একসময় নিজের দেশেই ছিল তার ঘর, পরিবার, ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা স্বপ্ন। কিন্তু পরিচয়, নাগরিকত্ব ও অধিকারহীনতার কারণে সেই স্বাভাবিক জীবন ধীরে ধীরে তার কাছে অসম্ভব হয়ে ওঠে। এরপর আসে ভয়াবহ সহিংসতা, প্রাণ বাঁচানোর জন্য দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত এবং সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার কঠিন পথ।
তিনি মোহাম্মদ আসেম। ২০১৭ সালে মাত্র ১০ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আসেন। সেই পালানোর পথেই তিনি দেখেছেন গুলিতে মানুষ মারা যেতে, নাফ নদীতে শিশুদের মরদেহ ভেসে থাকতে এবং নিজের পরিবারের সদস্যদের প্রাণ নিয়ে পালাতে।
আজ সেই শিশুটি একজন রোহিঙ্গা তরুণ কর্মী, মানবাধিকারকর্মী এবং তরুণদের সংগঠক। নিজের জীবনের দীর্ঘ বঞ্চনা তাকে থামিয়ে দেয়নি। বরং রাষ্ট্রহীনতার যন্ত্রণা ও বাস্তুচ্যুত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি অন্য রোহিঙ্গা তরুণদের জন্য কাজ করার পথ বেছে নিয়েছেন।
নাগরিকত্ব হারানোর শুরু
মোহাম্মদ আসেমের ভাষ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর বৈষম্য বহু বছর ধরে চলে আসছে। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন এই সংকটকে আরও গভীর করে। ওই আইনের পর রোহিঙ্গারা কার্যত মিয়ানমারের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়েন। এর ফলে স্বাধীনভাবে চলাফেরা, সরকারি শিক্ষায় অংশগ্রহণ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা এবং নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মতো মৌলিক অধিকারও তাদের জন্য সীমিত হয়ে যায়।
এই রাষ্ট্রহীনতার পরিস্থিতি লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার হিসাবে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।
আসেমও তাদের একজন।
২০১৭ সালের সেই ভয়াবহ পালানো
২০১৭ সালে মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়ন চরম আকার ধারণ করলে আসেমের পরিবারও দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
তখন তার বয়স মাত্র ১০ বছর।
পরিবারের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার সময় নাফ নদীর কাছে তিনি এমন দৃশ্য দেখেন, যা একটি শিশুর মনে সারাজীবনের জন্য দাগ কেটে যাওয়ার মতো। সীমান্ত পেরিয়ে নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করা মানুষদের ওপর গুলি চালানো হচ্ছিল। নদীতে ভেসে ছিল প্রাণ হারানো রোহিঙ্গা শিশুদের মরদেহ।
তাদের পরিবারও গুলির মুখে পড়ে। মিয়ানমারের একটি গ্রাম থেকে নদী পেরিয়ে বঙ্গোপসাগরের দিকে যাওয়ার সময় তাদের লক্ষ্য করেও গুলি ছোড়া হয়। ভাগ্যক্রমে তারা প্রাণে বেঁচে বাংলাদেশে পৌঁছাতে সক্ষম হন।
কিন্তু সীমান্ত পেরিয়েই সব বিপদ শেষ হয়নি।
শাহপরীর দ্বীপে এক রাত
দীর্ঘ ও ভয়াবহ পথ পেরিয়ে পরিবারটি বাংলাদেশের শাহপরীর দ্বীপে পৌঁছায়। কিন্তু সেখানেও তাদের অপেক্ষা করতে হয়।
বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীরা প্রথমে তাদের দেশে ঢুকতে দেয়নি। প্রয়োজনীয় খাবার, পানি কিংবা আশ্রয়ের মতো মৌলিক সুবিধা ছাড়াই দ্বীপটিতে একটি রাত কাটাতে হয় পরিবারটিকে।
পরদিন শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি পায় তারা।
এরপর তাদের নতুন ঠিকানা হয় কক্সবাজারের কুতুপালং শরণার্থী শিবির।
নিরাপত্তার দিক থেকে সেটি মিয়ানমারের সহিংসতার চেয়ে ভালো ছিল। কিন্তু সেটিও ছিল স্বাভাবিক জীবনের সম্পূর্ণ বিপরীত এক বাস্তবতা।
শিবিরে শুরু নতুন সংগ্রাম
কুতুপালংয়ে পৌঁছানোর পর আসেমের পরিবারকে সীমিত খাবার, পোশাক, ওষুধ ও স্যানিটারি সামগ্রী নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়েছে। অস্থায়ী ও দুর্বল আশ্রয়ে দিন কাটাতে হয়েছে।
মিয়ানমার থেকে পালানোর সময় তারা নানা রোগ ও আঘাতের শিকার হয়েছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন।
একপর্যায়ে আসেমের এক ভাই প্রায় মৃত্যুর মুখে পড়ে। কয়েক দিন ধরে চিকিৎসার জন্য সাহায্য খোঁজার পর শেষ পর্যন্ত তার জন্য প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে সক্ষম হন আসেম। ধীরে ধীরে তার ভাই সুস্থ হয়ে ওঠেন।
কিন্তু শারীরিক নিরাপত্তা ফিরে পেলেও আসেমের সামনে তখন আরও একটি বড় প্রশ্ন—তার ভবিষ্যৎ কী?
পড়াশোনার স্বপ্নও থেমে যায়
একটি স্বাভাবিক জীবনে ১১ বছর বয়সী একটি শিশুর চিন্তা হওয়ার কথা—কোন স্কুলে পড়বে, কী বিষয় নিয়ে পড়বে, বড় হয়ে কী হবে।
আসেমের ক্ষেত্রেও স্বপ্ন ছিল তেমনই।
কিন্তু শরণার্থী শিবিরের বাস্তবতা তাকে সেই স্বপ্ন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। সেখানে নিয়মিত শিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত।
২০১৯ সালে তিনি একটি বেসরকারি সংস্থার পরিচালিত শিক্ষাকেন্দ্রে ভর্তি হন। সেখানে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা দেওয়া হলেও সেটি মিয়ানমারের নিয়মিত স্কুলের পাঠ্যক্রমের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। ফলে উচ্চশিক্ষার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার সুযোগও তৈরি হচ্ছিল না।
পরে তিনি শিবিরের একটি রোহিঙ্গা কমিউনিটি স্কুলে ভর্তি হন। সেখানে রোহিঙ্গা শিক্ষকরা মিয়ানমারের পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে পড়াতেন। আসেমের আশা ছিল, একদিন শিবিরের বাইরে গিয়ে মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থায় যুক্ত হতে পারবেন।
কিন্তু রাষ্ট্রহীনতার পরিচয় আবারও তার সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়।
বৃত্তি পেয়েও তুরস্কে যাওয়া হলো না
২০২৩ সালে আসেমের সামনে আসে জীবনের বড় একটি সুযোগ। তুরস্কে পড়াশোনার জন্য তিনি সুযোগ পেয়েছিলেন।
কিন্তু সেই সুযোগ গ্রহণ করতে প্রয়োজন ছিল একটি পাসপোর্ট।
রোহিঙ্গা হিসেবে তার সেই পাসপোর্ট পাওয়ার সুযোগ ছিল না। মিয়ানমার কিংবা বাংলাদেশ—কোনো দেশেই রোহিঙ্গারা সহজে নাগরিকত্ব পাওয়ার অবস্থানে নেই।
আসেমের কাছে মিয়ানমারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের একটি সনদও ছিল। কিন্তু বৃত্তি মূল্যায়ন কমিটি তার রাষ্ট্রহীন পরিচয়ের কারণে সেই সনদ গ্রহণ করেনি।
ফলে যে সুযোগের জন্য তিনি কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন, সেটিও হাতছাড়া হয়ে যায়।
একজন তরুণের কাছে এটি শুধু একটি বৃত্তি হারানোর ঘটনা ছিল না। এটি ছিল রাষ্ট্রহীনতার কারণে ভবিষ্যতের আরও একটি দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা।
বঞ্চনা থেকেই শুরু নেতৃত্বের পথ
বারবার শিক্ষা ও কাজের সুযোগ হারাতে হারাতে আসেম বুঝতে পারেন, তার ব্যক্তিগত সমস্যাটি আসলে হাজার হাজার রোহিঙ্গা তরুণের একই বাস্তবতা।
রাষ্ট্রহীন পরিচয় তাদের সামনে শুধু নাগরিকত্বের সংকট তৈরি করে না; শিক্ষা, চাকরি, চলাফেরা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগও সীমিত করে দেয়।
এই অভিজ্ঞতাই আসেমকে একজন তরুণ অধিকারকর্মী ও মানবাধিকারকর্মী হিসেবে গড়ে তোলে।
তিনি বুঝতে পারেন, নিজের জন্য পথ তৈরি করার পাশাপাশি তার মতো অন্য তরুণদের জন্যও কথা বলা প্রয়োজন।
‘আরাকানি ইয়ুথ ইনোভেশন’ প্রতিষ্ঠা
২০২৫ সালের জুলাইয়ে আসেম ‘আরাকানি ইয়ুথ ইনোভেশন’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।
এর লক্ষ্য রোহিঙ্গা তরুণদের ক্ষমতায়ন, তাদের সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং নতুন চিন্তা ও উদ্ভাবনের সুযোগ তৈরি করা।
সংগঠনটি তরুণ নারী ও পুরুষদের শান্তিপূর্ণ আলোচনায় যুক্ত করে। শরণার্থী শিবিরে রোহিঙ্গাদের যেসব সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয় এবং সম্মিলিতভাবে সম্ভাব্য সমাধান খোঁজার চেষ্টা করা হয়।
আসেমের কাছে এটি শুধু একটি সংগঠন নয়। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত করার একটি প্রচেষ্টা।
তার বিশ্বাস, রোহিঙ্গা তরুণদের অনেকেই ভবিষ্যতে নিজেদের সম্প্রদায়ের নেতা হতে চান। কিন্তু রাষ্ট্রহীনতার পরিচয় বারবার তাদের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
মিয়ানমারে ফেরার স্বপ্ন আরও দূরে
রোহিঙ্গাদের জন্য ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে দেশজুড়ে সংঘাত বেড়েছে এবং রাখাইন রাজ্যেও নতুন করে ক্ষমতার লড়াই তৈরি হয়েছে।
২০২৪ সালে আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যের বড় একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ নেয়। রোহিঙ্গাদের ওপর এই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও নির্যাতন ও নিপীড়নের অভিযোগ রয়েছে।
ফলে যে দেশে জন্ম, সেই দেশে নিরাপদ ও অধিকারসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে ফিরে যাওয়ার রোহিঙ্গাদের আশা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
তবু হাল ছাড়েননি আসেম
মোহাম্মদ আসেমের জীবনের গল্প তাই শুধু একজন শরণার্থীর গল্প নয়। এটি রাষ্ট্রহীনতার কারণে একজন তরুণের হারিয়ে যাওয়া সুযোগের গল্প, আবার সেই বঞ্চনার মধ্য থেকেই নতুন করে পথ খুঁজে নেওয়ার গল্প।
১০ বছর বয়সে তিনি দেখেছিলেন মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। নদীতে দেখেছিলেন মৃত শিশুদের মরদেহ। শরণার্থী শিবিরে এসে দেখেছেন চিকিৎসার অভাব, শিক্ষার সংকট এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
পড়াশোনার সুযোগ পেয়েও রাষ্ট্রহীন পরিচয়ের কারণে বিদেশে যেতে পারেননি। নিজের যোগ্যতার প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও সেই পরিচয় তার সামনে দরজা বন্ধ করেছে।
কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাই তাকে অন্যদের জন্য কথা বলার শক্তি দিয়েছে।
আজ তিনি রোহিঙ্গা তরুণদের সংগঠিত করছেন, তাদের কণ্ঠ তুলে ধরছেন এবং তাদের সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কাজ করছেন।
তার গল্প মনে করিয়ে দেয়—একটি মানুষকে রাষ্ট্রহীন করে দেওয়া মানে শুধু তার নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া নয়; এর সঙ্গে কেড়ে নেওয়া হয় শিক্ষা, কাজ, চলাফেরা, নিরাপত্তা এবং নিজের ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার অসংখ্য সুযোগ।
তবু সবকিছু হারিয়েও স্বপ্ন দেখা যায়। আর সেই স্বপ্ন থেকেই হয়তো একদিন জন্ম নিতে পারে একটি নতুন ভবিষ্যৎ—যেখানে রোহিঙ্গা তরুণদের পরিচয় তাদের সম্ভাবনার পথে আর বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।
মোহাম্মদ আসেম একজন রোহিঙ্গা তরুণ অধিকারকর্মী, মানবাধিকারকর্মী এবং ‘আরাকানি ইয়ুথ ইনোভেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা।












