জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নিজের শেষ ভাষণে গাজা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কূটনৈতিক সাফল্যের দাবি সরাসরি খারিজ করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। তিনি বলেছেন, গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবি করা হলেও সেখানে এখনো এক মুহূর্তের জন্যও মানবিক সহায়তার পথ পুনরায় খুলে দেওয়া হয়নি। এমন পরিস্থিতিকে তিনি ‘লজ্জাজনক দৃশ্য’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেন ম্যাক্রোঁ। এটিই জাতিসংঘে তাঁর শেষ ভাষণ। আগামী বছর মে মাসে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা।
ম্যাক্রোঁর ভাষণের কয়েক ঘণ্টা আগেই একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প তাঁর গাজা শান্তি পরিকল্পনাকে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেন। ট্রাম্প দাবি করেন, তাঁর উদ্যোগের মাধ্যমে ইসরায়েল ও হামাসের যুদ্ধের অবসান হয়েছে এবং গাজায় শান্তি ও স্থিতিশীলতার পথে অগ্রগতি হয়েছে।
তবে ট্রাম্পের এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত হননি ম্যাক্রোঁ।
তিনি বলেন, এক বছর আগে একই সভাকক্ষে প্রায় এক ডজন দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। তখন অনেকে বলেছিলেন, রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া কেবল কাগজে-কলমের বিষয়, বাস্তব পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয় না।
ম্যাক্রোঁ প্রশ্ন তোলেন, গাজার পরিস্থিতির সামনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি নিষ্ক্রিয় থাকে, তাহলে সেই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিরই বা কতটা বিশ্বাসযোগ্যতা থাকে।
তিনি বলেন, কেউ কেউ কথিত শান্তির কথা বলছেন। কিন্তু সেই শান্তি গাজায় মানবিক সহায়তার পথ এক মুহূর্তের জন্যও খুলে দিতে পারেনি। তাহলে কি বিশ্ব কেবল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এমন একটি দৃশ্য দেখবে, যা সবার জন্য লজ্জার হওয়া উচিত?
ট্রাম্পের দাবির পাল্টা জবাব হোয়াইট হাউসের
ম্যাক্রোঁর বক্তব্যের পর হোয়াইট হাউস তাঁর সমালোচনার জবাব দিয়েছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইসরায়েল ও হামাসের যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছেন, জীবিত সব জিম্মিকে মুক্ত করেছেন এবং নিহতদের মরদেহ তাদের স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ট্রাম্প এখন গাজার জন্য প্রস্তাবিত ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অন্যরা যখন শুধু কথা বলছে, তখন ট্রাম্প এই জটিল সমস্যার সরাসরি মোকাবিলা করেছেন। আনা কেলির দাবি, শান্তি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ট্রাম্পের চেয়ে বেশি আর কেউ করেননি।
এভাবে গাজা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের অবস্থানের পার্থক্য জাতিসংঘের মঞ্চেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে ওয়াশিংটন ট্রাম্পের উদ্যোগকে যুদ্ধ বন্ধ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার বড় পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে প্যারিস বলছে, বাস্তবে মানবিক পরিস্থিতির উন্নতি না হলে শুধু শান্তির ঘোষণা যথেষ্ট নয়।
পশ্চিম তীর নিয়েও ইসরায়েলের সমালোচনা
ম্যাক্রোঁ শুধু গাজার পরিস্থিতি নিয়েই কথা বলেননি। ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়েও তিনি তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, পশ্চিম তীরে প্রতিদিন নানা ধরনের লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনার জন্য হামাসকে দায়ী করার সুযোগ নেই, কারণ হামাস পশ্চিম তীরে কার্যক্রম পরিচালনা করেনি।
![]()
ম্যাক্রোঁর মতে, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান সহিংসতা ও অধিকার লঙ্ঘন এমন একটি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে প্রতিদিন আরও কঠিন করে তুলছে, যেখানে ফিলিস্তিনি জনগণের বৈধ অস্তিত্বের অধিকার সম্মানিত হবে।
ফ্রান্স গত এক বছরে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার ঘটনায় ফ্রান্স কিছু জাতীয় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিতে উৎপাদিত পণ্য নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়াও শুরু করেছে দেশটি।
ম্যাক্রোঁ বলেন, ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যদি তার প্রতিবেশী দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করা হয়, তাহলে সেটি ভুল পথ। তাঁর মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের নিরাপত্তাকেই দুর্বল করে—বর্তমানে এবং ভবিষ্যতেও।
ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি নিয়ে ফ্রান্সের অবস্থান
গত বছরের সেপ্টেম্বরে ফ্রান্স ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এই সিদ্ধান্তের পর ম্যাক্রোঁ ফ্রান্সের অভ্যন্তরেও সমালোচনার মুখে পড়েছেন। কিছু রাজনীতিক ও অধিকারকর্মীর অভিযোগ, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার পরও গাজার পরিস্থিতিতে ম্যাক্রোঁ যথেষ্ট কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেননি।
জাতিসংঘের ভাষণে ম্যাক্রোঁ অবশ্য তাঁর অবস্থান থেকে সরে আসেননি। বরং তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেন, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া কেবল প্রতীকী সিদ্ধান্ত নয়; এর সঙ্গে ফিলিস্তিনি জনগণের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকার এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্বও জড়িত।
‘শক্তির জঙ্গলের নিয়মে’ ফিরতে পারে বিশ্ব
ম্যাক্রোঁ তাঁর ভাষণে গাজা ছাড়িয়ে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েও সতর্ক করেন।
তিনি বলেন, বিশ্ব যেন আবার এমন এক ব্যবস্থায় ফিরে না যায়, যেখানে শক্তিশালী দেশই নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেয় এবং আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মের গুরুত্ব হারিয়ে যায়।
তাঁর ভাষায়, বিশ্ব এখন এমন একটি পথ বেছে নেওয়ার মুখে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একদিকে থাকবে শক্তি ও জবরদস্তির ওপর নির্ভরশীল ব্যবস্থা, অন্যদিকে থাকবে একটি সভ্য আন্তর্জাতিক সমাজ।
ম্যাক্রোঁ জাতিসংঘের বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, বিশ্বের দেশগুলোর উচিত জাতিসংঘের পাশে দাঁড়ানো এবং দায়মুক্তির এমন কোনো নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা মেনে না নেওয়া, যেখানে শক্তিশালী দেশগুলো নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহির বাইরে চলে যেতে পারে।
ভাষণের শেষেও জাতিসংঘের প্রতি নিজের দৃঢ় সমর্থন প্রকাশ করেন ম্যাক্রোঁ। তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘ দীর্ঘজীবী হোক।’
প্রেসিডেন্ট হিসেবে এটিই জাতিসংঘে তাঁর শেষ ভাষণ। ২০১৭ সালে প্রথমবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে ভাষণ দিয়েছিলেন ম্যাক্রোঁ। প্রায় এক দশকের সেই অধ্যায়ের শেষ ভাষণে তিনি গাজা, ফিলিস্তিন, ইসরায়েল এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের অবস্থান আরও স্পষ্ট করে গেলেন।












