্র লাগানো হয়েছে। তার বিচার ফেব্রুয়ারিতে হওয়ার কথা।
ম্যাথিউজের আইনজীবী আত্মরক্ষার যুক্তি তুলে ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ওহাইওর ২০২০ সালের ‘স্ট্যান্ড ইউর গ্রাউন্ড’ আইনের অধীনে কেউ গুরুতর ও তাৎক্ষণিক বিপদের মুখে পড়লে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের আগে সরে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই—এমন যুক্তিই আদালতে তোলা হতে পারে।
অন্যদিকে ম্যাটাইয়ের বিরুদ্ধেও পরে মামলা হয়েছে। ম্যাথিউজের দেওয়া বক্তব্যের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে হামলা ও বিশৃঙ্খল আচরণের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগে ম্যাটাইয়ের বিরুদ্ধে মাথা দিয়ে আঘাত করার দাবি রয়েছে। তার সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড হতে পারে।
ম্যাটাই অবশ্য জানিয়েছেন, তিনি চুল ধরেছিলেন, কিন্তু মাথা দিয়ে আঘাত করার কথা অস্বীকার করেছেন। পরে তিনি নিজের অতীতের কিছু তথ্য নিয়েও ভুল বা অতিরঞ্জিত বক্তব্য দেওয়ার কথা স্বীকার করেন।
ঘটনার পর স্থানীয় প্রসিকিউটর নিজেকে মামলা থেকে সরিয়ে নেন, কারণ ম্যাথিউজ তার মায়ের সঙ্গে বসবাস করতেন। এরপর অন্য কর্তৃপক্ষকে মামলাটি দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
বদলায়নি কারও রাজনৈতিক মত
এই ঘটনার সবচেয়ে বড় সাক্ষী জেডলিনস্কি। তিনিই দুই ব্যক্তিকে থামানোর চেষ্টা করেছিলেন। গুলির ঘটনায় তিনিও এতটাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন যে কয়েক মাস কুকুরের পার্কে যাননি এবং ঘুমের সমস্যায় ভুগেছেন।
ম্যাটাইও আর তার কুকুর ববকে ওই পার্কে নিয়ে যাননি।
মাস কয়েক পরও জেডলিনস্কির মনে হয়েছে, কয়েক মিনিটের সেই রাজনৈতিক তর্ক দুই পরিবারের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। অথচ যার জন্য এত বড় সংঘর্ষ, সেই রাজনৈতিক মতের জায়গায় শেষ পর্যন্ত কোনো পরিবর্তন আসেনি।
তার উপলব্ধি ছিল, রাজনৈতিক বিভাজন যখন ব্যক্তিগত শত্রুতায় পরিণত হয়, তখন একটি সাধারণ তর্কও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। আর এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় সত্য হলো—গুলির পর দুই ব্যক্তির জীবন বদলে গেলেও কারও রাজনৈতিক অবস্থান বদলায়নি।












