তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বহুল আলোচিত পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে নতুন দফা আলোচনা আগামী বৃহস্পতিবার জেনেভায় পুনরায় শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তি জোরদারের প্রেক্ষাপটে যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়লেও ইরান সরকার কূটনৈতিক অগ্রগতির আশা দেখছে।
তেহরানের আজাদি স্কোয়ারে সাম্প্রতিক সময়ে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি যেমন বেড়েছে, তেমনি রাজনৈতিক উত্তেজনাও স্পষ্ট। এই প্রেক্ষাপটে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, সম্ভাব্য একটি চুক্তির খসড়া নিয়ে কাজ চলছে এবং আলোচনা ফলপ্রসূ হতে পারে।
আলোচনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত
ইরানের শীর্ষ কূটনীতিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, পূর্ববর্তী বৈঠকগুলো ইতিবাচক সংকেত দিয়েছে। তারা মনে করছেন, নতুন করে বসলে চুক্তির মূল কাঠামো চূড়ান্ত করা সম্ভব হতে পারে।
ওমানের মধ্যস্থতায় হওয়া আলোচনা নিয়ে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এবার লক্ষ্য থাকবে দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য পাঠ তৈরি করা। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও সামাজিক মাধ্যমে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে আলোচনার পরিবেশ উৎসাহব্যঞ্জক।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চাপও কম নয়। মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত রণতরী, যুদ্ধবিমান ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়েছে। ওয়াশিংটনের বক্তব্য, ইরান যদি দ্রুত প্রস্তাব দেয় তবে বিস্তারিত আলোচনায় এগোনো সম্ভব।
পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে দ্বন্দ্ব
পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে আশঙ্কা করছে, ইরানের পরমাণু কর্মসূচির আড়ালে অস্ত্র তৈরির চেষ্টা চলছে। যদিও তেহরান বরাবরই তা অস্বীকার করে আসছে এবং বলছে, শান্তিপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদনের অধিকার তাদের রয়েছে।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ইস্যুতে ইরান স্পষ্ট জানিয়েছে, নিজেদের অধিকার তারা নিজেরাই নির্ধারণ করবে। তবে একই সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও নাকচ করা হচ্ছে না।
যুদ্ধের আশঙ্কা ও জনমনে আতঙ্ক
গত বছর ইসরায়েলের বিমান হামলার পর কূটনৈতিক প্রক্রিয়া থমকে গিয়েছিল। পরে সীমিত সময়ের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রও অংশ নেয়। সেই অভিজ্ঞতা এখনও মানুষের মনে তাজা।
তেহরানের বাসিন্দাদের অনেকে নতুন সংঘাতের ভয় প্রকাশ করছেন। কেউ কেউ বলছেন, পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে সামরিক সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।
বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের ইরান ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছে। ফলে উদ্বেগ আরও বেড়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক চাপ
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে গত বছরের শেষ দিকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুত সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, দমন-পীড়নে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
রোববার তেহরানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবারও পক্ষে-বিপক্ষে সমাবেশ হয়েছে। কেউ রাজতন্ত্রের পতাকা উড়িয়েছে, কেউ আবার বিপ্লবপন্থী স্লোগান দিয়েছে। পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, কেবল আন্তর্জাতিক চাপ নয়, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও ইরানের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একই সময়ে ইরাকভিত্তিক কুর্দি-ইরানি কয়েকটি গোষ্ঠী রাজনৈতিক জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। তাদের লক্ষ্য ইসলামী প্রজাতন্ত্রের অবসান ও কুর্দিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি জোরদার করা।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধের আশঙ্কা আর শান্তিচুক্তির প্রত্যাশা—দুটি বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা নতুন মোড় নিতে যাচ্ছে। বৃহস্পতিবারের বৈঠকই ঠিক করবে উত্তেজনা কমবে, নাকি আরও বাড়বে।












