রাজশাহী রেলস্টেশনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) এক শিক্ষার্থীকে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা মারধর করেছেন—এমন অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা। রাজশাহীর সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকায় ঢাকাগামী ধূমকেতু এক্সপ্রেসের যাত্রা বাতিল করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানেও আটকা পড়েছে কয়েকটি ট্রেন।
রোববার রাত পৌনে ১২টার দিকে রাজশাহী রেলস্টেশনে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হয়। রাত দেড়টা পর্যন্ত চলা বিক্ষোভের একপর্যায়ে স্টেশনের বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর চালানো হয়। এতে যাত্রীদের বসার বেঞ্চ, বিভিন্ন কক্ষের দরজা-জানালা এবং ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, রোববার রাত ৯টার দিকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী আইয়ুব আলী তাঁর চাচাকে নিতে রাজশাহী রেলস্টেশনে যান। তখন ইংরেজি বিভাগের দুই শিক্ষার্থীর সঙ্গে রেলওয়ের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সদস্যদের কথা-কাটাকাটি চলছিল। সেখানে আইয়ুব আলী গেলে তাঁকেও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা।
পরে আহত আইয়ুব আলীকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছের রেলস্টেশনে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেন। পরে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী রাজশাহী রেলস্টেশনে গিয়ে অবস্থান নেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
বাতিল ধূমকেতু এক্সপ্রেস, পথে আটকা আরও ট্রেন
ভাঙচুরের কারণে রাত ১১টা ২০ মিনিটে রাজশাহী থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকা ধূমকেতু এক্সপ্রেসের যাত্রা বাতিল করা হয়। একই সময়ে রাজশাহীর দিকে আসা দুটি ট্রেন হরিয়ান স্টেশনে এবং আরেকটি ট্রেন সারদা একাডেমি স্টেশনে অবস্থান নেয়।
ফলে ওই ট্রেনগুলোর যাত্রীরাও দুর্ভোগে পড়েন। রাজশাহী স্টেশনে আটকা পড়া যাত্রীদের অনেকেই কখন ট্রেন চলাচল শুরু হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য না পেয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেন। বিশেষ করে ঢাকাগামী যাত্রীদের ভোগান্তি ছিল বেশি।
ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দেয়। অনেকে নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তায় পড়েন।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই ট্রেন চালানোর সিদ্ধান্ত
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থী ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টার বৈঠকে বিভাগীয় কমিশনার, পশ্চিমাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে দ্রুত রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক করার বিষয়ে আলোচনা হয়। তবে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও স্টেশনের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ট্রেন চালানোর বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নেয় রেল কর্তৃপক্ষ।
পশ্চিমাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপক আহম্মদ হোসেন মাসুম বলেন, রেল চলাচল স্বাভাবিক করার জন্য তাঁরা প্রস্তুত রয়েছেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে যাত্রীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ট্রেন চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তদন্তের আশ্বাস প্রশাসনের
রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, পুরো ঘটনা তদন্ত করা হবে। শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগের সত্যতা, ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং কী কারণে পরিস্থিতির এতটা অবনতি হলো—তদন্তের মাধ্যমে এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে।
এদিকে শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগে অভিযুক্ত রেলওয়ের চার সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে রেল বিভাগ। তদন্তের ভিত্তিতে তাঁদের বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তবে শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগের তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি রেলস্টেশনে ভাঙচুরের ঘটনাও এখন আলোচনায় এসেছে। স্টেশনের সরকারি সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত করার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
একটি শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ শেষ পর্যন্ত রাজশাহীর সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। ফলে ঘটনার বিচার যেমন দ্রুত নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে, তেমনি রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক করে সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ দ্রুত কমানোরও দাবি জোরালো হচ্ছে।












