যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে চলে আসা ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হতেই দেশটিতে ব্যবসার সুযোগ খুঁজছেন সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের অনেকে। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনে ভেনেজুয়েলা নীতি, জ্বালানি ও জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার ঘটনায় স্বার্থের সংঘাত এবং ‘রিভলভিং ডোর’ বা সরকারি পদ থেকে বেসরকারি খাতে গিয়ে প্রভাব কাজে লাগানোর ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সাবেক কর্মকর্তাদের জন্য নতুন সুযোগ
ওয়াশিংটনের সাবেক কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা এখন ভেনেজুয়েলার নতুন জ্বালানি বাজারে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, হোয়াইট হাউসে সাম্প্রতিক সময়ে কাজ করা, ভেনেজুয়েলা নীতি সম্পর্কে সরাসরি জ্ঞান থাকা কিংবা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ—এসব দক্ষতার চাহিদা বেড়েছে।
এরই মধ্যে লবিস্ট, পরামর্শক ও দুই প্রধান মার্কিন রাজনৈতিক দলের সাবেক কর্মকর্তারা নতুন ক্লায়েন্ট ও ব্যবসার হয়ে কারাকাসে যেতে শুরু করেছেন।
মাইকেল জেনসেনের নতুন পদ
এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ মাইকেল জেনসেন। ট্রাম্প প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে পশ্চিম গোলার্ধবিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর মে মাসের শেষ দিকে তিনি পদ ছাড়েন। মাত্র তিন দিন পর একটি ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে করে মার্কিন ক্রিপ্টো উদ্যোক্তা ফ্রেড এরশামের সঙ্গে ভেনেজুয়েলায় তেল ব্যবসার সম্ভাবনা দেখতে যান তিনি।
জুনের ১ তারিখে জেনসেন এরশামের নতুন জ্বালানি কোম্পানি প্রিমাভেরায় যোগ দেন। সেখানে তিনি স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও পরিবেশবিষয়ক কার্যক্রমের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করছেন। কোম্পানির দাবি, তার দায়িত্ব সরকারি সম্পর্ক দেখভাল করা নয়; বরং ভেনেজুয়েলায় জ্বালানি অনুসন্ধান শুরু করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, নিরাপত্তা, অর্থ ও মানবসম্পদ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
প্রিমাভেরা এরই মধ্যে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএর সঙ্গে উৎপাদন চুক্তি করেছে।
আরও সাবেক কর্মকর্তা বেসরকারি খাতে
জেনসেন একা নন। ট্রাম্প প্রশাসনের জাতীয় জ্বালানি আধিপত্য পরিষদের সাবেক জ্যেষ্ঠ নীতিবিষয়ক উপদেষ্টা ব্রিটানি কেলম আগস্টে পদ ছেড়ে একটি মার্কিন তেল কোম্পানিতে নীতিবিষয়ক ও বাণিজ্যিক দায়িত্বে যোগ দিয়েছেন। ওই কোম্পানি ভেনেজুয়েলার সরকারের সঙ্গে তেলক্ষেত্র উন্নয়নে চুক্তির আলোচনা করছে।
সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা মাইকা থমাস কেটচেলও প্রশাসন ছাড়ার পর লবিং প্রতিষ্ঠান ব্যালার্ড পার্টনার্সে যোগ দেন। প্রতিষ্ঠানটি ভেনেজুয়েলায় ব্যবসার সুযোগ খুঁজতে থাকা ক্লায়েন্টদের সহায়তা করছে।
এ ছাড়া ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সিআইএ পরিচালক মাইক পম্পেও, সাবেক জ্বালানিমন্ত্রী ড্যান ব্রুইলেট এবং সাবেক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিম্বার্লি ব্রিয়ার ভেনেজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে সার রপ্তানির একটি উদ্যোগে যুক্ত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইন আছে, প্রশ্নও আছে
সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের বেসরকারি খাতে যাওয়ার ক্ষেত্রে ফেডারেল আইনে কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। তারা সরকারের এমন বিষয়ে লবিং করতে পারেন না, যে বিষয়ে দায়িত্ব পালনকালে সরাসরি কাজ করেছেন। কিছু জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ক্ষেত্রে সাবেক দপ্তরকে প্রভাবিত করার ওপর নির্দিষ্ট সময়ের নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে।
জেনসেন, কেলম ও কেটচেলের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, তারা সংশ্লিষ্ট নৈতিকতা ও আইনি বিধিনিষেধ মেনে চলছেন। হোয়াইট হাউসও বলেছে, সাবেক কর্মকর্তাদের জন্য প্রযোজ্য সরকারি চাকরি-পরবর্তী বিধিনিষেধ কার্যকর রয়েছে।
তবে সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের হোয়াইট হাউসের প্রধান নৈতিকতা আইনজীবী রিচার্ড পেইন্টার সতর্ক করেছেন, সরকারি পদ ছাড়ার পর কর্মকর্তাদের নিজেদের যোগাযোগ ও প্রভাব ব্যবহার করে বেসরকারি খাতে সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
ভেনেজুয়েলা এখন নতুন বিনিয়োগের কেন্দ্র
ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প নতুন করে উন্মুক্ত হওয়ায় দেশটি দ্রুত মার্কিন ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও রাজনৈতিক পরামর্শকদের আকর্ষণের কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক লবিং প্রতিষ্ঠান কন্টিনেন্টাল স্ট্র্যাটেজিও ভেনেজুয়েলায় অন্তত এক ডজন ক্লায়েন্টের প্রতিনিধিত্ব করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলা লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে আকর্ষণীয় নতুন বাজারগুলোর একটি হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে একই সঙ্গে সরকারি নীতি প্রণয়ন ও বেসরকারি ব্যবসার মধ্যকার সীমারেখা কতটা স্পষ্ট থাকবে, সাবেক কর্মকর্তাদের নতুন ভূমিকা সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।












