বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারও নিজের জাদু দেখালেন লিওনেল মেসি। আলজেরিয়ার বিপক্ষে দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক করে আর্জেন্টিনাকে জয়ের পথে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডেও ভাগ বসিয়েছেন তিনি। ৩৮ বছর বয়সেও যে তিনি এখনও বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর ফুটবলারদের একজন, সেই বার্তাই যেন আরও একবার স্পষ্ট করে দিলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
বিশ্বকাপে স্বপ্নের সূচনা
ম্যাচের ১৭তম মিনিটে শুরু হয় মেসির জাদু। আলজেরিয়ার রক্ষণভাগের মাঝখানে জায়গা তৈরি করে বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিজের পরিচিত বাঁ পায়ের বাঁকানো শটে বল জালে জড়ান তিনি। গোলরক্ষকের কোনো সুযোগই ছিল না। এই গোলের মধ্য দিয়েই আর্জেন্টিনা এগিয়ে যায় এবং ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয়।
প্রথম গোলটি ছিল মেসির ক্লাসিক ছন্দের প্রতিচ্ছবি। বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া শটে বল এমনভাবে দিক বদলায় যে রক্ষণভাগ ও গোলরক্ষক সবাইকে পরাস্ত করে জালে আশ্রয় নেয়।
তিন গোল, তিন রকম সৌন্দর্য
দ্বিতীয়ার্ধে আসে মেসির দ্বিতীয় গোল। সতীর্থের শট প্রতিহত হওয়ার পর ফিরতি বলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে জালে বল পাঠান তিনি। অভিজ্ঞ স্ট্রাইকারদের মতো সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতারই আরেকটি উদাহরণ ছিল এই গোল।
তৃতীয় গোলটি ছিল ভারসাম্য, নিয়ন্ত্রণ ও নিখুঁত ফিনিশিংয়ের এক অনন্য প্রদর্শনী। বক্সের প্রান্তে বল পেয়ে নিজেকে সামলে নিচু হয়ে নেওয়া শটে বল পাঠিয়ে দেন জালের কোণে। গোলের পর আকাশের দিকে তাকিয়ে দুই হাত উঁচু করে উদযাপন করেন তিনি, যা বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরিচিত দৃশ্যে পরিণত হয়েছে।
রেকর্ডের পাশে মেসির নাম
এই হ্যাটট্রিকের মাধ্যমে বিশ্বকাপে মেসির গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬-তে। ফলে তিনি এখন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসের সমান উচ্চতায় অবস্থান করছেন। বর্তমান ফর্ম বিবেচনায় গ্রুপ পর্বেই এই রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস গড়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল।
ম্যাচ শেষে মেসি বলেন, এটি তার ষষ্ঠ বিশ্বকাপ এবং তিনি এখনও নিজেকে ভালো অবস্থায় অনুভব করছেন। তার মতে, টুর্নামেন্টের শুরুতে জয় পাওয়া সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ।
বয়স শুধু একটি সংখ্যা
মেসির বিশ্বকাপ অভিষেক হয়েছিল ২০০৬ সালে। সেই সময়ের অনেক তারকাই অনেক আগেই অবসর নিয়েছেন। কিন্তু দুই দশক পরও তিনি একই মঞ্চে আলো ছড়াচ্ছেন। তার এই দীর্ঘ পথচলার রহস্য শুধু ফিটনেস নয়, বরং সময়ের সঙ্গে নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলার ক্ষমতা।
এখনকার মেসি আগের মতো দ্রুত নন, কিন্তু খেলার বুদ্ধি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করার দক্ষতায় তিনি এখনও অনন্য। তরুণ সতীর্থরাও তার উপস্থিতি থেকে আত্মবিশ্বাস পায় এবং দলের দায়িত্ব ভাগ করে নেয়।
চাপহীন মেসিই সবচেয়ে ভয়ংকর
ম্যাচে শুধু আক্রমণ নয়, রক্ষণেও দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে মেসিকে। সতীর্থদের জন্য লড়াই করা, রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রতিবাদ জানানো কিংবা প্রয়োজন হলে ট্যাকলে নামা—সবকিছুতেই সক্রিয় ছিলেন তিনি।
বিশ্বকাপের চাপ থেকে মুক্ত হয়ে যখন তিনি আনন্দ নিয়ে ফুটবল খেলেন, তখনই যেন সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে ওঠেন। ম্যাচ শেষে তার হাসিমাখা মুখে সেই তৃপ্তির ছাপই ছিল স্পষ্ট।
দুই দশক আগে বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু করা ফুটবলারটি এখনও বিশ্ব ফুটবলের কেন্দ্রবিন্দু। আরেকটি বিশ্বকাপের শুরুতেই তিনি মনে করিয়ে দিলেন, ফুটবল এখনও অনেকটাই মেসির সময়েই চলছে।












