মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তেজনা, যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যিক টানাপোড়েন এবং তাইওয়ান ইস্যুতে গভীর মতপার্থক্যের মধ্যেই মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ২৪ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে শির রাষ্ট্রীয় সফরকে ঘিরে তাই আলোচনার প্রত্যাশা অনেক। তবে বড় কোনো ঐতিহাসিক চুক্তির বদলে সীমিত ও স্বল্পমেয়াদি সমঝোতার দিকেই দুই দেশের অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থা, আন্তসীমান্ত বিনিয়োগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ এবং তাইওয়ানের অবস্থান—সবই ট্রাম্প-শি বৈঠকের আলোচনায় আসতে পারে। এক দশকেরও বেশি সময় পর এটি যুক্তরাষ্ট্রে শির প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর। চীনা বড় ব্যবসায়ী ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন নির্বাহীও তাঁর সঙ্গে ওয়াশিংটনে আসতে পারেন। অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রযুক্তি ও আর্থিক খাতের শীর্ষ ব্যক্তিদের উপস্থিতি থাকার কথা।
বড় চুক্তি কেন কঠিন
দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র বাণিজ্য। সেমিকন্ডাক্টর ও বিরল খনিজ—দুটি ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের হাতে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এই পারস্পরিক নির্ভরতা গত কয়েক বছর ধরে দুই দেশের মধ্যে এক ধরনের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক সমঝোতা তৈরি করেছে।
বর্তমান বাণিজ্যিক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ১০ নভেম্বর। এর আগে দুই দেশ গত মে মাসে এই সমঝোতা বাড়িয়েছিল। কিন্তু বাণিজ্য ভারসাম্যের মূল সমস্যাগুলো এখনো সমাধান হয়নি। ২০২৫ সালে চীন থেকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য আমদানি ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে ৩০৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। তবু চীনে উৎপাদিত অনেক পণ্য তৃতীয় দেশের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ঢুকছে।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করে, ৪০টিরও বেশি দেশ তৃতীয় দেশের মাধ্যমে পণ্য পাঠিয়ে চীনের পণ্যকে মার্কিন শুল্ক এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। এর পরিমাণ বছরে প্রায় ৭৫ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। তবে আগের দফায় তিন অঙ্কের শুল্ক আরোপ করে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, তা দুই দেশই দ্রুত কমিয়ে এনেছিল। ফলে এবার কেউই আবার সেই মাত্রার সংঘাতে যেতে খুব আগ্রহী নয়।
ট্রাম্পও আপস চান, কিন্তু রাজনৈতিক বাধা আছে
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক কিছুটা সহজ করার বিষয়ে ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে আগ্রহী হতে পারেন। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, চীনা গাড়ি নির্মাতারা যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা তৈরি করে স্থানীয় কর্মীদের নিয়োগ দিলে তিনি তাতে আপত্তি করবেন না।
কিন্তু এখানেই বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি রয়েছে। ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের অনেকেই এবং মার্কিন গাড়ি নির্মাতারা চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রবেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারেন। এমনকি কংগ্রেসে চীনা গাড়ির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরও শক্ত করার দাবিও উঠতে পারে। অন্যদিকে চীনা কোম্পানিগুলোও যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা স্থাপনের আগে দীর্ঘমেয়াদি ও নির্ভরযোগ্য নিশ্চয়তা চাইবে, যাতে ভবিষ্যতে হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্তে তাদের কারখানা বন্ধ হয়ে না যায়।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে। ডেমোক্র্যাটরা নির্বাচনে বড় ধরনের অগ্রগতি করতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। এমন সময়ে চীনের সঙ্গে অতিরিক্ত ছাড়ের কোনো চুক্তি ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিকর হতে পারে। ফলে দুই দেশের পক্ষ থেকেই বড় সমাধানের বদলে ছোট অর্জনের দিকে ঝোঁকার সম্ভাবনা বেশি।
এর মধ্যে ছয় থেকে ১২ মাসের জন্য বাণিজ্যিক যুদ্ধবিরতি বাড়ানো হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র কিছু নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর শুল্ক কমিয়ে বিনিময়ে চীনের কাছ থেকে কৃষিপণ্য আমদানি বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে। দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগবিষয়ক যৌথ বোর্ডগুলোও নতুন করে সক্রিয় করার ঘোষণা আসতে পারে। এসব উদ্যোগকে দুই নেতা অগ্রগতির প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন, অথচ বড় কোনো কৌশলগত ছাড় দিতে হবে না।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায়ও বড় সমঝোতার সম্ভাবনা কম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কিছু এআই মডেল তৈরি করছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিষ্ঠানগুলো।
গত শীর্ষ বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে এআই নিয়ে সরকারি পর্যায়ে সংলাপের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কার্যত এগোয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সম্প্রতি নিউইয়র্কে চীনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রস্তুতিমূলক আলোচনার সময় নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র-চীন এআই সংলাপের প্রস্তাব দিয়েছেন।
তবে এআই উন্নয়নের গতি কমানো বা এর ওপর যৌথ সীমা আরোপের বিষয়ে বাস্তব আগ্রহ খুব বেশি নেই। যুক্তরাষ্ট্রে এআই উন্নয়নের অস্তিত্বগত ঝুঁকি নিয়ে সতর্কতা থাকলেও ট্রাম্প এ ধরনের আশঙ্কাকে খুব বেশি গুরুত্ব দেননি। আবার এআই উন্নয়নে সমন্বিত ধীরগতি চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের সুবিধা দিতে পারে—এমন যুক্তিও উঠেছে।
ফলে এমন কোনো নিয়ম মেনে নেওয়ার সম্ভাবনা কম, যা যুক্তরাষ্ট্র বা চীন—যেকোনো এক পক্ষকে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিতে পারে।
ইরান ও তাইওয়ান—সবচেয়ে কঠিন দুই ইস্যু
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও বড় ধরনের অগ্রগতির সুযোগ সীমিত। ইরানের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে ট্রাম্প অসন্তুষ্ট। কিন্তু তেহরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা চীনকে মেনে চলতে বাধ্য করার মতো পর্যাপ্ত প্রভাব ওয়াশিংটনের হাতে নেই।
তাইওয়ান ইস্যু আরও জটিল। আগের বৈঠকেও শি জিনপিং তাইওয়ানের সার্বভৌমত্ব নিয়ে চীনের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন। এর পর যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে কিছুটা বিরতি দিয়েছে। কিন্তু ওয়াশিংটন আরও ছাড় দিলে তার বিনিময়ে কী লাভ হবে, তা স্পষ্ট নয়।
ফলে তাইওয়ান কিংবা ইরান—কোনো একটি ক্ষেত্রেই বড় সমঝোতার সম্ভাবনা খুব সীমিত।
বিনিয়োগকারীদেরও বড় প্রত্যাশা নেই
বৈঠকটি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও অতিরিক্ত আশাবাদ দেখা যাচ্ছে না। চলতি মাসের শুরুতে গোল্ডম্যান স্যাকসের জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৭০ শতাংশ বিনিয়োগকারী মনে করেছেন, শির রাষ্ট্রীয় সফর মূলত প্রতীকী হবে অথবা কার্যত বড় কোনো ফল বয়ে আনবে না। বাকিদের অধিকাংশই সীমিত অগ্রগতির পূর্বাভাস দিয়েছেন। জরিপে অংশ নেওয়া শতাধিক বিনিয়োগকারীর কেউই নেতিবাচক ফলাফলের পূর্বাভাস দেননি।
এর পেছনে একটি পরিবর্তিত বাস্তবতা কাজ করছে। ট্রাম্প ও শির মধ্যে যত বেশি নিয়মিত বৈঠক হচ্ছে, ততই প্রতিটি বৈঠকের ওপর চাপ কমছে। ফলে একটি বৈঠকে বড় সাফল্য না এলেও সেটিকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখার ঝুঁকি কম। একই সঙ্গে বড় চুক্তির সম্ভাব্য রাজনৈতিক ও কৌশলগত ঝুঁকিও কম থাকে।
নিয়মিত বৈঠকই চীনের জন্য সুবিধাজনক
এই পরিস্থিতি চীনের জন্যও সুবিধাজনক হতে পারে। নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে শি জিনপিং ট্রাম্পের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ককে গুরুত্ব দিতে পারেন এবং দুই দেশের সম্পর্ককে দুই সমমর্যাদার নেতার সম্পর্ক হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন। এতে হোয়াইট হাউসের চীনবিরোধী কট্টরপন্থীদের প্রভাব কিছুটা সীমিত রাখার সুযোগ তৈরি হয়।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৯ সালের ২০ জানুয়ারি। সেই সময় পর্যন্ত বেইজিং নিয়মিত বৈঠক চালিয়ে এমন একটি অবস্থান ধরে রাখতে চাইতে পারে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের চীননীতি পুরোপুরি কঠোর বা সুসংগঠিত হয়ে উঠতে না পারে।
এ কারণে বাণিজ্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ খুব দীর্ঘ সময়ের জন্য বাড়ানোর পরিবর্তে ছয় মাস করে নবায়ন করার মতো ব্যবস্থাও সামনে আসতে পারে। এতে দুই নেতার মধ্যে আরও কয়েকটি সরাসরি বৈঠকের সুযোগ তৈরি হবে। চলতি বছরেই তাঁদের আরও দুইবার দেখা করার কথা রয়েছে।
রাশিয়াও কি এই সমীকরণের অংশ?
এই কূটনৈতিক সমীকরণে রাশিয়াও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। চলতি মাসের শুরুতে ক্রেমলিনের একজন পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক সহযোগী ট্রাম্প, শি ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের সম্ভাবনার কথা তুলেছিলেন। নভেম্বর মাসে শেনঝেনে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা বা এপেকের বৈঠকে ট্রাম্প অংশ নিলে এমন একটি বৈঠক হতে পারে বলে ধারণা দেওয়া হয়।
ট্রাম্পের সঙ্গে পুতিনের ঘনিষ্ঠতার পাশাপাশি রাশিয়া ও চীনের মধ্যেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। একই সময়ে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে বড় ধরনের বিরোধ চলছে। ফলে ট্রাম্প-শি বৈঠকের বাইরেও বৃহত্তর একটি কূটনৈতিক সমীকরণ তৈরি হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে
সব মিলিয়ে ২৪ সেপ্টেম্বরের ট্রাম্প-শি বৈঠক থেকে ঐতিহাসিক কোনো বড় চুক্তির প্রত্যাশা কম। বরং বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি কিছুটা বাড়ানো, নির্দিষ্ট পণ্যে শুল্ক কমানো, চীনের কৃষিপণ্য আমদানি বাড়ানো কিংবা বাণিজ্য ও বিনিয়োগবিষয়ক যৌথ উদ্যোগ নতুন করে চালুর মতো সীমিত পদক্ষেপই বেশি বাস্তবসম্মত।
এ ধরনের ছোট সমঝোতা দুই নেতাকেই রাজনৈতিকভাবে কিছুটা সুবিধা দেবে। ট্রাম্প বলতে পারবেন, তিনি চীনের সঙ্গে সম্পর্ক সামলাচ্ছেন; অন্যদিকে শি জিনপিং বড় কোনো কৌশলগত ছাড় না দিয়েই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতে পারবেন।
তাই এবারের বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল হয়তো কোনো ঐতিহাসিক ঘোষণা নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়ার একটি নতুন পদ্ধতি তৈরি হওয়াই হতে পারে এর বড় অর্জন। সূত্রের বিশ্লেষণেও এমন ইঙ্গিতই পাওয়া যায়—বড় সমাধানের বদলে ছোট পদক্ষেপ, সীমিত ছাড় এবং নিয়মিত যোগাযোগই আপাতত দুই পরাশক্তির জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।












