ব্রিটেনের রাজনীতিতে রিফর্ম ইউকের উত্থান নিয়ে যে জাতীয় আলোচনা চলছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে উঠেছে দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর বার্মিংহাম। গত সপ্তাহে শহরের ন্যাশনাল এক্সিবিশন সেন্টারে হাজারো সমর্থক নিয়ে সমাবেশ করে দলটি নিজেদের ভবিষ্যৎ সরকার হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। এর আগে একাধিকবার জাতীয় প্রচারণা ও সম্মেলনের জন্যও বার্মিংহামকে বেছে নিয়েছে দলটি।
কিন্তু বার্মিংহামের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা রিফর্ম ইউকের দাবির চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
শহরটি তরুণ, শ্রমজীবী এবং বহু জাতিগোষ্ঠীর মানুষের বসবাসের জায়গা। ২০২১ সালের আদমশুমারির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শহরের ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ বাসিন্দা নিজেদের বৃহত্তর ‘শ্বেতাঙ্গ’ শ্রেণিতে এবং ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ বাসিন্দা কৃষ্ণাঙ্গ, এশীয়, মিশ্র বা অন্যান্য জাতিগত শ্রেণিতে পরিচয় দিয়েছেন। ফলে রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজ যে পুরোনো ব্রিটেনের জায়গায় একটি অপরিচিত নতুন ব্রিটেন তৈরি হয়েছে—এমন রাজনৈতিক বয়ান তুলে ধরেন, বার্মিংহাম তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়।
তবে শহরের বৈচিত্র্যকে শুধু অভিবাসন বা জাতিগত পরিচয়ের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায় না। মে মাসের স্থানীয় নির্বাচনে রিফর্ম ইউকে বার্মিংহাম সিটি কাউন্সিলে সবচেয়ে বড় একক রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১০১টি আসনের মধ্যে তারা পায় ২৩টি। কিন্তু এই ফলাফলকে পুরো শহর বহুসাংস্কৃতিক রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছে—এমন প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না।
বরং নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায় একটি ভাঙা ও বিভক্ত রাজনৈতিক চিত্র।
গ্রিন পার্টি পুরো শহরে সবচেয়ে বেশি ভোট পেলেও ব্রিটেনের নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে তাদের আসন দাঁড়ায় ১৯টিতে। লেবার পার্টির আসন ৬৫ থেকে নেমে হয় মাত্র ১৭টি। কনজারভেটিভ পার্টি পায় ১৬টি এবং লিবারেল ডেমোক্র্যাটরা ১২টি আসন। আরও ১৪টি আসন যায় স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বিভিন্ন স্বতন্ত্র গোষ্ঠীর হাতে।
অর্থাৎ বার্মিংহামের নির্বাচনী ফলাফলকে রিফর্ম ইউকের দিকে পুরো শহরের রাজনৈতিক ঝুঁকে পড়া হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। দলটি বড় একটি রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করেছে, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি।
এমনকি কাউন্সিলে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়ার পরও রিফর্ম ইউকে বার্মিংহাম পরিচালনা করতে পারছে না। কোনো রাজনৈতিক অংশীদার না পাওয়ায় বর্তমানে লিবারেল ডেমোক্র্যাট, গ্রিন পার্টি ও ‘বেটার বার্মিংহাম’ স্বতন্ত্র গোষ্ঠীর সমন্বয়ে একটি সংখ্যালঘু প্রশাসন শহর পরিচালনা করছে। লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের একজন নেতা কাউন্সিলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং গ্রিন পার্টির একজন উপনেতা রয়েছেন।
অর্থাৎ রিফর্ম ইউকে বার্মিংহাম দখল করেনি; তারা সেখানে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
ক্ষোভের পেছনে দীর্ঘদিনের সংকট
বার্মিংহামের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে শুধু অভিবাসন, জাতিগত পরিচয় বা সংস্কৃতির প্রশ্ন কাজ করছে—এমন ব্যাখ্যাও অসম্পূর্ণ।
লেবার পার্টির প্রতি মানুষের হতাশা শহরটির দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের সঙ্গে যুক্ত। ২০২৩ সালে লেবার-নিয়ন্ত্রিত বার্মিংহাম সিটি কাউন্সিল কার্যত দেউলিয়াত্ব ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। এর পেছনে ছিল ঐতিহাসিক সমান বেতন-সংক্রান্ত দায়, একটি ব্যর্থ তথ্যপ্রযুক্তি প্রকল্প এবং স্থানীয় সরকারে দীর্ঘদিন ধরে কমতে থাকা অর্থায়ন।
এর পর পরিষেবা কমেছে, কাউন্সিল কর বেড়েছে, তরুণদের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম সংকুচিত হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী বর্জ্য সংগ্রহ ধর্মঘটের সময় শহরের বিভিন্ন এলাকায় রাস্তায় আবর্জনা জমে থাকার ঘটনাও বাসিন্দাদের ক্ষোভ বাড়িয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি, অনিরাপদ কর্মসংস্থান এবং দুর্বল হয়ে পড়া সরকারি পরিষেবা। স্থানীয় সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বার্মিংহামের অর্ধেকেরও বেশি এলাকা ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বঞ্চিত ২০ শতাংশ এলাকার মধ্যে পড়ে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, শহরটির ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ শিশু দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে।
এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক ক্ষোভ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
দারিদ্র্য শুধু অর্থনীতির সমস্যা নয়
বার্মিংহাম ও সোলিহালের এনএইচএস ব্যবস্থায় স্বাস্থ্য বৈষম্য নিয়ে কাজ করা একজন সাবেক কর্মকর্তা হিসেবে লেখক দেখিয়েছেন, দারিদ্র্যের প্রভাব শুধু মানুষের আয় বা জীবনযাত্রার মানে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও পড়ে।
ঠান্ডা বা অতিরিক্ত ভিড়ের বাসস্থান, অনিরাপদ চাকরি, নাগালের বাইরে চলে যাওয়া খাবারের দাম, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, বায়ুদূষণ এবং চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার নানা বাধা—সবকিছু মিলিয়ে মানুষের অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
অর্থাৎ একটি শহরে সুস্থ জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দুর্বল হয়ে গেলে শুধু হাসপাতাল বা চিকিৎসা ব্যবস্থা দিয়ে তার সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়।
এই বাস্তবতাই বার্মিংহামের রাজনৈতিক ক্ষোভ বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
রিফর্ম ইউকের ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক
রিফর্ম ইউকে এই ক্ষোভকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে অভিবাসন ও বহুসাংস্কৃতিকতার প্রশ্নকে বড় জায়গা দেয়। দলটির সমালোচকেরা অবশ্য মনে করেন, এই ব্যাখ্যা অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার প্রকৃত কারণ থেকে মানুষের মনোযোগ সরিয়ে অভিবাসী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর দিকে ঠেলে দেয়।
লেখাটির যুক্তি হলো, রিফর্মের সমর্থকদের সবাই একই কারণে দলটিকে ভোট দেন না। কেউ হয়তো অভিবাসন ও জাতিগত প্রশ্নে দলের অবস্থানের প্রতি আকৃষ্ট, আবার কেউ দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক হতাশা, ক্ষোভ কিংবা প্রচলিত দলগুলোর প্রতি অনাস্থা থেকে ভোট দিয়েছেন।
তাই রিফর্মের ভোটারদের সবাইকে একই পরিচয়ে চিহ্নিত করা যেমন বাস্তবতাকে সরল করে, তেমনি দলের রাজনৈতিক বক্তব্যে বিদ্যমান অভিবাসনবিরোধী বা সংখ্যালঘুবিরোধী প্রবণতার বিষয়টিও উপেক্ষা করা যায় না।
এই দুই বাস্তবতার পার্থক্য করা গুরুত্বপূর্ণ—মানুষের ক্ষোভ বাস্তব হতে পারে, কিন্তু সেই ক্ষোভের ব্যাখ্যা নিয়ে রাজনৈতিক মতভেদ থাকতে পারে।
অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দলের অর্থায়ন
রিফর্ম ইউকের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আরেকটি বিতর্ক দলটির অর্থায়নকে ঘিরে।
ইলেক্টোরাল কমিশনের রেকর্ডের একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দলটি প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ডের বড় অঙ্কের অনুদান পেয়েছে। এসব অনুদানের বড় অংশ এসেছে ক্রিপ্টোকারেন্সি ও অর্থ খাতের সঙ্গে যুক্ত অল্পসংখ্যক বড় দাতার কাছ থেকে।
সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলছেন, শ্রমজীবী ও অর্থনৈতিকভাবে চাপের মধ্যে থাকা মানুষের ক্ষোভকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর পাশাপাশি বড় সম্পদশালী দাতাদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার মধ্যে কী ধরনের রাজনৈতিক বৈপরীত্য রয়েছে।
তবে এটিও আলাদা করে দেখা প্রয়োজন যে কোনো দলের অর্থায়ন এবং তার নীতির প্রত্যক্ষ প্রভাব সম্পর্কে যে রাজনৈতিক ব্যাখ্যাগুলো দেওয়া হয়, সেগুলো সবই একই ধরনের প্রমাণভিত্তিক তথ্য নয়।
শ্রমজীবী মানুষের বিভাজন নাকি মিল?
বার্মিংহামের বাস্তবতা থেকে যে আরেকটি বিষয় সামনে আসে তা হলো—জাতিগত পরিচয় আলাদা হলেও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক স্বার্থ অনেক ক্ষেত্রে একই হতে পারে।
পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত একজন পরিচর্যাকর্মী, কৃষ্ণাঙ্গ একজন স্নাতক, শ্বেতাঙ্গ একজন পেনশনভোগী কিংবা সাবেক লংব্রিজ কারখানার শ্রমিক—তাদের জীবনযাত্রার অভিজ্ঞতা এক নয়। কিন্তু ভালো মজুরি, সাশ্রয়ী বাসস্থান, কার্যকর সরকারি পরিষেবা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগের মতো বিষয়গুলো তাদের সবার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বার্মিংহামের সাবেক কাউন্সিলর হিসেবে লেখক বলেন, একটি স্কুল বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা, খারাপ বাসস্থান বা কোনো বাস রুট হারানোর মতো স্থানীয় সমস্যাকে কেন্দ্র করে মানুষ যখন একসঙ্গে সংগঠিত হয়, তখন তাদের মধ্যকার অনেক পার্থক্য পেছনে চলে যায়।
এ ধরনের সামাজিক সংহতি জাতিগত বৈষম্য বা পার্থক্য অস্বীকার করে না। বরং একই শহরের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়—এই ধারণাকে সামনে আনে।
বার্মিংহামের ফলাফল কী বলছে?
রিফর্ম ইউকে বার্মিংহামকে বেছে নিয়েছে এই বার্তা দেওয়ার জন্য যে শহরটির মতো বহুজাতিক ও বৈচিত্র্যময় এলাকাতেও তাদের রাজনৈতিক বার্তা শক্তিশালী হচ্ছে।
কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল আরেকটি বিষয়ও দেখিয়েছে। রিফর্ম ইউকে ২৩টি আসন নিয়ে সবচেয়ে বড় একক দল হলেও তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি এবং শহর পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক অংশীদারও জোগাড় করতে পারেনি। অন্যদিকে গ্রিন পার্টি, লিবারেল ডেমোক্র্যাট, স্বতন্ত্র গোষ্ঠী এবং অন্যান্য দলও উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেয়েছে।
সুতরাং বার্মিংহামের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে একমুখী কোনো পরিবর্তন হিসেবে দেখা কঠিন। এখানে একদিকে লেবার পার্টির প্রতি দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রয়েছে, অন্যদিকে রিফর্ম ইউকের উত্থান রয়েছে। একই সঙ্গে গ্রিন পার্টিসহ অন্য রাজনৈতিক শক্তিগুলোর জন্যও নতুন জায়গা তৈরি হয়েছে।
বার্মিংহামের গল্প তাই শুধু রিফর্ম ইউকের উত্থানের গল্প নয়। এটি এমন একটি শহরের গল্প, যেখানে অর্থনৈতিক বৈষম্য, স্থানীয় পরিষেবার সংকট, রাজনৈতিক হতাশা, অভিবাসন ও পরিচয়ের প্রশ্ন এবং বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির উত্থান—সবকিছু একই সময়ে কাজ করছে।
বহু জাতিগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস, অর্থনৈতিক বৈষম্য, দীর্ঘদিনের সরকারি পরিষেবা সংকট এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বার্মিংহাম আজকের ব্রিটেনের জটিল বাস্তবতার একটি প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। শহরটির নির্বাচনী ফলাফল অন্তত এতটুকু দেখিয়েছে যে মানুষের ক্ষোভের রাজনৈতিক গন্তব্য একটিমাত্র দল বা মতাদর্শে সীমাবদ্ধ নয়।












