২০২৬ সালের ব্রিকস সম্মেলন ঘিরে ভারতে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে নৈশভোজের খাবারের তালিকা নিয়ে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আয়োজিত সম্মেলনের জমকালো নৈশভোজে সম্পূর্ণ নিরামিষ খাবার পরিবেশন করা হয়। এরপর বিরোধী দলগুলোর নেতারা অভিযোগ করেন, ভারতের বৈচিত্র্যময় খাদ্যসংস্কৃতির পুরো চিত্র এই আয়োজনে তুলে ধরা হয়নি।
নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে আয়োজিত এই নৈশভোজে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের খাবার দিয়ে সাজানো হয় বহু পদ। তবে তালিকায় কোনো মাংস, মুরগি, মাছ বা অন্য কোনো আমিষ খাবার রাখা হয়নি। ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) অবশ্য এই সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। দলটির নেতাদের দাবি, বিদেশি অতিথিরা ভারতীয় নিরামিষ খাবারের স্বাদ, পুষ্টিগুণ এবং আঞ্চলিক বৈচিত্র্য উপভোগ করেছেন।
নৈশভোজে কী কী খাবার ছিল
নৈশভোজের শুরুতে পরিবেশন করা হয় খান্ডভি মিলেট ও খুম্ব গালৌটি। এরপর ছিল পনির লাবাবদার, গুচ্ছি মারমিক, ক্যারট বিন পোরিয়াল ও থাক্কালি বেলে সারু। সঙ্গে ছিল মিলেট পোলাও, বিটরুট রায়তা এবং বিভিন্ন ধরনের ভারতীয় রুটি।
মিষ্টান্নের তালিকায় ছিল পুরনো দিল্লির ফল ক্রিমের সঙ্গে জিলাপি এবং শাহতুত ফিরনি।
আমিষ খাবার না থাকায় বিরোধীদের প্রশ্ন
নৈশভোজে আমিষ খাবার না থাকায় কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলোর নেতারা সরকারের সমালোচনা করেন। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ভারতের বিপুলসংখ্যক মানুষের আমিষ খাবার খাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি ভারতের দীর্ঘদিনের আমিষ খাদ্যসংস্কৃতির কথাও উল্লেখ করেন।
কংগ্রেস নেতা পবন খেরা অভিযোগ করেন, বিজেপি নিজেদের খাদ্যাভ্যাসের পছন্দ ভারতের মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাঁর দাবি, আন্তর্জাতিক অতিথিদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পছন্দ চাপিয়ে দিয়ে ভারতীয় সংস্কৃতির একটি বড় অংশকে আড়াল করা হয়েছে।
খেরা বলেন, ভারত একটি সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় দেশ, যেখানে বিভিন্ন ধরনের খাবারের পাশাপাশি বিশ্বের জনপ্রিয় বহু আমিষ পদও রয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক অতিথিদের সামনে সেই বৈচিত্র্য তুলে ধরা হলো না কেন।
অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের নেতা ওয়ারিস পাঠানও একই ধরনের সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, মাটন, মুরগি ও মাছ ভারতের খাদ্যপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিদেশি নেতাদের জন্য হায়দরাবাদি বিরিয়ানি, বাটার চিকেন কিংবা গোয়ার মাছের তরকারির মতো খাবারও রাখা যেতে পারত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
কূটনৈতিক বার্তা নিয়েও প্রশ্ন
খাবারের বিতর্কের পাশাপাশি নৈশভোজে কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার অনুপস্থিতিও আলোচনায় এসেছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের নৈশভোজে উপস্থিত না থাকার বিষয়টিও বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়েছে।
সাবেক সংসদ সদস্য ও আমলা জওহর সরকার সম্পূর্ণ নিরামিষ খাবারের আয়োজনকে কূটনৈতিকভাবে ভুল সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেন। তিনি এটিকে ঈশপের ‘শিয়াল ও সারস’ গল্পের সঙ্গে তুলনা করেন।
তিনি ২০১০ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের দেওয়া একটি রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের উদাহরণও তুলে ধরেন। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সম্মানে আয়োজিত নৈশভোজে নিরামিষ ও আমিষ—দুই ধরনের খাবারই রাখা হয়েছিল।
তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মহুয়া মৈত্রও বিষয়টি নিয়ে রসিকতা করেন। তিনি ইঙ্গিত দেন, বিদেশি অতিথিরা চাইলে স্থানীয় খাবারের দোকানে গিয়ে বুরা কাবাবের মতো খাবার খেয়ে নিতে পারেন।
শিবসেনা-উদ্ধব বালাসাহেব ঠাকরে দলের নেতা প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী বলেন, এত বড় আন্তর্জাতিক আয়োজনের ক্ষেত্রে অতিথিদের বিভিন্ন খাদ্যপছন্দের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল। তাঁর মতে, বিভিন্ন ধরনের খাবারের ব্যবস্থা করা ভারতের ‘অতিথি দেবো ভব’ ধারণার সঙ্গেও বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো।
বিজেপির পাল্টা যুক্তি
বিরোধীদের সমালোচনা অবশ্য সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে বিজেপি। দলটির নেতারা বলেন, বিরোধীরা ব্রিকস সম্মেলনের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি আন্তর্জাতিক আয়োজনের মূল বিষয় থেকে মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে খাবার নিয়ে রাজনীতি করছে।
সংসদবিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বলেন, কংগ্রেস খাবার নিয়ে রাজনীতি করছে দেখে তিনি বিস্মিত। তাঁর দাবি, বিদেশি অতিথিরা ভারতীয় নিরামিষ খাবারের স্বাদ, পুষ্টির বৈচিত্র্য এবং বিভিন্ন অঞ্চলের খাদ্যঐতিহ্য উপভোগ করেছেন।
বিজেপির মুখপাত্র প্রদীপ ভান্ডারি বলেন, বিরোধীদের সমালোচনার বিষয় যদি শেষ পর্যন্ত খাবারের তালিকাতেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সেটি সম্মেলনের সফলতারই ইঙ্গিত দেয়। তাঁর অভিযোগ, ভারতের ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক প্রভাব নিয়ে কংগ্রেস অসন্তুষ্ট।
আরেক বিজেপি মুখপাত্র তুহিন সিনহা বিরোধীদের মন্তব্যকে ‘তুচ্ছ ও গুরুত্বহীন’ বলে অভিহিত করেন। তাঁর দাবি, প্রধানমন্ত্রী মোদি ব্রিকস সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ইস্যুতে ঐকমত্য তৈরি করেছেন এবং নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
ব্রিকস নৈশভোজের খাবারের তালিকা নিয়ে এই বিতর্ক তাই শুধু খাবারের পছন্দ-অপছন্দে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ভারতের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, খাদ্যাভ্যাস, অতিথি আপ্যায়নের ধরন এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে রাষ্ট্রীয় আয়োজনের বার্তা—সবকিছুই নতুন করে আলোচনায় এসেছে।












