যুক্তরাষ্ট্রে কাজের সুযোগকে দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দক্ষ পেশাজীবীদের কাছে স্বপ্নের মতো মনে করা হয়েছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতে উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ বিদেশি কর্মীদের জন্য এইচ-১বি ভিসা ছিল যুক্তরাষ্ট্রে ক্যারিয়ার গড়ার অন্যতম প্রধান পথ। কিন্তু গত এক বছরে এই ভিসাব্যবস্থাকে ঘিরে তৈরি হওয়া নানা অনিশ্চয়তা ও পরিবর্তন আন্তর্জাতিক কর্মীদের একটি অংশকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
ব্যবসা ও প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম বিজনেস ইনসাইডারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১২ মাসের নানা ঘটনা বিদেশি কর্মীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কঠিন করে তুলেছে। ফলে কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্রে থেকে যাওয়ার বদলে অন্য দেশে যাওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করছেন। তাদের কাছে এখন প্রশ্ন শুধু ভালো চাকরি পাওয়া নয়; বরং কোন দেশে দীর্ঘমেয়াদে স্থিরভাবে বসবাস, কাজ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা সম্ভব হবে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এইচ-১বি ভিসা মূলত নির্দিষ্ট দক্ষতার পেশায় বিদেশি কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করার সুযোগ দেয়। প্রযুক্তি, প্রকৌশল, গবেষণা ও অন্যান্য বিশেষায়িত ক্ষেত্রে এই ভিসার ব্যবহার ব্যাপক। বহু আন্তর্জাতিক কর্মী এই ভিসার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে চাকরি শুরু করার পর স্থায়ীভাবে সেখানে বসবাসের পথও তৈরি করার চেষ্টা করেন।
কিন্তু গত এক বছরে এই ব্যবস্থাকে ঘিরে পরিবর্তন ও অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় কর্মীদের পরিকল্পনায় প্রভাব পড়েছে। একটি চাকরি, একটি ভিসা এবং ভবিষ্যতে স্থায়ী বসবাসের সম্ভাবনা—এই পুরো ধারাবাহিকতা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি অনিশ্চিত মনে করছেন অনেকে।
বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতের বিদেশি কর্মীদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এই খাতে অনেক কর্মী আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারে কাজ করেন এবং তাদের দক্ষতার চাহিদা একাধিক দেশেই রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে কাজের পরিবেশ ও অভিবাসন নীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়লে কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ কিংবা এশিয়ার প্রযুক্তিকেন্দ্রিক শহরগুলোও বিকল্প হিসেবে সামনে আসতে পারে।
এ পরিবর্তনের আরেকটি দিক হলো, কর্মীরা এখন শুধু বেতন বা চাকরির সুযোগ দিয়ে দেশ বাছাই করছেন না। ভিসার স্থায়িত্ব, পরিবারকে সঙ্গে নেওয়ার সুযোগ, ভবিষ্যতে স্থায়ীভাবে বসবাসের সম্ভাবনা, সন্তানদের শিক্ষা এবং চাকরি হারালে নতুন করে কাজ পাওয়ার সুযোগ—সবকিছু মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।
একসময় যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ বেতনের প্রযুক্তি চাকরি পাওয়াই অনেক বিদেশি কর্মীর কাছে বড় লক্ষ্য ছিল। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা তৈরি হলে সেই হিসাব বদলে যেতে পারে। একই দক্ষতার জন্য অন্য কোনো দেশে তুলনামূলক কম বেতন পাওয়া গেলেও যদি সেখানে অভিবাসনব্যবস্থা বেশি পূর্বানুমানযোগ্য হয়, তাহলে কিছু কর্মী সেটিকে বিবেচনায় নিতে পারেন।
এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের জন্যও একটি বড় প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে—বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সবচেয়ে দক্ষ কর্মীদের আকর্ষণ করার ক্ষেত্রে দেশটি আগের মতোই প্রতিযোগিতামূলক থাকবে কি না।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বিদেশি কর্মীরা ব্যাপক হারে যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে যাচ্ছেন। বরং গত এক বছরের অভিজ্ঞতা অনেক কর্মীকে ভবিষ্যতের জন্য বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করতে উৎসাহিত করছে। কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্রে থেকেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন, আবার কেউ অন্য দেশে চাকরির সুযোগ খুঁজছেন।
বিদেশি কর্মীদের এই পুনর্বিবেচনার মধ্যে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে। আগে অনেকের কাছে ‘আমেরিকান ড্রিম’ বলতে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ভালো চাকরি, উচ্চ আয় এবং ধীরে ধীরে স্থায়ী জীবন গড়ে তোলাকে বোঝানো হতো। এখন সেই স্বপ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বিষয়—সেখানে ভবিষ্যৎ কতটা অনুমানযোগ্য।
বিশ্বের প্রযুক্তি ও ব্যবসা খাতও একই সময়ে দ্রুত বদলাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, দূরবর্তী কাজ এবং আন্তর্জাতিকভাবে কর্মী নিয়োগের সুযোগ বাড়ায় একজন দক্ষ কর্মীর জন্য নির্দিষ্ট একটি দেশের ওপর নির্ভরতা আগের তুলনায় কমেছে। ফলে অভিবাসননীতি ও কর্মসংস্থানের পরিবেশ বদলালে কর্মীদের হাতে বিকল্পও রয়েছে।
সব মিলিয়ে, গত এক বছরের এইচ-১বি-সংক্রান্ত অস্থিরতা বিদেশি কর্মীদের সামনে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানের কেন্দ্র হলেও, আন্তর্জাতিক কর্মীদের একটি অংশ এখন সেখানে যাওয়ার পাশাপাশি অন্য সম্ভাবনাগুলোর দিকেও তাকাচ্ছেন। ‘আমেরিকান ড্রিম’ তাই শেষ হয়ে যাচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই; তবে সেই স্বপ্নের পথে যাওয়ার আগে ঝুঁকি, ভিসা ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার হিসাব আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।












